কখনো কখনো মনে হয় — এই পৃথিবীতে সবাই আমাকে হাসিখুশি মানুষ হিসেবে চেনে…
কিন্তু যে জায়গায় আমি সবচেয়ে বেশি কাঁদি, সেই জায়গাটা কেউ জানেই না—শুধু আল্লাহ ছাড়া।
মানুষ দেখে হাসি, আল্লাহ দেখেন কান্না
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী। ৩০ নভেম্বর ২০২৫
আমার নাম অভিক। আমি শুধু একজন সাধারণ ছেলে। বয়স ৫০ এর কোঠায়। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় আমি সবসময় হাসিখুশি, কথা বলি অনর্গল, কারো বিপদে পড়লে আগে ছুটি। কিন্তু রাত বারোটা বাজলেই আমার মুখোশটা খসে পড়ে।
আমি ছোটবেলা থেকেই এমন। বাড়িতে বাবা-মা ঝগড়া করলে আমিই মাঝখানে দাঁড়িয়ে হাসিয়ে দিতাম। বন্ধুরা মন খারাপ করলে আমি গল্প করে ভোলাতাম। কলেজে এক বন্ধু একবার বলেছিল, “তুই যেন কখনো কষ্টই পাস না।” আমি হেসে বলেছিলাম, “অভিকের কষ্ট হলে কে সবাইকে সামলাবে রে?” সেদিন থেকে যেন একটা দায়িত্ব হয়ে গেল। আমাকে সবসময় ঠিক থাকতে হবে।
কিন্তু আমিও তো মানুষ। আমারও বুকের ভিতরে একটা জায়গা আছে, যেটা কেউ দেখে না।
গত পাঁচ-ছয় বছরে অনেক কিছু হয়েছে। চাকরি গেছে। প্রেম ভেঙেছে। বাবা অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ছিলেন দু’মাস। সেই সময় আমি অফিসে গিয়ে হাসতাম, বন্ধুদের সঙ্গে মিষ্টি করে কথা বলতাম, বাসায় ফিরে মায়ের সামনে বলতাম, “বাবা ঠিক হয়ে যাবে।” কিন্তু রাতে যখন সবাই ঘুমিয়ে পড়ত, আমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে সিগারেট খেতাম আর চুপচাপ কাঁদতাম। কখনো বাথরুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করে ট্যাপ খুলে দিতাম, যাতে কান্নার শব্দ কেউ না শোনে।
একদিন একটা বড় ঘটনা ঘটেছিল। আমি এক বন্ধুর জন্য অনেক কিছু করেছিলাম। টাকা ধার দিয়েছিলাম, চাকরি খুঁজে দিয়েছিলাম, তার বৌয়ের অসুখের সময় রাত জেগে হাসপাতালে ছিলাম। সে ঠিক হওয়ার পর একদিন দেখি সে আমাকে এড়িয়ে চলছে। আমি মেসেজ করলে রিপ্লাই করে না। একদিন জিজ্ঞেস করলাম, “কী হয়েছে ভাই?” সে বলল, “কিছু না, ব্যস্ত আছি।” আমি বুঝে গেলাম। সে আর আমাকে দরকার মনে করে না। সেদিন বাসায় ফিরে আমার বুকটা ফেটে যাচ্ছিল। আমি কাউকে কিছু বলিনি। শুধু রাতে বিছানায় শুয়ে চাদর মুখে চেপে কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।
সেই রাতেই প্রথম বারের মতো আমি সেজদায় গিয়ে অনেকক্ষণ কাঁদলাম। কোনো কথা বলিনি। শুধু বলেছিলাম, “আল্লাহ, আমি আর পারছি না।” মনে আছে, সেদিন কান্না থামছিল না। কিন্তু অদ্ভুত একটা শান্তি এসেছিল। মনে হলো, যে কষ্টটা আমি কাউকে বলতে পারি না, সেটা তিনি শুনে নিচ্ছেন।
তারপর থেকে আমার অভ্যাস হয়ে গেছে। যখনই কষ্ট হয়, কাউকে বলি না। শুধু তাঁর কাছে যাই। রাতে উঠে তাহাজ্জুদ পড়ি। কখনো কথা বলি, কখনো শুধু কাঁদি। আমার জানালার পাশে একটা জায়গা আছে, সেখানে বসে কান্না করি। কখনো বৃষ্টি পড়লে জানালা খুলে দিই, বৃষ্টির শব্দে আমার কান্না মিশে যায়।
আমি আর বদলাতে চাই না। মানুষ যতই বলুক, “অভিক বড্ড নরম। লোকে তোকে ছেলে বানিয়ে ছাড়বে।” আমি হাসি। বলি, “হোক।” কারণ আমি জানি, যারা আমাকে ব্যবহার করে, তাদের জন্য আমার কান্না নষ্ট করার দরকার নেই। আর যারা সত্যি ভালোবাসে, তারা কখনো ব্যবহার করে না।
আমার মা একবার বলেছিলেন, “বাবা, তুই এত হাসিস কেন? কখনো কষ্ট হলে আমাকে বলিস।” আমি হেসে বলেছিলাম, “মা, অভিকের কষ্ট হলে আমি আল্লাহকে বলি। তিনি তো আমার থেকেও বেশি ভালোবাসেন তোমাকে।” মা কিছু বলেননি। শুধু আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছিলেন।
আমি এখনো সবাইকে সাহায্য করি। এখনো হাসি। কিন্তু এখন আর ভয় হয় না। কারণ আমি জানি, আমি যতক্ষণ একা একা কষ্ট সহ্য করছি, ততক্ষণ আমি আসলে একা নই। তিনি আছেন। আমার প্রতিটা চোখের পানি তিনি গুনে রাখেন।
তোমাদের মধ্যে যদি কেউ এমন থাকে, যে সবার সামনে হাসে, কিন্তু রাতে একা কাঁদে, জেনো, তুমি একা নই। তোমার কান্নাটা কেউ না দেখুক, তিনি দেখেন। আর তিনি কখনো ভুলে যান না।
আমি শুধু এটুকু বলতে চাই,
যে রাতগুলো আমরা একা কাঁদি, সে রাতগুলোই আমাদের সবচেয়ে দামি।
কারণ সেখানে আমরা সত্যি সত্যি নিজেরা হয়ে যাই।
আর সেখানে তিনি আমাদের কাছে আসেন।
আমি এখনো কাঁদি।
কিন্তু এখন আর ভয় লাগে না।
কারণ আমি জানি, আমার কান্নার প্রতিটি ফোঁটা তাঁর কাছে জমা আছে।
একদিন সেগুলোই আমার জন্য রহমত হয়ে ফিরে আসবে।
#হৃদয়েরকথা #নিজেরমানুষ
#রাতেরকান্না #আল্লাহজানেন #জীবনেরসত্য
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।