নিজের থালাটা
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণমূলক লেখা | ১৬ অক্টোবর ২০২৬
রাত তখন প্রায় সাড়ে এগারোটা। রান্নাঘরের চুলা অনেকক্ষণ আগেই নিভে গেছে। টেবিলের ওপর ভাত, ডাল আর মাছের ঝোল ঢাকা দেওয়া। রুবিনা বেগম নিজের জন্য আলাদা করে খাবার রাখেননি।
স্বামী এখনো ফেরেননি। ছেলে ফোন ধরছে না। মেয়েটা বিকেলে মায়ের সঙ্গে কথা কাটাকাটি করে দরজা বন্ধ করে বসে আছে।
দরজা খুলে স্বামী ঢুকতেই বললেন, ‘এত রাত হলো, খাওনি?’
রুবিনা উত্তর দেওয়ার আগেই তিনি বললেন, ‘তোমার সঙ্গে থাকলে কারও শান্তি আছে? ছেলে কথা শোনে না, মেয়ের সঙ্গে ঝামেলা, আমিও বাইরে থেকে এসে এসব দেখি।’
রুবিনা চুপ করে রইলেন।
এই সংসারে এমন কথা নতুন নয়।
পরদিন ছেলে পরীক্ষায় খারাপ করল। বাবার মুখ ভার। ‘মাকে দেখেই তো এসব শিখেছে।’
মেয়ে বন্ধুর সঙ্গে বাইরে গিয়ে দেরি করে ফিরল। ‘তুই ওকে বেশি প্রশ্রয় দিয়েছিস।’
কয়েক দিন পর স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কথা কাটাকাটি হলে কথাটা আবার ফিরে এল, ‘তুমি সবকিছুতেই সমস্যা তৈরি করো।’
রুবিনা সবসময় চুপ থাকেন না। কোনো দিন রাগ করে দরজা বন্ধ করে বসে থাকেন, কোনো দিন ছেলের ওপর বিরক্ত হয়ে বেশি কথা বলে ফেলেন। পরে নিজেই আফসোস করেন।
কিন্তু সংসারে যা কিছুই ঘটুক, দায়টা শেষ পর্যন্ত তাঁর কাছেই ফিরে আসে।
আগে তিনি প্রতিবাদ করতেন। ‘সব দোষ আমার কেন?’
পরে আর করতেন না। কারণ তিনি বুঝে গিয়েছিলেন, কথাটা শেষ পর্যন্ত সেখানেই গিয়ে থামবে।
এমন পরিস্থিতিকে মনোবিজ্ঞানে অনেক সময় ‘স্কেপগোটিং’ বলা হয়। পরিবারের জটিল সমস্যা, ব্যর্থতা বা অস্বস্তির দায় বারবার একজনের ওপর চাপতে চাপতে একসময় সেই মানুষটিকেই সমস্যার মূল কারণ হিসেবে দেখা শুরু হয়।
বাংলাদেশি সংসারে এর চেহারা খুব পরিচিত।
কখনো পুত্রবধূ ‘সংসার ভাঙছে’। কখনো স্বামী ‘কিছু বোঝে না’। কোনো সন্তান ‘অবাধ্য’, কোনো ভাই ‘স্বার্থপর’। কাউকে একবার এমন একটি পরিচয়ে আটকে দিলে তার পরের আচরণও সেভাবেই দেখা হয়।
সে প্রতিবাদ করলে, ‘দেখেছো, কী মেজাজ!’
চুপ করলে, ‘আবার মুখ গোমড়া করে আছে।’
নিজের কথা বোঝাতে গেলে, ‘আবার সাফাই গাইছে।’
ভুল স্বীকার করলে, ‘এখন ভালো সাজছে।’
একসময় মানুষটির আচরণ নয়, তাঁকে নিয়ে তৈরি ধারণাটাই সত্য হয়ে দাঁড়ায়।
এর সঙ্গে ক্ষমতার ভারসাম্যের বিষয়টাও জড়িয়ে থাকে। যে মানুষটি অর্থনৈতিকভাবে নির্ভরশীল, পরিবারের সিদ্ধান্তে যার কথা কম শোনা হয়, কিংবা যার চলে যাওয়ার মতো সহজ কোনো জায়গা নেই, তাকে দায়ী করা সহজ।
রুবিনার সংসারেও আসল সমস্যাগুলো অন্য জায়গায় ছিল।
স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে অনেক দিন ধরে ঠিকমতো কথা হয় না। স্বামী দিনের বেশির ভাগ সময় বাইরে থাকেন। ছেলের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব তৈরি হয়েছে। মেয়েটা নিজের কথা মায়ের কাছে বলে, বাবার কাছে নয়। পুরোনো কিছু অভিমানও জমে আছে।
এসব নিয়ে কেউ বসেনি। সবাই শুধু ভেবেছে, রুবিনা একটু বদলালেই সংসার ঠিক হয়ে যাবে।
একজনকে দায়ী করে দিলে অন্যদের নিজেদের দিকে তাকাতে হয় না। স্বামীকে ভাবতে হয় না, স্ত্রীকে তিনি কতটা সময় দেন। মা-বাবাকে ভাবতে হয় না, সন্তান কেন তাদের কাছে নিজের কথা বলতে ভয় পায়।
একজন আছে।
দোষটা তার।
এটাই সবচেয়ে সহজ উত্তর।
কিন্তু বছরের পর বছর একই কথা শুনতে শুনতে মানুষ একসময় নিজের সিদ্ধান্ত নিয়েও সন্দেহ করতে শুরু করে। কিছু বলতে গিয়ে থেমে যায়। প্রতিবাদ করতে গিয়ে ভাবে, ‘আবার যদি বলে সব আমার দোষ?’
তারপর একদিন সত্যিই চুপ হয়ে যায়।
পরিবার তখন বলে, ‘মানুষটা কেমন বদলে গেছে।’
হয়তো বদলায়নি। হয়তো শুধু নিজের পক্ষে কথা বলার শক্তিটুকু আর নেই।
রুবিনা এখনো সবার জন্য খাবার বেড়ে দেন। ছেলে দেরি করে ফিরলে দরজা খুলে দেন। মেয়ের সঙ্গে অভিমান হলেও রাতে তার ঘরের দরজায় একবার দাঁড়ান।
শুধু নিজের থালাটা নিয়ে তিনি আর টেবিলে বসেন না।
রাত গভীর হলে বারান্দার এক কোণে বসে ধীরে ধীরে ভাত খান।
ঘরের ভেতর তখন সবাই যার যার মতো ব্যস্ত।
কেউ তাঁকে আর জিজ্ঞেস করে না, ‘তুমি কেমন আছ?’
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।