আত্মসম্মান, অহংকার ও মনোভাব
মোহাম্মাদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষনধর্মী৷ ১৪ নভেম্বর, ২০২৪
জীবনের পথে আমরা প্রায়ই তিনটি শব্দের সঙ্গে মুখোমুখি হই—আত্মসম্মান, অহংকার আর মনোভাব। কথায় কথায় আমরা বলি, “ওর আত্মসম্মান আছে”, “ওর ইগোটা বড়”, “
ওর অ্যাটিটিউডটা দারুণ”। কিন্তু এই তিনটি যখন একই বাক্যে আসে, তখন বেশিরভাগ সময়েই আমরা তাদের গুলিয়ে ফেলি। আসলে এরা তিন ভাই নয়, তিন পৃথক পথিক—যারা একই মানুষের মধ্যে বাস করে, কিন্তু যাত্রার গন্তব্য ভিন্ন।
আত্মসম্মান:
যে আলো নিজের ভেতর থেকে জ্বলে
আত্মসম্মান মানে নিজেকে চেনা—নিজের আলো ও ছায়া দুটোকেই স্পষ্টভাবে দেখা। এটা কোনো ফানুস নয় যে বাতাসে ভাসবে আর সবাইকে চোখ ধাঁধিয়ে দেবে; এটা একটা গভীর নদী—শান্ত, স্থির, কিন্তু অতল।
যার আত্মসম্মান আছে, সে জানে সে মূল্যবান, কিন্তু সে এও জানে যে মূল্যবান বলেই সে অভ্রান্ত নয়। সে ভুল করলে বলতে পারে, “হ্যাঁ, আমি ভুল করেছি।” সমালোচনা শুনলে তার বুকটা কেঁপে ওঠে না, বরং সে কান পেতে শোনে—কারণ সে জানে, সত্যের একটা অংশ হয়তো সেই কথায় লুকিয়ে আছে।
উদাহরণ বলি— একজন তরুণ লেখক তার প্রথম বইয়ের সমালোচনা পড়ে মুষড়ে পড়েন না। তিনি বলেন, “যেখানে আমি দুর্বল হয়েছি, সেখান থেকে শিখব।” এই স্বীকারোক্তিতে তার কোনো লজ্জা নেই; বরং একটা অদ্ভুত মুক্তি আছে। এটাই আত্মসম্মান।
অহংকার:
যে আগুন নিজেকেই পোড়ায়। অহংকারকে আমি একটা মোমবাতির শিখার সঙ্গে তুলনা করি, যে শিখা নিজেকে সূর্য ভেবে বসে। এর আলো বাইরের দিকে ছড়ায় না, ছড়ায় শুধু ধোঁয়া—যা অন্যদের চোখ জ্বালায় আর নিজের চারপাশটা অন্ধকার করে দেয়।
যার অহংকার বেশি, সে সমালোচনাকে ব্যক্তিগত আক্রমণ ভাবে। সে মনে করে, “আমি ভুল করলে আমার মূল্য কমে যাবে।” তাই সে ভুল লুকোয়, অন্যকে দোষারোপ করে, নিজেকে সর্বদা সঠিক প্রমাণ করতে ছটফট করে।
একজন ম্যানেজার ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে দলের ক্ষতি করেছেন। কিন্তু তিনি বলেন, “আমি ঠিক ছিলাম, বাজারটা খারাপ ছিল।” এই একটা বাক্যে তার অহংকার সবাইকে দেখিয়ে দেয়—আর তার সঙ্গে সঙ্গে তার নিজের বেড়ে ওঠার পথটাও বন্ধ হয়ে যায়।
মনোভাব:
যে বাতাস পালে লাগে। মনোভাব হলো জীবনের প্রতি আমাদের দৃষ্টিকোণ—যে কোণ থেকে আমরা পৃথিবীকে দেখি। একই ঘটনা দুজনের কাছে দুভাবে ধরা দেয়। একজন বলে, “বৃষ্টি হচ্ছে, প্ল্যান নষ্ট!” আরেকজন বলে, “বৃষ্টি হচ্ছে, কী সুন্দর গন্ধ!”
মনোভাব ইতিবাচক, নেতিবাচক বা নিরপেক্ষ হতে পারে। এটা কোনো স্থায়ী চরিত্র নয়, এটা পরিবর্তনশীল। অভিজ্ঞতা, পড়াশোনা, সঙ্গদোষ—সবকিছু এর রং বদলাতে পারে।
একজন ক্রিকেটার টানা তিন ম্যাচে শূন্য রান করে। একজন ভেঙে পড়ে। আরেকজন বলে, “আমার খেলায় কোথাও গলদ আছে। এবার নেটে আরো দশ হাজার বল মারব।” দ্বিতীয়জনের মনোভাব তাকে কিংবদন্তি বানিয়েছে।
শেষ কথা
আত্মসম্মান তোমাকে মাটিতে দাঁড় করিয়ে মাথা উঁচু করতে শেখায়।
অহংকার তোমাকে মাটি থেকে অনেক উপরে তুলে দেয়, কিন্তু সেখানে দাঁড়ানোর মতো পা দেয় না।
আর মনোভাব—সেটা তোমার পালের বাতাস। তুমি যে দিকে পাল ঘুরিয়ে বসবে, জাহাজ সেদিকেই যাবে।
তাই আজ একবার নিজেকে জিজ্ঞাসা করো—
আমার ভেতর কে বেশি জেগে আছে?
যে নিজেকে ভালোবাসে, নাকি যে নিজেকে পৃথিবীর চেয়ে বড় ভাবে?
আর আমার পালে কোন বাতাস লেগেছে—ঝড়ের, না শান্ত সকালের?
উত্তরটা যদি সৎ হয়, তবে জীবনটা অনেক সুন্দর হয়ে যাবে।
#আত্মসম্মান #অহংকার #মনোভাব #SelfRespect #Ego #Attitude #মানসিকস্বাস্থ্য #ব্যক্তিত্ব #জীবনদর্শন #বাংলাকলাম
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।