পরে নয়
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী | ২২ আগস্ট ২০২৬
“সারাজীবন সে বলেছে, পরে করব। একদিন হঠাৎ বুঝল—‘পরে’ বলে আসলে কোনো দিন নেই।”
মানুষ নিজের জীবনটা একদিনে হারায় না। প্রতিদিন একটু একটু করে পিছিয়ে দেয়।
আজ অফিসের কাজটা শেষ হোক।
বাচ্চারা একটু বড় হোক।
ঋণটা শোধ হয়ে যাক।
বাবার চিকিৎসাটা শেষ হোক।
সংসারটা একটু গুছিয়ে নিই।
তারপর নিজের কথা ভাবব।
এই “তারপর” শব্দটার ওপর ভর করেই কত মানুষ জীবন কাটিয়ে দেয়।
কেউ ছোটবেলায় ছবি আঁকতে চেয়েছিল। আঁকা হলো না।
কেউ গান শিখতে চেয়েছিল। শেখা হলো না।
কেউ নিজের একটা ব্যবসা করতে চেয়েছিল। চাকরির নিরাপত্তা ছাড়তে পারেনি।
কেউ পাহাড় দেখতে চেয়েছিল। ছুটিটা সন্তানের পরীক্ষার জন্য রেখে দিল।
কেউ একটা বই লিখতে চেয়েছিল। প্রতিদিন রাতেই ভাবল, কাল থেকে শুরু করবে।
কাল এল।
আবার পরের কাল এল।
বছরও চলে গেল।
স্বপ্নটা শুধু একই জায়গায় বসে রইল।
নিজের জন্য কিছু করলে অপরাধবোধ হয়
দীর্ঘদিন অন্যদের জন্য বেঁচে থাকা মানুষের একটা অদ্ভুত অভ্যাস তৈরি হয়।
সে নিজের প্রয়োজন আর বিলাসিতার মধ্যে পার্থক্য করতে ভুলে যায়।
সন্তানের জন্য দামি জুতা কিনতে দ্বিধা হয় না। বাবার চিকিৎসায় টাকা খরচ করতে হিসাব করে না। সংসারের জন্য নতুন কিছু কিনতেও সমস্যা হয় না।
কিন্তু নিজের জন্য একটা ভালো জামা কিনতে গেলেই মনে হয়—এটা কি সত্যিই দরকার ছিল?
বন্ধুরা কোথাও ঘুরতে যাচ্ছে। সে যেতে চায়। তারপর মনে পড়ে, এই টাকায় ঘরের কিছু একটা করা যায়।
সে আর যায় না।
কেউ তাকে নিষেধ করেনি।
তবু তার ভেতরে একটা অদৃশ্য হিসাবরক্ষক বসে আছে। সবসময় প্রশ্ন করে,
“এটা না করলেও কি চলত না?”
অন্যের জন্য খরচ করলে যে মানুষটি উদার, নিজের জন্য খরচ করলেই সে কেন এত হিসাবি হয়ে যায়?
একদিন সব দায়িত্ব কমে যায়
জীবনের অদ্ভুত ব্যাপার হলো, যে দায়িত্বগুলো একসময় শেষ হওয়ার কথা মনে হয় না, সেগুলোও একদিন শেষ হয়ে যায়।
সন্তান বড় হয়। নিজের জীবনে চলে যায়।
ঋণ শোধ হয়।
চাকরি শেষ হয়।
বাবা-মা থাকেন না।
সংসারের ব্যস্ততাও একসময় একটু থামে।
তারপর যে মানুষটি এতদিন বলেছে, “এখন নয়, পরে”, সে হঠাৎ সেই “পরে”-এর সামনে দাঁড়িয়ে যায়।
কিন্তু তখন কী করবে?
অনেক বছর ধরে যে মানুষটি নিজের ইচ্ছাগুলোকে অপেক্ষা করতে শিখিয়েছে, সে নিজের ইচ্ছাগুলো চিনতেই পারে না।
একদিন ছুটির সকালে ঘুম থেকে উঠে তার হাতে কোনো কাজ নেই। সারাদিনটা তার নিজের।
অথচ সে জানে না, নিজের দিন কীভাবে কাটাতে হয়।
বাইরে থেকে মনে হয়—মানুষটি অবশেষে স্বাধীন।
ভেতরে সে যেন একটু ভয় পেয়ে গেছে।
নিজের জন্য বাঁচা কি স্বার্থপরতা?
নিজের জন্য বাঁচার কথা বললেই একটা ভয় আসে।
তাহলে কি পরিবারকে ছেড়ে দিতে হবে?
দায়িত্ব থাকবে না?
শুধু নিজের কথাই ভাবতে হবে?
না।
নিজের জন্য বাঁচা মানে কাউকে ফেলে যাওয়া নয়। বরং নিজের জীবনটাকেও জীবনের অংশ হিসেবে স্বীকার করা।
পরিবারের জন্য সময় থাকবে। কাজ থাকবে। দায়িত্ব থাকবে।
কিন্তু তার মাঝেও নিজের জন্য একটা বিকেল থাকতে পারে।
একটা বই থাকতে পারে।
পুরোনো কোনো শখ ফিরে আসতে পারে।
বন্ধুর সঙ্গে চা খেতে বসা যেতে পারে।
কোনো এক সকালে কোনো কারণ ছাড়াই হাঁটতে বের হওয়া যেতে পারে।
জীবনকে সবসময় প্রয়োজনের তালিকা দিয়ে মাপতে হয় না।
কিছু জিনিসের কোনো ব্যবহারিক মূল্য নেই। তবু সেগুলো মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে।
“পরে” শব্দটারও একটা বয়স আছে
একটা সময় আসে, যখন আমরা বুঝতে পারি—সবকিছুর জন্য পরে নেই।
যে মানুষটির সঙ্গে দেখা করব বলে রেখেছিলাম, সে হয়তো আর নেই।
যে শরীর নিয়ে পাহাড়ে উঠব ভেবেছিলাম, সে হয়তো আর আগের মতো নেই।
যে স্বপ্নটা দশ বছর পর পূরণ করব ভেবেছিলাম, দশ বছর পর হয়তো সেটার জন্য আমাদের আগ্রহই থাকবে না।
সময় শুধু চলে যায় না।
সময় আমাদের বদলে দেয়।
তাই নিজের জীবনের সব ইচ্ছাকে ভবিষ্যতের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া ঠিক নয়।
কিছু কাজ এখনই করতে হয়।
কাউকে ভালোবাসি—বলতে হয়।
কাউকে ক্ষমা করতে চাই—করতে হয়।
কোথাও যেতে চাই—যতটা সম্ভব যেতে হয়।
কিছু লিখতে চাই—লিখতে বসতে হয়।
একটা পুরোনো স্বপ্ন এখনও মনে পড়ে—তাহলে তার দরজায় অন্তত একবার কড়া নাড়তে হয়।
কারণ জীবন শেষ হয়ে যাওয়ার আগে সবসময় বড় কোনো ঘটনা ঘটে না।
কখনো শুধু একদিন পেছনে তাকিয়ে মনে হয়,
“আমি তো এতদিন বেঁচে ছিলাম। কিন্তু নিজের জন্য বেঁচেছিলাম কবে?”
হয়তো আজই সেই প্রশ্নটা করার সময়।
সব দায়িত্ব ছেড়ে নয়। সব সম্পর্ক ভেঙে নয়। শুধু নিজের জীবনটাকেও জীবনের মধ্যে একটু জায়গা দিয়ে।
কারণ আমরা সারাজীবন একটা কথাই বলে এসেছি “পরে করব।”
অথচ জীবনটা একদিন থেমে গিয়ে খুব শান্তভাবে জানিয়ে দেয়,
পরে বলে আসলে কোনো দিন নেই।
পরে করব।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।