নিজের বিরুদ্ধে নিজেই
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণমূলক লেখা | ২৭ অক্টোবর ২০২৬
সকালে অফিসে ঢোকার সময় রাকিব সহকর্মীকে সালাম দিল। লোকটি কম্পিউটারের পর্দা থেকে চোখ তুলল না। রাকিব দ্বিতীয়বার কিছু বলল না। নিজের চেয়ারে বসে মনে মনে ভাবল, মানুষটা আজকাল তাকে এড়িয়ে চলছে।
দুপুরে বস সবার সামনে তার কাজের একটা ভুল ধরিয়ে দিলেন। ভুলটা সত্যিই হয়েছিল। তবু কথাটা শুনে রাকিবের মুখ গরম হয়ে উঠল। তার মনে হলো, বস বুঝি তাকে ছোট করার সুযোগ খুঁজছিলেন।
বিকেলে স্ত্রী ফোন করে বললেন, ফেরার পথে বাজার থেকে কিছু জিনিস নিয়ে যেতে। রাকিব ক্লান্ত গলায় বলল, ‘সারাদিন অফিস করে বাড়ি ফিরছি, একটু শান্তি নেই?’
ফোন রাখার পর তার বিরক্তি আরও বেড়ে গেল। অফিসে সম্মান নেই, বসের কাছে মূল্য নেই, বাড়িতেও কেউ তার ক্লান্তিটুকু বোঝে না।
বাড়ি ফিরে স্ত্রী জানতে চাইলেন, কী হয়েছে। রাকিব বলল, ‘কিছু হয়নি।’ তারপর মুখ ঘুরিয়ে শুয়ে পড়ল।
কিন্তু তার ভেতরে কিছু একটা চলতেই থাকল। সকালের সহকর্মী, দুপুরের বস আর বিকেলের ফোন—তিনটি আলাদা ঘটনা তার মনে এক হয়ে গেল। সে নিজের অজান্তেই একটা গল্প তৈরি করে ফেলল: কেউ তাকে সম্মান করে না, কেউ তার কথা ভাবে না।
রাতে ঘুমানোর চেষ্টা করেও পারল না। সহকর্মী কেন তাকাল না, বস কেন সবার সামনে ভুল ধরলেন, স্ত্রী কেন তার ক্লান্তি বুঝলেন না—একটার পর একটা প্রশ্ন ঘুরতে লাগল। প্রতিটি ঘটনার নতুন ব্যাখ্যা তৈরি হলো, আর প্রতিটি ব্যাখ্যাই তাকে আরও ক্ষুব্ধ করে তুলল।
অথচ দিনের ঘটনাগুলো বদলানোর ক্ষমতা তার ছিল না। কিন্তু সেগুলোর অর্থ কী হবে, তা নিয়ে নিজের মনে সে বারবার বিচার বসাচ্ছিল।
ঘটনা আর গল্প
সহকর্মী কথা বলেননি—এটি একটি ঘটনা। তিনি রাকিবকে অপছন্দ করেন—এটি তার অনুমান।
বস ভুল ধরিয়ে দিয়েছেন—এটিও একটি ঘটনা। তিনি রাকিবকে অপমান করতে চেয়েছেন—এটি তার মনে তৈরি হওয়া ব্যাখ্যা।
স্ত্রী বাজারের কথা বলেছেন। কিন্তু রাকিব ধরে নিয়েছে, স্ত্রী তার ক্লান্তির কোনো মূল্য দেন না।
প্রতিটি ক্ষেত্রে সে যা ঘটেছে, তার সঙ্গে এমন কিছু অর্থ জুড়ে দিয়েছে, যার সত্যতা সে জানে না। তারপর সেই অর্থকেই সত্য ধরে কষ্ট পেয়েছে।
আমরা অনেক সময় নিজের মনেও এমনটা করি। কেউ উত্তর দিতে দেরি করলে ভাবি, সে আর আগের মতো নেই। কোনো কাজে ভুল হলে মনে করি, সবাই আমাদের অযোগ্য ভাবছে। কাছের মানুষটি নিজের মতো করে কোনো সিদ্ধান্ত নিলে ধরে নিই, আমাদের গুরুত্ব কমে গেছে।
ঘটনাটি হয়তো সামান্য। কিন্তু তার সঙ্গে জুড়ে দেওয়া অর্থটি আমাদের পুরো দিন নষ্ট করে দিতে পারে।
এর অর্থ এই নয় যে মানুষের আচরণে কখনো অবহেলা থাকে না, কিংবা সব কষ্টই কল্পনা। রাকিবের বস সত্যিই অন্যায় করতে পারেন, সহকর্মীও হয়তো তাকে এড়িয়ে চলছেন। কিন্তু নিশ্চিত না হয়েই সবচেয়ে কষ্টদায়ক ব্যাখ্যাটি বেছে নেওয়ার কারণে সে এমন এক লড়াইয়ে নেমেছে, যার প্রতিপক্ষ সম্পর্কে তার ধারণাই অসম্পূর্ণ।
যে রাতটা তার নিজের ছিল
পরদিন অফিসে গিয়ে রাকিব জানতে পারল, আগের দিন সহকর্মীর বাড়িতে পারিবারিক সমস্যা হয়েছিল। তাই তিনি কারও সঙ্গে ঠিকমতো কথা বলেননি।
বসের কাছে কাজের ভুলটি সংশোধন করে দিলে তিনি শুধু বললেন, ‘এবার ঠিক হয়েছে।’
স্ত্রীও আগের দিনের কথার প্রসঙ্গ তুললেন না। স্বাভাবিকভাবেই জানতে চাইলেন, দুপুরে কী খেয়েছে।
রাকিবের মনে পড়ল, আগের রাতে সে কতক্ষণ জেগে ছিল। কতবার একই কথাগুলো মনে মনে বলেছে, কত অভিযোগ জমিয়েছে, কতটা রাগ নিয়ে স্ত্রীর কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে শুয়েছে।
সেদিন রাকিব বুঝেছিল, সারাদিন কেউ তার বিরুদ্ধে ছিল না। সারাদিন সে নিজেই নিজের বিরুদ্ধে ছিল।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।