বাবার কাঁধেই লুকিয়ে থাকে সন্তানের পৃথিবী
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী | জানুয়ারি ২৬, ২০২৬
ছোটবেলায় পৃথিবীটা ছিল খুব উঁচু। দরজার হাতল, জানালার পাল্লা, বাসের ধাপ—সবই ছিল আমার উচ্চতার বাইরে। তখন বাবার কাঁধে বসলে পৃথিবীটা হঠাৎ সমান হয়ে যেত। রাস্তার ভিড়, মানুষের মুখ, দোকানের আলো—সবকিছু চোখের সমতলে চলে আসত। আজ বুঝি, ওটা শুধু উচ্চতা না, ওটা ছিল এক ধরনের নিরাপত্তা। পৃথিবীকে দেখার সাহস।
শিশুরা ভাষা শেখার আগেই নিরাপত্তা শেখে। কে ধরে রাখবে, কে ফেলে দেবে না—এই বোধটাই তাদের প্রথম দর্শন। অনেক ঘরে এই দর্শনের নাম বাবা। যিনি খুব আদর করে কথা বলেন না, কিন্তু যাঁর উপস্থিতিতে ঘরের শব্দগুলোও আলাদা হয়ে যায়। দরজা খোলার আওয়াজ, জুতোর শব্দ, কণ্ঠের ভার—এসবের মধ্যেই শিশুরা বুঝে নেয়, কেউ এসেছে যিনি আজকের রাতটা আগলে রাখবেন।
বাবারা সাধারণত গল্পের মানুষ নন। তারা ঘটনার মানুষ। সকালে বের হন, রাতে ফেরেন। মাঝখানে জীবনটা চালিয়ে আনেন। তাদের ভালোবাসা খুব কমই ঘোষণা হয়। সেটা দেখা যায় ফ্যান ঠিক করে দেওয়ায়, স্কুলের ফি সময়মতো পৌঁছে দেওয়ায়, গভীর রাতে জ্বরের ওষুধ আনতে বের হওয়ায়। এই কাজগুলোকে আমরা অভ্যাস বলি। কিন্তু শিশুর ভেতরে এগুলো মানচিত্র হয়ে বসে যায়—এই পৃথিবীতে আমার জন্য কেউ দায়িত্ব নেয়।
ভয়ের সময় মানুষ শব্দ খোঁজে না, মানুষ খোঁজে। অনেক সন্তান তাই কথা না বলেই বাবার পাশে বসে পড়ে। পরীক্ষার রেজাল্ট খারাপ, বাইরের অপমান, প্রথম বড় ভুল—এসব মুহূর্তে অনেকেই বাবার দিকে তাকায়, কিছু বলার জন্য না, ভেঙে পড়তে পারার জন্য। বাবারা সব সময় সমাধান দেন না। অনেক সময় তারা শুধু পাশে থাকেন। কিন্তু এই পাশে থাকাটাই সন্তানের ভেতরের উত্তাল জায়গাগুলোকে একটু থামায়।
বাবার কাঁধ মানে শুধু শক্ত কিছু না, বাবার কাঁধ মানে স্থির কিছু। একজন মানুষ যিনি নিজের ভয়গুলোকে পিছনে রেখে দাঁড়িয়ে থাকেন, যেন সন্তানের ভয়গুলো সামনে আসতে পারে। এই স্থিরতাই সন্তানের ভেতরে এক ধরনের ভাষা তৈরি করে। বড় হয়ে যে ভাষা বলে, “আমি পুরো ভেঙে যাইনি। আমি এখনো দাঁড়াতে পারি।”
আমাদের সমাজে বাবারা আবেগের প্রশিক্ষণ পান না। তারা জানেন দায়িত্ব, আয়, সিদ্ধান্ত। অনুভূতির কথা এলে তারা অপ্রস্তুত। অনেক বাবা সন্তানের কাঁধে হাত রাখতে জানেন না, কিন্তু সন্তানের জন্য নিজের কাঁধ ব্যবহার করতে জানেন। আমরা পরে বুঝি, তাদের এই কাঁচা প্রকাশই ছিল তাদের সম্পূর্ণ ভাষা।
শৈশবে বাবার ভূমিকা সবচেয়ে গভীর হয় ছোট ছোট মুহূর্তে। স্কুলে নামিয়ে দিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা। রাস্তায় পার করানোর সময় হাত শক্ত করে ধরা। পড়তে বসে ঘুমিয়ে পড়া সন্তানের বইটা গুছিয়ে দেওয়া। এগুলো কোনো নাটকীয় দৃশ্য না। কিন্তু এই নীরব দৃশ্যগুলোই সন্তানের ভেতরে একটা মৌলিক বিশ্বাস তৈরি করে—আমি গুরুত্বহীন না।
অনেক বাবা মনে করেন, কঠোর না হলে সন্তান মানুষ হবে না। কিন্তু সন্তান মানুষ হয় দেখে। দেখে, তার বাবা ভুল করলে কী করেন। ক্লান্ত হলে কী করেন। অন্যের সঙ্গে কেমন ব্যবহার করেন। এই দেখার মধ্য দিয়েই সন্তান শেখে, শক্ত হওয়া মানে অনুভূতিহীন হওয়া না, শক্ত হওয়া মানে ভেঙেও নিজের দায়িত্বে থাকা।
বাবা-সন্তানের সম্পর্ক গভীর হয় তখন, যখন বাবা উপদেশের জায়গা থেকে একটু নেমে আসেন। যখন তিনি শোনেন, থামান না। যখন তিনি ভুলকে চরিত্রের প্রমাণ বানান না। সন্তান তখন বাবার কাঁধকে শুধু আশ্রয় না, কথা বলার জায়গা হিসেবেও চিনতে শেখে।
সময় এখানে বড় মুদ্রা। বড় আয়োজন নয়, বড় ঘোষণা নয়। কিছু মনোযোগী সময়। ফোন নামিয়ে রাখা। প্রশ্ন করা, কিন্তু জেরা না করা। সন্তানের জগতটাকে ছোট করে না দেখা। এই সময়গুলোই বাবার কাঁধকে ভবিষ্যতের জন্য শক্ত করে।
বয়স বাড়লে কাঁধে মাথা রাখা কমে যায়। শরীরী দূরত্ব বাড়ে। আমরা নিজেরাই কাঁধ হতে শিখি। কিন্তু ভেতরের পৃথিবীতে বাবার কাঁধটা থেকে যায়। সিদ্ধান্তের আগে, ভাঙনের মুহূর্তে, অনেকেই আজও ভাবে, “বাবা হলে কী বলতেন?” এই প্রশ্নটাই প্রমাণ, সেই কাঁধ এখনো কাজ করছে।
পৃথিবী বদলায়। বাবার চুল পাকে। হাঁটার গতি কমে। কাঁধ হয়তো আর আগের মতো উঁচু না। কিন্তু সন্তানের ভেতরের পৃথিবীতে সেই কাঁধের অবস্থান বদলায় না। কারণ কোনো এক সময়, ওই কাঁধেই দাঁড়িয়ে আমরা প্রথম পৃথিবীটাকে চোখে চোখ রেখে দেখেছিলাম।
সত্যিই—বাবার কাঁধেই লুকিয়ে থাকে সন্তানের পৃথিবী।
শৈশবে সেটা ছিল উচ্চতা, যেখান থেকে দুনিয়া ছোট লাগত।
যৌবনে সেটা হয়ে ওঠে স্মৃতির আশ্রয়, যেখানে ফিরে এলে মন শান্ত হয়।
আর জীবনের সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তে, সেটা হয়ে দাঁড়ায় ভেতরের এক অটল স্তম্ভ—যার উপর দাঁড়িয়ে আমরা আবার নিজেকে সোজা করে তুলি, নিজের পায়ে ভর দিয়ে হাঁটতে শিখি।
#বাবার_কাঁধেই_লুকিয়ে_থাকে_সন্তানের_পৃথিবী
#বাবার_ভালোবাসা
#বাবা_সন্তান
#নীরব_ভালোবাসা
#বাংলালেখা
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।