লালনের মাজারে মাদক: আদর্শের ছায়ায় অবক্ষয়ের ছাপ
লেখক: মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ধরণ: বিশ্লেষণধর্মী প্রবন্ধ
তারিখ: ২০ অক্টোবর, ২০২৫
লালন ফকির—একজন ভাববাদী সাধক, যিনি তাঁর জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে মানুষকে মুক্তির, মানবতার, আর ভেদাভেদহীনতার মন্ত্র শোনাতেন।
তাঁর জীবন ছিল সরল, ত্যাগী, আর আত্মোপলব্ধির আলোয় আলোকিত। অথচ আজ, তাঁর তিরোধান দিবসে কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় তাঁর মাজার প্রাঙ্গণে যে দৃশ্য দেখা যায়—তা যেন সেই মানবতাবাদী সাধকের ভাবধারার সঙ্গে একেবারেই অসংগত।
মাজারে এখন ঢল নামে হাজারো দর্শনার্থীর। তাদের মধ্যে কেউ ভক্ত, কেউ পর্যটক, আর কেউ আবার এসেছে উৎসবের নামে উল্লাসে মেতে উঠতে। কিন্তু এই উল্লাসের আড়ালে ছড়িয়ে পড়ছে এক অন্ধকার ছায়া—মাদক, গাঁজা, ও নেশার প্রদর্শনী।
গাঁজার ধোঁয়ায় যখন আকাশ ঢেকে যায়, তখন মনে হয়—লালনের “মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি” বাণী যেন কোথাও হারিয়ে গেছে ধোঁয়ার কুণ্ডলীতে।
লালনের দর্শন, মাদক নয়, ছিল অন্তরের মুক্তি।
লালনের জীবনচরিত পড়লে আমরা কোথাও তাঁর মাদকাসক্তি বা নেশায় আসক্তির প্রমাণ পাই না। তিনি কখনো মদ বা গাঁজাকে আধ্যাত্মিকতার অংশ হিসেবে দেখেননি। তাঁর শিক্ষা ছিল আত্মনিয়ন্ত্রণ ও মননশীলতার। তাঁর গানেই বারবার ধ্বনিত হয়েছে আত্মশুদ্ধির আহ্বান—
“মন রে, তুই নিজেরে চেনা না রে…”
এই ‘নিজেকে চেনা’র সাধনাই ছিল তাঁর আসল পথ। তাই যারা আজ লালনের নামে মাদককে আধ্যাত্মিকতার অংশ বলে চালাচ্ছেন, তারা লালন দর্শনের পরিপূর্ণ বিকৃতি ঘটাচ্ছেন।
উৎসব না অবক্ষয় না কি এটা সংস্কৃতির বিকলন।
লালনের তিরোধান দিবস এখন পরিণত হয়েছে এক উৎসবে। অথচ সেই উৎসবে নেই তাঁর ভাবধারা, নেই মানবতার কথা। বরং আছে বাজারচিন্তা, চটুল সঙ্গীত, আর এক শ্রেণির মানুষ যারা ভক্তির আড়ালে বাণিজ্য করছে।
২০২৪ সালের প্রতিবেদনে (সূত্র: প্রথম আলো, ১৭ অক্টোবর ২০২৪) বলা হয়—“লালনের তিরোধান দিবসে ছেঁউড়িয়ায় গাঁজার ধোঁয়ায় চারদিক ঢেকে যায়, প্রশাসনের উপস্থিতিতেও নেশার উৎসব চলে প্রকাশ্যে।”
এ যেন সমাজের সেই মুখ, যেখানে ‘সংস্কৃতি’ শব্দটি হারিয়ে গেছে ‘মজা’ নামের এক কৃত্রিম উল্লাসে।
এ কার দায়? প্রশাসন, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, স্থানীয় কর্তৃপক্ষ—সবাই জানে এ ঘটনা।
তবুও প্রতিবছর একই দৃশ্য দেখা যায়। ভক্তের ভিড় সামলাতে গিয়ে কেউ যেন দায়িত্ব নিতে চায় না এই অবক্ষয় ঠেকানোর। কিন্তু প্রশ্ন হলো—আমরা কি লালনের মাজারকে এক ‘আধ্যাত্মিক মেলা’ বানাবো, নাকি রাখবো সেটিকে এক ‘চেতনার তীর্থ’?
লালন বলেছিলেন—
“ধর্ম বলে কেহ নয়, মানুষ বলে কেহ নয়, সবাই মিলে মানুষ হই।”
এই মানবতাবাদী বাণীই ছিল তাঁর জীবনসার। আজ যদি তাঁর তিরোধান দিবস মাদক আর উচ্ছৃঙ্খলতার উৎসবে পরিণত হয়, তাহলে তা শুধু লালনের প্রতি নয়, আমাদের নিজেদের আত্মার প্রতিও এক অবমাননা।
সময়ের দাবি—লালনের মাজারকে মাদকমুক্ত ঘোষণা করা হোক, তাঁর আদর্শ পুনরুদ্ধারের আন্দোলন শুরু হোক। কারণ, লালন বেঁচে আছেন এখনো—তাঁর গানে, তাঁর দর্শনে, তাঁর ভাবনায়। শুধু আমাদের মনেই যেন সেই লালনকে আবার জাগাতে হয়।
#লালন_সাঁই #মাদকমুক্ত_সংস্কৃতি #মানুষ_ভজলে_সোনার_মানুষ #সত্য_ও_চেতনার_উৎসব #বাংলার_আত্মা
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।