দুনিয়াটা বড়ই স্বার্থপর
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণমূলক লেখা | ৯ অক্টোবর ২০২৬
দুনিয়াটা কি সত্যিই বড় স্বার্থপর?
কাউকে বিপদে পড়তে দেখলে আমরা অনেক সময় বলি, “মানুষটা বদলে গেছে।” যে মানুষটা একসময় সবার প্রয়োজনে ছুটে বেড়াত, সে এখন নিজের কথাই ভাবে। যে বন্ধু বিপদে পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, সে ফোন ধরে না। যে আত্মীয় একসময় খুব আপন ছিল, প্রয়োজনের সময় তাকেও আর খুঁজে পাওয়া যায় না।
তখন মনে হয়, মানুষ আসলে স্বার্থপর। যতক্ষণ প্রয়োজন থাকে, ততক্ষণ সম্পর্ক থাকে। প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে মানুষও দূরে সরে যায়।
কিন্তু সব গল্প কি এক রকম?
যে মানুষটা আজ অন্যের জন্য কিছু করতে পারছে না, সে কি বরাবরই এমন ছিল? নাকি জীবনের কোনো এক পর্যায়ে তার নিজের অবস্থাই এমন হয়েছে যে অন্যের দিকে হাত বাড়ানোর আগে নিজের সংসারটা সামলাতে হচ্ছে?
সব স্বার্থপরতার পেছনে অসহায়ত্ব থাকে না। কেউ নিজের সুবিধার জন্য অন্যকে ব্যবহার করে, কেউ বিপদে পড়া মানুষের দুর্বলতার সুযোগ নেয়, কেউ আবার সম্পর্ককেও লাভ-ক্ষতির হিসাবে বিচার করে। এদের স্বার্থপরতা বাস্তব। কিন্তু সবাইকে একই চোখে দেখলে মানুষের আচরণের পেছনের সত্যটা বোঝা যায় না।
যে ছেলেটা একসময় বন্ধুর বিপদে নিজের পকেটের শেষ টাকাটাও দিয়ে দিত, তার জীবনেও একদিন কঠিন সময় আসতে পারে। মাসের শেষ সপ্তাহে বাজার করার টাকা থাকে না। সন্তানের স্কুলের বেতন বাকি পড়ে। বাড়িওয়ালা ভাড়ার জন্য তাগাদা দেন। নিজের সংসার চালাতেই তাকে হিমশিম খেতে হয়।
ঠিক সেই সময় পুরোনো এক বন্ধুর ফোন আসে।
“দোস্ত, একটু টাকা ধার দিতে পারবি? খুব বিপদে পড়েছি।”
ছেলেটা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলে, “এই মুহূর্তে পারব না রে।”
ফোনের ওপাশের বন্ধু কষ্ট পায়। হয়তো ভাবে, মানুষটা এত বদলে গেল! অথচ সে জানে না, ফোনটা রাখার পর ছেলেটা নিজের মানিব্যাগ খুলে দেখবে। কয়েকটা পুরোনো রসিদ আর কিছু খুচরা টাকা ছাড়া সেখানে আর কিছুই নেই।
যে মানুষটা একসময় সাহায্য করত, সে আজ সাহায্য করতে পারছে না। এই দুই অবস্থার মধ্যে পার্থক্য আছে।
মানুষের পরিবর্তন সব সময় মনের পরিবর্তন নয়। কখনো কখনো পরিস্থিতি তার সামর্থ্য কেড়ে নেয়।
মানুষ তখনই স্বার্থপর হয়, যখন দেওয়ালে তার পিঠ ঠেকে যায়—কথাটা কিছু মানুষের ক্ষেত্রে সত্যি হতে পারে, কিন্তু সবার ক্ষেত্রে নয়। কেউ নিজের বিপদের মধ্যেও অন্যের কথা ভাবে। আবার কেউ সামান্য অসুবিধা হলেই সম্পর্কের দায় এড়িয়ে যায়। তাই কাউকে বুঝতে হলে তার অসহায়ত্ব দেখতে হবে, আবার তার আচরণের দায়টুকুও ভুলে গেলে চলবে না।
আমাদের সমাজে ভালো মানুষ হওয়ার একটা অদৃশ্য চাপ আছে। অন্যের কথা শুনতে হবে, বিপদে পাশে দাঁড়াতে হবে, প্রয়োজনে টাকা ধার দিতে হবে। নিজের কাজ ফেলে অন্যের কাজে ছুটতে হবে। কেউ নিজের সীমাবদ্ধতার কথা বললে প্রশ্ন ওঠে, “এতটুকু সাহায্যও করতে পারলে না?”
কিন্তু যে মানুষটা নিজেই ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়ছে, তার কাছে কতটা আশা করা যায়?
একজন মা হয়তো সারা জীবন সন্তানদের জন্য নিজের ইচ্ছাগুলো বিসর্জন দিয়েছেন। সবার পছন্দের খাবার রান্না করেছেন, অসুস্থ হলে রাত জেগেছেন, নিজের প্রয়োজনের কথা বলতে গিয়েও থেমে গেছেন। বয়স বাড়ার পর একদিন নিজের চিকিৎসার জন্য ছেলের কাছে টাকা চাইলেন।
ছেলে বিরক্ত হয়ে বলল, “এখন এত খরচ কীভাবে চালাব?”
মায়ের কষ্টটা শুধু টাকার অভাবে নয়। কষ্টটা এই যে, এত বছর যাদের কথা ভেবে নিজের জীবন কাটালেন, আজ তাদের কাছে নিজের প্রয়োজনটুকু বলতেও তাঁকে সংকোচ করতে হচ্ছে।
ছেলেরও হয়তো আর্থিক চাপ আছে। আয় কম, খরচ বেশি, নিজের সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা। কিন্তু সেই চাপের মধ্যেও মায়ের সঙ্গে একটু নরম করে কথা বলা যেত। সাহায্য করা সম্ভব না হলে নিজের অবস্থাটা বোঝানো যেত। অভাব মানুষকে অসহায় করতে পারে, কিন্তু অন্যকে অপমান করার সব দায় অভাবের ওপর চাপানো যায় না।
নিজের প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেওয়া আর স্বার্থপর হওয়া এক কথা নয়।
সব দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে না নেওয়া, সব অনুরোধ রাখতে না পারা, নিজের সংসার ও শরীরের যত্ন নেওয়াও জরুরি। যে মানুষটা সবাইকে সামলাতে গিয়ে একসময় নিজেই অসুস্থ হয়ে পড়ে, তারও থামার অধিকার আছে। সব সময় দিতে দিতে একদিন তার হাত খালি হয়ে যেতে পারে। তখন নিজের জন্য কিছু রেখে দেওয়া অন্যায় নয়।
কিন্তু নিজের প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে যখন অন্যের প্রয়োজনকে তুচ্ছ করি, তখনই সমস্যা তৈরি হয়।
নিজের কষ্টকে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কষ্ট বলে মনে হয়। নিজের ব্যস্ততা জরুরি, অন্যের অপেক্ষা বিরক্তিকর। নিজের ভুলের পেছনে আমরা পরিস্থিতির ব্যাখ্যা খুঁজি, অথচ অন্যের ভুল দেখলেই তার চরিত্র নিয়ে সিদ্ধান্ত দিয়ে বসি।
একবার নিজের জীবনেই তাকানো যাক।
কোনো বন্ধু বিপদে পড়ে টাকা চাইল। আপনি দিতে পারলেন না। হয়তো সত্যিই আপনার সামর্থ্য ছিল না। কিন্তু টাকা দিতে না পারলেও তার সঙ্গে কয়েক মিনিট কথা বলা যেত। তার সমস্যাটা শোনা যেত। সম্ভব হলে অন্য কোনো উপায় খুঁজে দেওয়ার চেষ্টা করা যেত।
সাহায্য সব সময় টাকা দিয়ে হয় না। কখনো মন দিয়ে কারও কথা শোনা, একটু সময় দেওয়া কিংবা কঠিন সময়ে তাকে একা বোধ করতে না দেওয়াও অনেক বড় সাহায্য।
আবার উল্টো ঘটনাও ঘটে। আমরা কারও কাছ থেকে বছরের পর বছর সাহায্য নিই। বিপদে সে পাশে দাঁড়ায়, প্রয়োজন হলে টাকা ধার দেয়, আমাদের কথা শোনে। একসময় তার নিজেরই সাহায্যের প্রয়োজন হয়। তখন আমরা নানা যুক্তি খুঁজতে শুরু করি। তার উপকারের কথা মনে রাখার চেয়ে নিজের অসুবিধাটাই বড় হয়ে ওঠে।
কিছু মানুষকে আমরা ভালোবাসি, যতক্ষণ তারা আমাদের জন্য কিছু করতে পারে। তারা আমাদের কথা শুনবে, প্রয়োজনের সময় টাকা দেবে, পরিচিত কারও কাছে সুপারিশ করবে, বিপদে সমাধান খুঁজে দেবে। কিন্তু মানুষটা যখন ক্লান্ত হয়ে পড়ে কিংবা নিজেই সাহায্য চায়, তখন তার প্রতি আমাদের আগ্রহ কমে যায়।
যেন তার কাছ থেকে আর কিছু পাওয়ার নেই, তাই সম্পর্কটাও আর আগের মতো জরুরি নয়।
এটাই স্বার্থপরতার আরেকটি রূপ। এখানে অসহায়ত্বের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে অন্যকে নিজের সুবিধার অংশ হিসেবে দেখার অভ্যাস।
তবে কঠিন অভিজ্ঞতাও মানুষকে বদলে দেয়। দীর্ঘদিনের অভাব, অপমান, প্রতারণা কিংবা বারবার হতাশ হওয়ার পর কেউ কেউ নিজেকে গুটিয়ে নেয়। যে মানুষটা একসময় সহজে বিশ্বাস করত, সে পরে কাউকে নিজের কথা বলতে চায় না। যে সবার প্রয়োজনে ছুটে যেত, সে একসময় নিজের দরজাটাও বন্ধ রাখে।
বাইরে থেকে মনে হয়, মানুষটা অহংকারী হয়ে গেছে। অথচ তার ভেতরে হয়তো এমন কিছু অভিজ্ঞতা জমে আছে, যার কথা সে কাউকে বলতে পারেনি।
তবু কষ্ট পেয়েছে বলেই অন্যকে কষ্ট দেওয়ার অধিকার কেউ পায় না। অতীতের আঘাত তার আচরণ ব্যাখ্যা করতে পারে, কিন্তু সব আচরণকে ন্যায্য করে না। নিজের সীমা রক্ষা করতে গিয়ে কাউকে অপমান করার প্রয়োজন নেই। সাহায্য করতে না পারলেও কাউকে ছোট না করে নিজের অবস্থাটা বোঝানো যায়।
মানুষের পরিচয় শুধু সে কতটা দিতে পারে, তা দিয়ে নির্ধারিত হয় না। দিতে না পারার সময় সে অন্যের সঙ্গে কেমন আচরণ করে, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ।
যে মানুষটা বিপদে পড়ে সাহায্য করতে পারল না, তার প্রতি সহানুভূতি থাকা উচিত। আর যে মানুষটা সাহায্য করার সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও অন্যের অসহায়ত্বকে নিজের সুবিধার জন্য ব্যবহার করে, তার আচরণকে প্রশ্ন করাও জরুরি।
সবাইকে স্বার্থপর বললে বিচার করা সহজ হয়, কিন্তু সত্যটা বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে।
দুনিয়ায় স্বার্থপর মানুষ আছে, নিঃস্বার্থ মানুষও আছে। একই মানুষের মধ্যেও কখনো এই দুই প্রবণতা দেখা যায়। পরিস্থিতি তাকে বদলে দিতে পারে, আবার কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও নিজের আচরণের দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
তাই প্রশ্নটা শুধু কে স্বার্থপর আর কে নয়, তা নিয়ে নয়। প্রশ্নটা হলো, নিজের পিঠ যখন দেয়ালে ঠেকে যায়, তখন আমরা কেমন মানুষ হয়ে উঠি?
নিজের অভাবের সময়ও কি অন্যের অসহায়ত্ব বুঝতে পারি? কাউকে সাহায্য করতে না পারলে অন্তত তাকে অসম্মান না করে ফিরিয়ে দিতে পারি? আর যখন আমাদের হাতে দেওয়ার মতো সামর্থ্য থাকে, তখন কি অন্যের প্রয়োজনটুকুও দেখি, নাকি শুধু নিজের সুবিধার হিসাব করি?
জীবনে এমন সময় আসতে পারে, যখন নিজের সমস্যা ছাড়া আর কিছু ভাবার শক্তি থাকে না। তখন নিজেকে সামলে নেওয়াই জরুরি। কিন্তু নিজের জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করতে গিয়ে অন্যের মর্যাদাটুকু কেড়ে নেওয়ার প্রয়োজন নেই।
দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে মানুষ নিজের দিকে ফিরতে বাধ্য হয়। কেউ নিজের শেষ শক্তিটুকু দিয়ে বাঁচার চেষ্টা করে, কেউ নিজের জায়গা বাঁচাতে অন্যকে সরিয়ে দেয়। পরিস্থিতি দুজনেরই কঠিন হতে পারে। কিন্তু সেই পরিস্থিতিতে কে কী বেছে নেয়, সেখানেই মানুষের পরিচয় ধরা পড়ে।
সবাই স্বার্থপর নয়। কেউ নিজের স্বার্থ বাঁচাতে অন্যকে ভুলে যায়, আর কেউ নিজের কষ্টের মধ্যেও চেষ্টা করে অন্যের কষ্টটা না বাড়াতে।
পার্থক্যটা হয়তো এখানেই।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।