পথের পাঁচালী আমরা গল্প পড়ি কিন্তু পাঠ শিখি না
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী। মার্চ ২৯,২০২৬
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের শেষ করার পর মনে হয়, আমরা একটি গল্প জানলাম। এই জানার ভেতরেই কোথাও পাঠটি থেমে যায়। কারণ বইটি পড়ার সময় আমরা দৃশ্যগুলোকে দেখি, কিন্তু সেগুলোর ভেতরে যে ধীরগতির জীবন প্রবাহিত হয়, সেটি খুব কমই লক্ষ্য করি। প্রতিটি মুহূর্ত আলাদা করে গুরুত্বপূর্ণ মনে না হলেও, একসঙ্গে তারা একটি নিরব কিন্তু ঘন বাস্তবতা তৈরি করে।
বাড়ির ভেতরের পরিবেশ সেই বাস্তবতার প্রথম স্তর। রান্নাঘরের ধোঁয়া দেয়ালে লেগে থাকে, মেঝেতে পায়ের শব্দ শোনা যায়, দরজার ফাঁক দিয়ে আলো এসে পড়ে নির্দিষ্ট জায়গায়। এই সবকিছুর মাঝখানে সর্বজয়া চলাফেরা করেন। তার কাজের গতি থেমে নেই, কিন্তু মন পুরোপুরি স্থিরও নয়। খরচের হিসাব, ঘরের দায়, আর ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা—এই তিনটি বিষয় তার ভেতরে সবসময় ঘোরাফেরা করে। অপু যখন তার কাছাকাছি আসে, তখন সেই উপস্থিতি তিনি পুরোপুরি উপেক্ষা করতে পারেন না, আবার সব সময় সাড়া দেনও না। তার প্রতিক্রিয়া অনেক সময় সংক্ষিপ্ত, কখনো কিছু বলেন না।
জানালার পাশে অপু দাঁড়িয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকে। বাইরে কোনো শব্দ ভেসে এলে সে থেমে শোনে। চলতে থাকা জীবনের মাঝখানে তার এই থেমে যাওয়া তার নিজের মতো করে পৃথিবীকে বোঝার চেষ্টা। সে বইয়ের নিয়মে শেখে না; বরং যা চোখে পড়ে, সেটিকেই নিজের অভিজ্ঞতায় পরিণত করে। তার এই দেখার মধ্যে কোনো তাড়াহুড়ো নেই, কোনো পরিকল্পনাও নেই। শুধু সময়ের সঙ্গে তার সম্পর্ক তৈরি হয়।
দুর্গা এই জগতের ভেতরে অন্য রকম উপস্থিতি নিয়ে আসে। সে অপুর সঙ্গে সময় কাটায়, কখনো তাকে আগলে রাখে, আবার কখনো হঠাৎ রেগে গিয়ে দূরে সরে যায়। তাদের এই ওঠানামা কোনো নিয়ম মেনে চলে না। একসঙ্গে থাকা তাদের কাছে স্বাভাবিক, আর আলাদা হয়ে যাওয়া তাদের কাছে অস্বস্তিকর। তারা একে অপরের সঙ্গে কথা না বলেও বোঝে, আবার ছোট ছোট বিষয়ে একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। এই সম্পর্কের ভেতরে কোনো আনুষ্ঠানিকতা নেই, তবু তার প্রভাব স্পষ্ট।
সর্বজয়ার ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও সূক্ষ্ম। অপুকে বাইরে যেতে বারণ করার সময় তার কণ্ঠে দৃঢ়তা থাকে। কিন্তু সেই দৃঢ়তা স্থায়ী নয়। অপু ফিরে এলে তিনি অনেক সময় সরাসরি কিছু বলেন না; আবার তার দিকে তাকিয়েও থাকেন না। রান্নার কাজে ফিরে যান। এই কাজের মধ্যে দিয়ে তিনি নিজের অবস্থান ধরে রাখেন। তার আচরণে কঠোরতা এবং সহনশীলতা আলাদা আলাদা ভাবে প্রকাশ পায় না—দুটো একসঙ্গে মিশে থাকে, প্রতিক্রিয়ার ভেতরে।
এই উপন্যাসের ভেতরে কোনো জায়গাতেই পাঠককে বলে দেওয়া হয় না কী বোঝা উচিত। দৃশ্যগুলো নিজের অবস্থানে স্থির থাকে, আর পাঠক সেই দৃশ্যগুলোর ভেতর দিয়ে ধীরে ধীরে প্রবেশ করে। কোনো ঘটনা বড় করে ব্যাখ্যা করা হয়নি, তবু প্রতিটি আচরণ তার পেছনের মানসিক অবস্থার ইঙ্গিত বহন করে। এই ইঙ্গিতগুলো সরাসরি না হলেও পড়া যায়, যদি চোখ কিছুক্ষণ থেমে থাকে।
আমরা যখন এই বইটি পড়ি, তখন শুরুতে গল্পের দিকে মনোযোগ দিই। চরিত্রগুলো কী করছে, কোথায় যাচ্ছে, কী ঘটছে—এই তথ্যগুলো আমাদের প্রথম আগ্রহের জায়গা। কিন্তু কিছুদূর এগোনোর পর আমরা বুঝতে শুরু করি, এই বইয়ের শক্তি ঘটনাগুলোতে নয়, বরং সেই ঘটনাগুলোর ভেতরে লুকিয়ে থাকা সময়ের প্রবাহে। সেই প্রবাহের মধ্যে সম্পর্কগুলো তৈরি হয়, দূরত্ব তৈরি হয়, আবার কখনো হঠাৎ কাছাকাছি এসে দাঁড়ায়।
একটি জানালার সামনে অপু দাঁড়িয়ে আছে, আর তার পেছনে সর্বজয়া। এই দুই অবস্থানের মাঝখানে কোনো কথা নেই, তবু একটি সম্পর্ক আছে। অপু বাইরে তাকিয়ে থাকে, সর্বজয়া ভেতরে কাজ করে। তাদের দৃষ্টি একই দিকে নয়, তবু একই ঘরের ভেতরে তারা অবস্থান করে। এই সহাবস্থান কখনো স্পষ্ট হয় না, কিন্তু প্রতিদিনের পুনরাবৃত্তির ভেতরে সেটাই ধরা পড়ে।
গল্প শেষ হওয়ার পর আমরা হয়তো দৃশ্যগুলো মনে রাখি, কিন্তু সেই দৃশ্যগুলোর ভেতরে যে ধীর গতি, যে শব্দহীন টানাপোড়েন কাজ করে, সেটি থেকে যায় অনেকটা অদেখা। আমাদের সামনে কোনো ব্যাখ্যা দাঁড় করায় না; বরং কিছু মুহূর্ত রেখে যায়, যেগুলো নিজের মতো করে বুঝে নেওয়ার জন্য সময় লাগে। আর সেই সময়ের ভেতরেই পাঠ ধীরে ধীরে তৈরি হয়—যা প্রথমে দেখা যায় না, কিন্তু ঘুম ভাঙলেই মনে পড়ে।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।