টাকা আর জীবন
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী। ০৩,জুন ২০২৬
দোকানের সামনে ছেলেটা জুতাটা হাতে নিল।
একবার এদিক-ওদিক ঘুরিয়ে দেখল। তারপর দামটা শুনে থমকে গেল। জুতাটা ঠিক সেখানেই রেখে বের হয়ে গেল—যেন কিছুই হয়নি।
কিন্তু আসলে তখনই একটা সিদ্ধান্ত হয়ে যায়।
টাকার অভাবকে আমরা সাধারণভাবে “অভাব” বলি। কিন্তু বাস্তবে এটা অনেক বেশি জটিল—এটা মানুষের প্রতিদিনের বাছাই করার ক্ষমতাকে ছোট করে আনে।
সবকিছু একসাথে করা যায় না। এই সত্যটাই ধীরে ধীরে জীবনের অভ্যাস হয়ে যায়।
মাসের শেষের দিকে অনেক ঘরে একটা নির্দিষ্ট দৃশ্য দেখা যায়। বাজারের ব্যাগ হাতে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে চাল, অন্যদিকে ডাল। মাঝখানে হিসাব। দুইটার দাম মেলানো যাচ্ছে না। ফলে একটা বাদ পড়ে।
এটা শুধু কেনাকাটা না। এটা প্রতিদিনের ছোট ছোট হারানো।
শিক্ষার দিকে তাকালে এই চাপটা আরও পরিষ্কার হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ফর্ম ফিলাপের শেষ দিন। ছেলেটা লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। হাতে কাগজ, কিন্তু পকেটে পুরো টাকা নেই। সে জানে, আজ না দিলে আর সুযোগ থাকবে না। পেছনে লাইন বাড়ছে, সামনে সময় কমছে।
এখানে সমস্যা শুধু টাকা না—একই সময়ে সবকিছু একসাথে চাওয়া যায় না।
ক্লাস, ফি, বাসভাড়া—সব একই মাসে এসে দাঁড়ায়। সময় আলাদা, কিন্তু চাপটা একসাথে এসে দাঁড়ায়।
তাই অনেকেই মাঝপথে সরে যায়।
এই সরে যাওয়াকে আমরা প্রায়ই ব্যক্তিগত ব্যর্থতা হিসেবে দেখি। কিন্তু বাস্তবে এটা ব্যক্তিগত না—এটা পরিস্থিতির চাপ।
চিকিৎসার ক্ষেত্রেও একই ছবি।
ডাক্তারের চেম্বারের সামনে বসে থাকা মানুষটা জানে তাকে ভেতরে যেতে হবে। কিন্তু হিসাবটা মাথার ভেতর ঘুরছে—টেস্ট, ওষুধ, ফলোআপ। সব মিলিয়ে একটা অংক দাঁড়ায়।
অনেক সময় সেই অংকই সিদ্ধান্ত বদলে দেয়।
মানুষ অপেক্ষা করে। আর অপেক্ষার ভেতরেই রোগটা সময় পায়।
এই চাপ শুধু বাইরে থেমে থাকে না। ভেতরে ঢুকে যায়।
ধীরে ধীরে মানুষ নিজের অবস্থানকে অন্যদের সঙ্গে মেলাতে শুরু করে। কারও নতুন জামা, কারও নতুন ফোন, কারও সহজ হাসি—সবকিছু একটা তুলনার রেখা হয়ে যায়।
নিজের জীবনটা তখন একটু ভারী লাগে।
এই ভারের কোনো শব্দ নেই, কিন্তু অনুভবটা পরিষ্কার।
পরিবারের ভেতরেও এই ভার ছড়িয়ে পড়ে।
রাতের খাবারের টেবিলে কেউ বেশি কথা বলে না। একটা ছোট খরচ নিয়ে কথা বাড়ে।
আসলে সমস্যা টাকা না সব সময়। সমস্যা হলো, চাপ জমে গেলে সহনশীলতা কমে যায়।
মানুষ তখন কারণ খোঁজে না, শুধু প্রতিক্রিয়া দেয়।
এভাবেই সম্পর্কের ভেতরে দূরত্ব তৈরি হয়—নীরবে।
শেষে যদি আবার সেই দোকানের সামনে ফিরে যাই—
ছেলেটা জুতাটা রেখে বের হয়ে গিয়েছিল।
ওটা শুধু একটা জুতা ছিল না। ওটা ছিল একটা না-হওয়া সিদ্ধান্ত। একটা পিছিয়ে দেওয়া ইচ্ছা।
আর অনেক সময়, এমন হাজারো ছোট না-বলা মুহূর্ত মিলেই একটা জীবন দাঁড়ায়।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।