তুলনা থেকে বিশ্বাসের পথে
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী | ০৩ মার্চ ২০২৫
বিকেল। ধানমন্ডির ছোট কফিশপের জানালায় হালকা বৃষ্টি। কাচে জমে থাকা জলবিন্দুগুলো বৃষ্টির গল্প বলতে বলতেই মনে হলো—আমরা সন্তানদের দেখি ঠিকই, কিন্তু কতটা বুঝি?
সেদিন অভিকের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। তার বড় মেয়ে রিমা পড়ায় খুব ভালো ছিল। হঠাৎ ফল খারাপ। ছোট মেয়ে তিথি ভীষণ চুপচাপ, নিজের ঘরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। আমি অভিককে জিজ্ঞেস করলাম, "কী করেছিলে তখন?"
অভিক হেসে বলল, "প্রথমে যা সবাই করে—তুলনা।"
একদিন রিমার সামনে সে বলেছিল, "তোমার কাজিন তানিয়া মেডিক্যালে চান্স পেয়েছে।"
রিমা কিছু বলেনি। রাতে খাবারের প্লেট অর্ধেক খাওয়া ছিল। পরদিন সে স্কুলেও যায়নি। সেই রাতে অভিক ঘুমাতে পারেননি। তিনি ভেবেছিলেন, হয়তো রিমা অসুস্থ। কিন্তু তিন দিন পর যখন রিমার কাউন্সেলরের সঙ্গে কথা হলো, তখন বুঝেছিলেন—তুলনা উৎসাহ নয়, আঘাতও হতে পারে।
সেই রাতে তিথি তার ঘরে বসে শুধু তার ডায়েরিতে লিখছিল। অভিক বলল, সে কখনো খোলা দরজা দিয়ে বের হতো না। মনে হচ্ছিল, সে কোনো ভুলের জন্য কেবল লজ্জা বা ভয় পেয়েছে।
কৈশোর মানে শুধু ফলাফলের বয়স নয়। শরীর ও পরিচয়ও তৈরি হয় এই সময়। কে আমি? কোথায় মানাই? কার মতো হব? এই প্রশ্নগুলো কোনো বইয়ের সিলেবাসে নেই। মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, কৈশোর কখনো দশ-বারো বছরেই শুরু হয়, আর শেষ হয় আঠারো-উনিশের দিকে। মস্তিষ্কের সেই অংশ যা সিদ্ধান্ত ও আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে, সেটি সবচেয়ে ধীরে পরিপক্ব হয়। তাই হঠাৎ রাগ, দরজা বন্ধ, অকারণ কান্না—এসব শুধু আচরণ নয়, একধরনের অস্থিরতা।
আমরা আচরণ দেখি, কারণটা দেখি না। মেয়েটা দরজা বন্ধ করেছে—হয়তো বন্ধুদের গ্রুপে তাকে বাদ দেওয়া হয়েছে। ছেলেটা পড়তে বসে না—হয়তো সে বুঝেছে গণিত তার শক্তি নয়, কিন্তু সেটা বলার ভয় পায়। এই তুলনা ভেতরে নীরব বাক্য তৈরি করে: "আমি যোগ্য নই।" আর সেই নীরবতা থেকে ক্রমে সন্তানের বিশ্বাস সরে যায় বাবা-মায়ের থেকে।
আমার নিজের অভিজ্ঞতাও মনে পড়ে। ক্লাস নাইনে একবার অঙ্কে ফেল করেছিলাম। আব্বা কিছু বলেননি, শুধু জিজ্ঞেস করেছিলেন, "কোথায় আটকে গেছ?" তারপর পাশে বসে দুইটি সমস্যা বুঝিয়েছিলেন। সেই দিন অঙ্ক শেখার চেয়ে বড় জিনিস শিখেছিলাম—ব্যর্থতা লজ্জার নয়। আজ, যখন অভিকের মতো বন্ধুরা আমার কাছে জানতে চায় কীভাবে সন্তানের সঙ্গে কথা বলতে হয়, তখন ভাবি—যদি সেদিন আব্বা বলতেন, "তোমার বন্ধু তো প্রথম হয়েছে"—হয়তো অঙ্ক নয়, আত্মবিশ্বাসটাই হারাতাম।
বিশ্বাস বড় বড় কথায় আসে না। ছোট ছোট ঘটনায় আসে।
রিমা এক রাতে বলল, "আজ বন্ধুরা আমার সঙ্গে কথা বলেনি।" যদি সঙ্গে সঙ্গে উপদেশ দিতাম, সে পরেরবার বলত না। শুধু শোনার ফলে সে আবার বলল। একদিন স্কুল থেকে ফিরে সে বলল, "আমি নিরাশ। আজ ম্যাথ টেস্টে ভালো করিনি।" অভিক বললেন, "আমি দেখছি, তুমি আক্ষেপিত।" শব্দগুলো ছোট, কিন্তু নিশ্চয়তা বড়—ভুল করলেও তুমি একা নয়।
অভিক এখন একটা নিয়ম রেখেছেন। ফল নিয়ে কথা বলার আগে রিমাকে জিজ্ঞেস করেন, "এই সপ্তাহে কোন বিষয়টা কঠিন লাগছে?" রিমা আস্তে আস্তে পড়তে বসে। কারণ সে বুঝেছে—তার সঙ্গে লড়াই নয়, তার পাশে কেউ আছে।
তিথিকেও একইভাবে ফিরে পেতে হয়েছিল। সে প্রথমে দরজা বন্ধ রাখত। একদিন অভিক শুধু জিজ্ঞেস করলেন, "আজ কী করছিলি?" তিথি চুপচাপ মাথা নাড়ল। পরের সপ্তাহে সে দরজা খোলা রেখেই পড়তে বসেছিল। এক মাস পর সে নিজে এসে বলল, "আমি আজ গণিতের ওই সমস্যা বুঝেছি।"
তুলনা নয়, ছোট সাহায্য, সঙ্গ আর শোনার অভ্যাসই সময় ধরে বিশ্বাস গড়ে তোলে।
টিনেজ সন্তানের সঙ্গে সম্পর্ক ঠিক করার কোনো এক রাতের সূত্র নেই। এটি সময় নেয়। ভুল নেয়। আবার চেষ্টা নেয়। তুলনা কমে গেলে কথা বাড়ে। কথা বাড়লে বোঝাপড়া বাড়ে। সেখান থেকেই ধীরে ধীরে বিশ্বাস জন্মায়। কখনো কোনো নির্দিষ্ট মুহূর্তে নয়—নিত্যের সাদা মেঘলা ঘটনা, শান্ত শোনার দৃষ্টি, আর দৈনন্দিন জয়গুলোই সম্পর্ক বদলে দেয়।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।