বিচারের আগেই হেরে যাওয়া রাষ্ট্র
01:27:52
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী । ২৩ মে, ২০২৬
কোনো শিশু ধর্ষণের শিকার হলে, কোনো নারী খুন হলে, কিংবা কোনো নিরীহ মানুষ প্রকাশ্যে পিটিয়ে মারা হলে—আমরা প্রায় একই দৃশ্য দেখি। কয়েকদিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম উত্তাল থাকে। টেলিভিশনের টকশোতে ক্ষোভ ঝড়ে। মানুষ বিচার চায়। মোমবাতি জ্বলে। মানববন্ধন হয়। তারপর ধীরে ধীরে সব শান্ত হয়ে যায়। কিন্তু প্রশ্নটা থেকে যায়—আমাদের আইন এত অসহায় কেন?
সমস্যাটা শুধু আইনের নয়। সমস্যাটা রাষ্ট্রের ইচ্ছাশক্তি, বিচারব্যবস্থার গতি, সামাজিক মানসিকতা এবং ক্ষমতার কাঠামোর ভেতরে বহুদিন ধরে জমে থাকা দুর্বলতার। আইন বইয়ে কঠোর শাস্তি লেখা থাকলেই বিচার প্রতিষ্ঠিত হয় না। কারণ বিচার কেবল আদালতের রায় নয়; বিচার হলো এমন এক সামাজিক আস্থা, যেখানে মানুষ বিশ্বাস করবে—অপরাধ করলে সত্যিই শাস্তি হবে।
বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় সংকট সম্ভবত এখানেই। আমরা এখন অপরাধের চেয়ে বিচারহীনতাকে বেশি স্বাভাবিক ধরে নিতে শিখে গেছি।
একটা ভয়ংকর বিষয় লক্ষ করলে দেখা যায়, আমাদের দেশে অনেক অপরাধী অপরাধ করার পরও ভীত থাকে না। কারণ তারা জানে, মামলা বছরের পর বছর চলবে। সাক্ষী হারিয়ে যাবে। প্রভাবশালী কেউ পাশে দাঁড়াবে। তদন্ত দুর্বল হবে। কিংবা মিডিয়ার আগ্রহ কমে গেলে ঘটনাটাও ধীরে ধীরে অন্ধকারে চাপা পড়ে যাবে। এই সংস্কৃতি অপরাধীদের সাহসী করে তোলে। আইন তখন কাগজে থাকে, বাস্তবে নয়।
আরও নির্মম সত্য হলো—আমাদের বিচারব্যবস্থা প্রায়ই প্রতিক্রিয়াশীল, প্রতিরোধমূলক নয়। কোনো ঘটনা ভাইরাল হলে তৎপরতা দেখা যায়। কিন্তু এমন পরিবেশ তৈরি হয় না, যেখানে অপরাধ ঘটার আগেই মানুষ ভয় পাবে। ফলে আইন অনেক সময় ন্যায়বিচারের প্রতীক না হয়ে জনরোষ ঠান্ডা করার যন্ত্রে পরিণত হয়।
তদন্ত ব্যবস্থার দুর্বলতাও এখানে বড় কারণ। একটি শক্তিশালী বিচারব্যবস্থার মূল ভিত্তি হলো নির্ভুল তদন্ত। কিন্তু বাস্তবে অনেক মামলায় দেখা যায়, ঘটনাস্থল সুরক্ষিত রাখা হয় না, প্রমাণ নষ্ট হয়ে যায়, ফরেনসিক সক্ষমতা সীমিত থাকে, কিংবা প্রভাবশালীদের চাপ তদন্তকে প্রভাবিত করে। তখন আদালতও অনেক সময় কার্যকর সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারে না।
ফলাফল?
মানুষ বাইরে থেকে ভাবে বিচারক বিচার দিলেন না। অথচ ভেতরে ভেতরে পুরো প্রক্রিয়াটাই দুর্বল প্রমাণের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল। বিচারকের হাত বাঁধা, কারণ তদন্তটাই ছিল পঙ্গু।
তবে শুধু রাষ্ট্রকে দায় দিলেই পুরো সত্য বলা হয় না। আমরাও এই অসহায়ত্বের অংশীদার।
আমরা অনেক সময় অপরাধের বিরুদ্ধে না দাঁড়িয়ে ভুক্তভোগীর চরিত্র বিশ্লেষণে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। ধর্ষণের ঘটনায় প্রশ্ন করা হয় মেয়েটি কোথায় ছিল, কী পোশাক পরেছিল। শিশু নির্যাতনের ঘটনায় পরিবারকে দোষ দেওয়া হয়। অর্থাৎ অপরাধীর বদলে ভুক্তভোগীকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর প্রবণতা এখনো প্রবল। এই মানসিকতা অপরাধীদের পরোক্ষ সুরক্ষা দেয়। কারণ আমরা যখন স্পষ্টভাবে অপরাধের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ না থাকি, তখন আইনও দুর্বল হয়ে পড়ে।
রাজনৈতিক প্রভাবও বড় বাস্তবতা। অনেক সময় ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা মানুষদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। এই বৈষম্য সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয়ংকর হতাশা তৈরি করে। কারণ আইন তখন সবার জন্য সমান থাকে না। রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি হওয়া উচিত নিরপেক্ষতা। কিন্তু আমরা যদি বিশ্বাস হারিয়ে ফেলি যে পরিচয়, টাকা বা ক্ষমতা বিচারকে বদলে দিতে পারে, তাহলে আইনের প্রতি সম্মানও ধীরে ধীরে ভেঙে যায়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বিচারপ্রক্রিয়ার ধীরগতি। বছরের পর বছর মামলা ঝুলে থাকা শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়; এটি মানসিক নির্যাতনও। একজন ভুক্তভোগী বা তার পরিবার যখন দশ বছর ধরে আদালতে ঘুরতে থাকে, তখন তারা শুধু বিচার নয়, নিজের জীবন থেকেও ক্লান্ত হয়ে পড়ে। অনেকেই শেষ পর্যন্ত হাল ছেড়ে দেয়। এই ক্লান্তিই অপরাধীদের সবচেয়ে বড় সুবিধা।
তাহলে সমাধান কোথায়?
প্রথমত, বিচারব্যবস্থা রাজনৈতিক ও প্রভাবমুক্ত না হলে বিচার দাঁড়াবে না। দ্বিতীয়ত, তদন্তে আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষ জনবল আর জবাবদিহি না থাকলে রায় কাগজেই থাকবে। তৃতীয়ত, দ্রুত বিচার মানেই যেন তাড়াহুড়োর বিচার না হয়—সেই ভারসাম্যও জরুরি। কারণ বিচার দ্রুত হওয়া গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সঠিক হওয়া তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ।
সবচেয়ে বড় পরিবর্তন অবশ্য আমাদের মানসিকতায় আসতে হবে। আমাদের বুঝতে হবে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া শুধু ফেসবুক পোস্ট নয়; এটি নাগরিক দায়িত্ব। আমরা যখন অন্যায়ের প্রতি শূন্য সহনশীল হব, তখন আইনও শক্তি পাবে।
রাষ্ট্র কখনো একদিনে অসহায় হয়ে যায় না। বছরের পর বছর দায়হীনতা, দেরি, প্রভাব, আপস আর নীরবতার ভেতর দিয়ে আইন দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই প্রশ্নটা শুধু “আমাদের আইন এত অসহায় কেন” নয়। প্রশ্নটা আরও গভীর—আমরা কি সত্যিই এমন একটি সমাজ গড়ে তুলেছি, যেখানে ন্যায়বিচার টিকে থাকতে পারে?
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।