বৃদ্ধ পিতা-মাতার প্রতি অবহেলার মূল কারণ : মানসিকতার সংকট
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী। ১১ নভেম্বর ২০২৫
নচিকেতার সেই গানের পঙ্ক্তিগুলো যেন এখন আমাদের সমাজের বাস্তব প্রতিচ্ছবি—
“ছেলে আমার মস্ত মানুষ, মস্ত অফিসার,
মস্ত ফ্ল্যাট—যায় না দেখা এপার ওপার।
নানা রকম জিনিস আর আসবাব দামি দামি,
সবচেয়ে কম দামি ছিলাম একমাত্র আমি।”
এই কয়েকটি লাইনের ভেতরেই লুকিয়ে আছে শত শত বৃদ্ধ মা-বাবার দীর্ঘশ্বাস—
অবহেলার, একাকীত্বের, অপ্রয়োজনীয় হয়ে যাওয়ার আর্তনাদ।
সমস্যার চারটি স্তর
বিষয়টি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, পুরো সমস্যাটিকে চারটি মূল ভাগে ভাগ করা যায়—
১️. বৃদ্ধ পিতা-মাতা
২️. দায়িত্ব পালন
৩️. অবহেলা
৪️. মানসিকতা
বার্ধক্য মানবজীবনের এক অনিবার্য, স্বাভাবিক এবং জৈবিক অধ্যায়। সময়ের প্রবাহে শরীর ক্ষয় হয়, কর্মক্ষমতা কমে, মনও দুর্বল হয়ে পড়ে। কিন্তু বয়সের সাথে ভালোবাসা বা সম্মানের ক্ষয় হওয়ার কথা নয়—হচ্ছে এখানেই আমাদের সমাজের বিপর্যয়।
দায়িত্ব বনাম অবহেলা
দায়িত্ব মানে শুধু অর্থনৈতিক সহায়তা নয়, মানে যত্ন, শ্রদ্ধা, উপস্থিতি ও মানসিক সমর্থন।
অন্যদিকে, অবহেলা—ব্ল্যাকস ল’ ডিকশনারির সংজ্ঞায়—“যত্নের মানদণ্ড অনুশীলনে ব্যর্থতা।”
অর্থাৎ, ইচ্ছাকৃত বা অসচেতনভাবে এমন আচরণ যা একজন সাধারণ বুদ্ধিমান মানুষ করত না।
এই অবহেলা আবার তিন রূপে দেখা দেয়—
সামাজিক, আর্থিক, এবং মানসিক।
মানসিকতার অবক্ষয়ই মূল কারণ
বিশ্বে ষাট বছরের ঊর্ধ্বে মানুষের সংখ্যা এখন ক্রমবর্ধমান। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, আমাদের দেশে এই হার প্রায় ৩৭%। অথচ এই বিপুল জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ দিন কাটাচ্ছেন একা, অবহেলিত হয়ে, কোনো বৃদ্ধাশ্রমে।
যে বাবা-মা একসময় সন্তানের কাছে ছিলেন পৃথিবীর কেন্দ্রবিন্দু, সন্তানদের জীবনে আজ তারা বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছেন।
সন্তান বড় হয়েছে, উপার্জনক্ষম হয়েছে—কিন্তু মনটা যেন ছোট হয়ে গেছে।
বাবা-মায়ের প্রতি দায়িত্ব পালনকে তারা এখন দেখে “অতিরিক্ত খরচ” বা “সময় নষ্ট” হিসেবে।
স্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষার অজুহাতে অনেকেই মাকে দূরে সরিয়ে দেয়, বাবাকে ভুলে যায়—যেন বৃদ্ধ পিতা-মাতার স্থান এখন কেবল অতীতের অ্যালবামে।
আইন যখন মানবিকতার বিকল্প হয়
এই মানসিক অবক্ষয়ের ফলেই ২০১৩ সালে বাংলাদেশ সরকার প্রণয়ন করে
“পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন”,
যেখানে সন্তানের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—যদি ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ হৃদয়ে থাকত,
তবে কি আইন দিয়ে পিতা-মাতার প্রতি কর্তব্য নিশ্চিত করতে হতো?
যদি সম্পর্কের বন্ধন সত্যিই দৃঢ় থাকত,
তবে কি বৃদ্ধাশ্রমের প্রয়োজন পড়ত?
সামাজিক প্রতিচ্ছবি
দেখুন, আজকের অনেক সন্তান ফেসবুকে Mother’s Day বা Father’s Day–এর দিনে স্ট্যাটাস দেয়,
সেলফি তোলে, পোস্ট করে “লাভ ইউ মা”—
আর সেই মাকেই পরমুহূর্তে বলে, “মা, কাপড়গুলো ধুয়ে দিও।”
এই মিথ্যা উদযাপন, এই মুখোশের ভালোবাসা—
এসবই আমাদের সময়ের সবচেয়ে ভয়ংকর সামাজিক প্রতারণা।
২০১৮ সালের ১০ জুলাই ডেইলি সান-এর এক প্রতিবেদনে দেখা যায়,
ঢাকার আগারগাঁও সমাজসেবা দপ্তরের সামনে বসে থাকা এক বৃদ্ধা—
সখিনা বেগম, যিনি একসময় সন্তানদের মুখে হাসি ফোটাতে নিজের সব স্বপ্ন বিসর্জন দিয়েছিলেন,
আজ তিনি সন্তানদের অবহেলায় ভিক্ষা করতে বাধ্য।
এটাই আমাদের সময়ের নির্মম বাস্তবতা।
গৌণ নয়, মূল কারণ হলো “মন”
অনেকে অবহেলার দায় দেন দারিদ্র্য, একক পরিবার বা কর্মব্যস্ততাকে।
কিন্তু এসব আসলে গৌণ কারণ।
দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী যারা প্রতিদিনের খাবার যোগাতেই হিমশিম খায়,
তারাও দেখা যায়, মা-বাবার পায়ের ধুলোকে আশীর্বাদ মনে করে।
অর্থাৎ, সমস্যা টাকায় নয়—সমস্যা মানসিকতায়।
আপনি যদি আধুনিক প্রযুক্তির যুগে থেকেও
দুই মিনিট সময় বের করে ফোনে মা-বাবার খোঁজ নিতে না পারেন,
তবে দোষ একক পরিবারে নয়—দোষ আপনার মূল্যবোধে।
ইতিহাসের আয়নায় শিক্ষা
মনে করুন, হযরত বায়েজিদ বুস্তামির কাহিনি—
অসুস্থ মায়ের পাশে তিনি সারারাত এক গ্লাস পানি হাতে দাঁড়িয়ে ছিলেন,
মা যেন ঘুম ভেঙে কষ্ট না পান—এই ভয়ে তাঁকে ডাকেননি।
এই অনুপম ভালোবাসাই আজ বিলুপ্ত।
আজকের সন্তানরা সেই মা-বাবাকেই গৃহকর্মীর মতো ব্যবহার করে,
যারা একসময় নিজেরা না খেয়ে সন্তানকে খাইয়েছে,
নিজের স্বপ্ন ভেঙে দিয়েছে সন্তানের হাসির জন্য।
বৃদ্ধ বয়সে তারা কিছুই চান না—শুধু একটিবার মমতার সঙ্গে শুনতে চান,
“মা, কেমন আছো?”
“বাবা, ওষুধটা খেয়েছো?”
কিন্তু আজ সেই প্রশ্নগুলোই হারিয়ে গেছে—
প্রযুক্তি আছে, মন নেই।
শেষকথা
আমরা সবাই একদিন বৃদ্ধ হব।
তখন হয়তো আমাদেরই সন্তান বলবে,
“বাবা, এত বয়সে তোমার এখানে থাকার দরকার নেই—বৃদ্ধাশ্রমে থাকা ভালো।”
সেই দিনে যদি বুকটা ভেঙে যায়,
তবে মনে রাখবেন—আপনি নিজেই গড়ে তুলেছিলেন সেই মানসিকতা।
তাই এখনও সময় আছে—
সন্তানকে কেবল পড়াশোনা নয়, মানুষ হিসেবে গড়ে তুলুন।
তাদের শেখান—
বাবা-মা কোনো দায় নয়, তারা আশীর্বাদ।
ভালোবাসা কোনো বাধ্যবাধকতা নয়,
তা জীবনের সবচেয়ে পবিত্র দায়িত্ব।
উপসংহার
বৃদ্ধ পিতা-মাতার প্রতি অবহেলার মূল কারণ কখনো অর্থনীতি নয়,
কখনো আধুনিকতা নয়—
এর একমাত্র উৎস মানসিকতার সংকট।
যেদিন আমরা হৃদয়ের সেই সংকট দূর করতে পারব,
সেদিনই আইন নয়—ভালোবাসাই হবে আমাদের সমাজের প্রকৃত রক্ষাকবচ।
#বৃদ্ধাশ্রম #পিতামাতার_দায়িত্ব #সন্তানের_মানসিকতা #মানবিকতা #বাংলাদেশ #সমাজচিন্তা #বিশ্লেষণধর্মী_রচনা #মোহাম্মদজাহিদহোসেন
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।