সন্দেহপ্রবণতা: মানসিক রোগ
লেখকঃ মোহাম্মাদ জাহিদ হোসেন
ধারণাঃ বিশ্লেষণধর্মী
প্রকাশের তারিখঃ ০৭-১০-২০২৫
বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের অন্তর্বর্তী যে নেতিবাচ
ক চিন্তা ও অনুভূতি আমাদের যন্ত্রণা বা কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তার নাম—‘সন্দেহ’।
আধুনিক প্রযুক্তির কল্যাণে গতিশীল জীবনে মোবাইল, ইন্টারনেট, ফেসবুক আমাদের পরিচিতি ও যোগাযোগের পরিধি বিস্তৃত করেছে। তবে এতে বাড়ছে অপ্রয়োজনীয় সম্পর্ক, বাড়ছে নেতিবাচক আবেগ ও অনুভূতি। এই অনুভূতিগুলো শুধু ব্যক্তিগত সম্পর্ককে নয়, প্রভাব ফেলছে বৈবাহিক জীবনের মাধুর্যেও।
অভিক-নিশি—যে দুজন একসাথে জীবন ভাগাভাগি করে—তার মধ্যেকার সম্পর্ক যদি ছোট ছোট ভুল, অসচেতনতা বা অবহেলায় তিক্ততার দিকে এগিয়ে যায়, তবে একই ছাদের নিচে থাকলেও তারা যেন থাকেন যোজন যোজন দূরে। সুন্দর সম্পর্কের মাঝেই দ্বন্দ্ব-কলহ বাসা বাঁধে, যার ছায়া পড়ে সরাসরি সন্তানদের উপর।
অভিক-নিশি অনিচ্ছাকৃতভাবেই তাদের সন্তানের মনকে হতাশা আর অন্ধকারে ঠেলে দেয়। সেই অদৃশ্য তিক্ততা গড়ে তোলে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি।
যে সম্পর্কের ভিত্তি “বিশ্বাস” সেখানে যদি বিশ্বাস হারিয়ে যায়, তখন সম্পর্কের অস্তিত্বই প্রশ্নবিদ্ধ হয়। বিশ্বাসের অভাবে জন্ম নেয় সন্দেহপ্রবণতা—একটি ক্ষুদ্রতর চিন্তাধারা থেকে শুরু করে গভীর মানসিক রোগে রূপ নিতে পারে। সন্দেহ মানে শুধু অবিশ্বাস নয়; এটি একটি ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়া মানসিক ক্ষত।
সন্দেহ যেমন হতে পারে স্বাভাবিক পর্যায়ের, তেমনি হতে পারে অত্যন্ত অসুস্থ পর্যায়ের। ইংরেজিতে এ অসুস্থ পর্যায়ের সন্দেহকে বলা হয় Delusion, Paranoid Psychosis এবং Morbid Jealousy। এ ধরনের সন্দেহের পেছনে থাকে কোনো বাস্তব প্রমাণ কিংবা যৌক্তিক কারণের অভাব। তবে এটি মানুষের মনের মধ্যে মাসের পর মাস বেঁচে থাকে অটলভাবে—যে সন্দেহকে আমরা Suspiciousness বলি।
নারীর মধ্যে সন্দেহপ্রবণতা সুস্থ এবং অসুস্থ—উভয় পর্যায়ে দেখা যায়। বিয়ের আগে প্রেমের সময় কিংবা বিবাহিত জীবনে—দু’ক্ষেত্রেই সন্দেহ জন্ম নিতে পারে। তবে বিয়ের আগে সন্দেহের অবকাশ বেশি থাকে; কারণ তখন সম্পর্কের কোনো আইনগত বা সামাজিক রূপ নেওয়া হয়নি।
বিয়ে-পরবর্তী সময়ে যে সন্দেহ জন্ম নেয়, তা শুধু দুজনকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে না; এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় সংসার, সন্তান, আত্মীয়স্বজন, এমনকি প্রতিবেশীর সম্পর্কও।
স্ত্রীর সন্দেহের শিকার কিছু পুরুষ রেগে ওঠে, গালিগালাজ করে, হাত তুলতে বাধ্য হয়, আবার কেউ ঠাণ্ডাভাবে প্রমাণের চেষ্টা করে। কিছু পুরুষ—প্রাথমিকভাবে সন্দেহের শিকার হলেও—পরবর্তীতে তা মুছে ফেলতে চান, তাদের মধ্যে রয়েছে সচেতনভাবে সম্পর্ক রক্ষা করার চেষ্টা। আবার কেউ অতি সাবধানী হয়ে যায়—‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’—যার ফল সেই স্ত্রীর জন্য সবচেয়ে কষ্টের হয়ে ওঠে।
সন্দেহের কারণ নারী-পুরুষ—উভয়ের ক্ষেত্রেই বিভিন্ন:
সঙ্গীর অন্য নারীর প্রতি দুর্বলতা
চরিত্রগত ত্রুটি
নেশা (যেমন সিগারেট বা মাদক)
বন্ধুদের আড্ডায় অতিরিক্ত সময় দেওয়া
অর্থ-সম্পদ নিয়ে জটিলতা
গোপন সহযোগিতা বা অন্যদের সুবিধা দেওয়া
অসুস্থতার বিষয়েও সন্দেহ
অনেক সময় নারীর সন্দেহ জন্ম নেয় নিজের সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা থেকে—যেমন: “আমি সুন্দরী নই”, “আমি যথেষ্ট শিক্ষিত নই”, “সে হয়ত অন্য কাউকে পছন্দ করছে”—যা সম্পর্কের গভীরে বিষবৃক্ষ রোপণ করে।
সন্দেহ নারী-পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই একটি চিন্তার জটিলতা; একটি মানসিক রোগ। এটি যে কাউকে যে কোনো সময়ে আঘাত করতে পারে। তাই সন্দেহের বীজ চিহ্নিত করে তা দূর করার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি—কারণ বিশ্বাস ছাড়া সম্পর্কের বীজ ফুটে ওঠে না, এবং সন্দেহ ছাড়া সুখের পথও স্থায়ী হয় না।
বিশ্বাসকে যেন হারাতে না দিই—কারণ সন্দেহের অন্ধকার কখনো সহজে ছায়া মুছে দিতে পারে না।
#সন্দেহপ্রবণতা #মানসিকস্বাস্থ্য #সম্পর্ক #বিশ্বাস #পরিবার #সুস্থমন #জীবনদর্শন #মোহাম্মাদজাহিদহোসেন
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।