অসম্পূর্ণ স্বপ্নের সবচেয়ে বড় বাসিন্দা
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন, প্রাবন্ধিক
নিবন্ধ। এপ্রিল ০৮, ২০২৬
বাংলা উপন্যাসের পাঁচটি চরিত্রে মধ্যবিত্ত মানসের অসম্পূর্ণতা বাংলা সাহিত্যে মধ্যবিত্ত চরিত্রগুলোর একটি স্থায়ী বৈশিষ্ট্য হলো—তারা কখনোই সম্পূর্ণ পূর্ণতায় পৌঁছায় না। তাদের জীবন গড়ে ওঠে “প্রায়” শব্দটির চারপাশে—প্রায় সফল, প্রায় সুখী, প্রায় স্থির। এই “প্রায়” অবস্থাই তাদের অস্তিত্বকে নির্ধারণ করে। ফলে প্রশ্নটি কেবল সামাজিক নয়, বরং গভীরভাবে দার্শনিক: মধ্যবিত্তরা কি সত্যিই অসম্পূর্ণ, নাকি তাদের বাস্তবতাই এমন এক কাঠামো যেখানে পূর্ণতা স্বাভাবিকভাবে অধরা থেকে যায়?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে বাংলা সাহিত্যের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রের দিকে তাকাতে হয়, যেখানে মধ্যবিত্ত মানসিকতার ভিন্ন ভিন্ন রূপ প্রকাশ পেয়েছে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর ঘরে বাইরে উপন্যাসে নিখিলেশ এমন এক চরিত্র, যিনি যুক্তি, মানবিকতা এবং ব্যক্তিস্বাধীনতার পক্ষে দাঁড়ান। কিন্তু তার এই অবস্থান তাকে সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রবাহের বিপরীতে দাঁড় করায়। তিনি নীরব, সংযত, এবং এক অর্থে পর্যবেক্ষক। বিমলার সাথে সম্পর্কের টানাপোড়েনেও নিখিলেশের অবস্থান স্পষ্ট হয়—সে আবেগকে অস্বীকার করে না, কিন্তু আবেগের কাছে নিজেকে সম্পূর্ণ সঁপেও দেয় না। একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় তিনি বলেন—“আমি তো কেবল মানুষকে মানুষ হিসেবেই দেখতে চাই।” এই মানবিক আদর্শ তাকে উচ্চতায় তোলে, আবার একই সঙ্গে বাস্তবতার সামনে অসহায়ও করে তোলে। এখানে মধ্যবিত্ততা মানে এক ধরনের নৈতিক অবস্থান, যা সবসময় কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা যায় না।
অন্যদিকে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়-এর দেবদাস উপন্যাসে মধ্যবিত্ত সংকটের রূপটি ভিন্ন। দেবদাস মূলত আবেগ ও সামাজিক বাধার মধ্যে আটকে থাকা এক চরিত্র। পার্বতীর প্রতি তার ভালোবাসা থাকলেও, সে সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। তার নিজের ভাষায়—“আমি পারিনি, পারব না” (দেবদাস)। এই অপারগতা কেবল ব্যক্তিগত দুর্বলতা নয়; বরং মধ্যবিত্ত অহংকার, সামাজিক অবস্থান এবং আবেগের সংঘর্ষের ফল। দেবদাসের জীবন এক দীর্ঘ অপূর্ণতার গল্প, যেখানে ভালোবাসা থাকলেও তা বাস্তবায়িত হয় না। এখানে “প্রায়” শব্দটি সবচেয়ে নির্মমভাবে কাজ করে—প্রায় ভালোবাসা, প্রায় সিদ্ধান্ত, প্রায় জীবন।
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়-এর পথের পাঁচালী উপন্যাসে মধ্যবিত্ত (বা নিম্নমধ্যবিত্ত) জীবনের বাস্তবতা আরও নীরব ও সংবেদনশীলভাবে উপস্থাপিত। অপু এবং তার পরিবার দারিদ্র্যের মধ্যে থেকেও স্বপ্ন দেখে। অপুর রেলগাড়ি দেখার আকাঙ্ক্ষা শুধু একটি শিশুসুলভ কৌতূহল নয়, বরং সীমার বাইরে যাওয়ার এক প্রতীক। অপু সরাসরি বলে না, কিন্তু তার দৃষ্টিভঙ্গিতে সেই আকাঙ্ক্ষা স্পষ্ট। বিভূতিভূষণের বর্ণনায় সেই আকাঙ্ক্ষা কখনো পূর্ণ হয় না, তবুও সেটিই তার জীবনকে অর্থ দেয়। এইখানে একটি সূক্ষ্ম সত্য ধরা পড়ে—মধ্যবিত্ত জীবনে স্বপ্ন পূর্ণ না হলেও, সেই স্বপ্নের উপস্থিতিই বাস্তবতাকে সহনীয় করে তোলে।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়-এর পুতুলনাচের ইতিকথা উপন্যাসে শশী ডাক্তার মধ্যবিত্ত দ্বিধার এক অস্তিত্বগত উদাহরণ। সে গ্রাম ও শহরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে নিজের পরিচয় নির্মাণ করতে চায়। কিন্তু তার অবস্থান কোথাও স্থির নয়। তার পেশা তাকে সম্মান দেয়, কিন্তু মানসিকভাবে সে বিভক্ত। শশীর ভেতরের দ্বন্দ্ব আসলে একটি বৃহত্তর প্রশ্নকে সামনে আনে—মানুষ কি নিজের অবস্থান পুরোপুরি বেছে নিতে পারে, নাকি সমাজ ও বাস্তবতা তাকে নির্দিষ্ট পথে ঠেলে দেয়? এই প্রশ্নের কোনো সহজ উত্তর নেই। শশীর জীবন সেই অনিশ্চয়তারই প্রতিচ্ছবি।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়-এর সেই সময় উপন্যাসে মধ্যবিত্ত জীবনের অবস্থান আরও বিস্তৃত ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ধরা পড়ে। এখানে চরিত্ররা কেবল ব্যক্তিগত সংকটে আবদ্ধ নয়; তারা একটি পরিবর্তনশীল সময়ের অংশ। নবীনকুমারের চরিত্রে আমরা দেখি—কখনো সে সক্রিয়, কখনো নিরপেক্ষ, আবার কখনো প্রবাহের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেয়। সে নেতৃত্ব দিতে পারে, কিন্তু স্থায়ীভাবে নয়। অনুসরণও করে, কিন্তু অন্ধভাবে না। এই দ্বৈততা মধ্যবিত্ত মানসিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য—অবস্থান স্থির নয়, বরং পরিস্থিতির সাথে পরিবর্তনশীল।
এই পাঁচটি ভিন্ন ভিন্ন সাহিত্যিক উপস্থাপনাকে একত্র করলে একটি সুস্পষ্ট চিত্র পাওয়া যায়। মধ্যবিত্তরা কোনো নির্দিষ্ট অবস্থানে স্থির নয়; তারা সবসময় একটি মধ্যবর্তী জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে। তারা পুরোপুরি ক্ষমতাবানও নয়, আবার পুরোপুরি ক্ষমতাহীনও নয়। তাদের জীবন তাই এক ধরনের ভারসাম্যের খেলা, যেখানে প্রতিটি সিদ্ধান্ত সীমাবদ্ধতার ভেতরেই নিতে হয়।
ব্যক্তিগতভাবে এই চরিত্রগুলো পড়ার সময় একটি অনুভূতি বারবার ফিরে আসে—মধ্যবিত্ত জীবন যেন এক ধরনের স্থগিত গতির অভিজ্ঞতা। যেখানে মানুষ এগোচ্ছে, কিন্তু গন্তব্য অনিশ্চিত। অপু দূরের দিকে তাকায়, নিখিলেশ নীরবে অবস্থান ধরে রাখে, দেবদাস সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগে, শশী নিজের জায়গা খুঁজে ফেরে, আর নবীনকুমার সময়ের স্রোতের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেয়। এরা সবাই একই বাস্তবতার ভিন্ন ভিন্ন প্রতিচ্ছবি।
এখানে “অসম্পূর্ণতা” কোনো ব্যর্থতা নয়; বরং এটি এক ধরনের অস্তিত্বগত সত্য। মধ্যবিত্তরা এমন এক সীমারেখায় দাঁড়িয়ে থাকে, যেখানে পূর্ণতা সবসময়ই কিছুটা দূরে। তাদের স্বপ্ন বাস্তবতার সঙ্গে বারবার সংঘর্ষে যায়, আর সেই সংঘর্ষই তাদের পরিচয় নির্মাণ করে।
তাহলে শেষ প্রশ্নটি আরও তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে—মধ্যবিত্ত কি সত্যিই অসম্পূর্ণ, নাকি পূর্ণতার সংজ্ঞাটাই তাদের অভিজ্ঞতা দ্বারা পুনর্নির্ধারিত?
এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার মধ্যেই হয়তো মধ্যবিত্ত জীবনের সবচেয়ে গভীর সাহিত্যিক সত্য লুকিয়ে আছে।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।