যৌথ পরিবার ভাঙছে বাংলা সাহিত্য কি আগেই দেখেছিল
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী। এপ্রিল ০১, ২০২৬
একসময় দাদা-দাদির কোলে বড় হয়েছি। বাড়ির উঠোনে সবাই মিলে হাসি-ঠাট্টা চলত, এক ঠাকুরের প্রসাদ সবার পাতে পড়ত। আর আজ ফ্ল্যাটের চার দেয়ালের ভেতর একা একা মোবাইল ঘাঁটি। বাবা-মা অফিসে ব্যস্ত, দাদু-দিদা হয়তো গ্রামের খালি বাড়িতে বা কোনো বৃদ্ধাশ্রমের ঘরে।
এই বদলটা সত্যিই হঠাৎ এসেছে, নাকি বাংলা সাহিত্য আগেই কিছু আঁচ পেয়েছিল? কখনো কখনো মনে হয় সাহিত্যিকরা আমাদের চেয়ে অনেক আগে দেখতে পান।
ছোটবেলার স্মৃতি ঘাঁটলে গ্রামের বাড়িটা এখনো মনে গরম লাগে। সকালে দাদির গল্প, চাচা-চাচির সঙ্গে দৌড়াদৌড়ি, মায়ের পাশে রান্নাঘরে হাত লাগানো — এসব মিলিয়ে এক ধরনের নিরাপত্তা ছিল। কিন্তু শহরের জীবনে সেই অনুভূতি কোথায় যেন মিলিয়ে গেছে। প্রত্যেকে নিজের ঘরে ঢুকে ফোনে ডুবে থাকে। একসাথে খাওয়া বা গল্প করার অভ্যাসটা আস্তে আস্তে হারিয়ে যাচ্ছে।
বাংলা সাহিত্য এই যন্ত্রণাটা অনেক আগেই ধরেছিল।
গিরিশচন্দ্র ঘোষের নাটক প্রফুল্ল -এ দেখি একটা সমৃদ্ধ যৌথ পরিবার কীভাবে মদের নেশা, অর্থের টানাপোড়েন আর ভেতরের স্বার্থের ঝগড়ায় ভেঙে পড়ে। প্রফুল্ল চরিত্রটা যেন সেই ভাঙনেরই প্রতীক।
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এই ফাটলকে আরও গভীর করে দেখিয়েছেন। পল্লীসমাজ বা শ্রীকান্ত-এ গ্রামের যৌথ পরিবার জমি-জমার বিবাদ আর অর্থের চাপে ক্ষয়ে যায়। তাঁর চরিত্রগুলো যৌথ পরিবারের ছাদের নিচে থেকেও একা হয়ে পড়ে। পড়তে গিয়ে মনে হয় এ যেন আমাদের চারপাশেরই গল্প।
রবীন্দ্রনাথের চোখের বালি পড়লে আরও স্পষ্ট হয়। বিনোদিনী যখন মৈত্রেয়ীর ঘরে ঢোকেন, তখন বোঝা যায় যৌথ পরিবারের ‘সবার ঘর’ আসলে নারীর জন্য কতটা খাঁচা ছিল। রবীন্দ্রনাথ উনিশশো এক-দুই সালে যে জটিলতা দেখিয়েছেন, আজকের ভাষায় বললে সেটা বিষাক্ত — কিন্তু তিনি সেই শব্দ ব্যবহার করেননি, শুধু দেখিয়েছেন।
বিভূতিভূষণের পথের পাঁচালী-তে দারিদ্র্যের চাপে পরিবার ক্ষয়ে যাওয়ার ছবি দেখা যায়। অপু-দুর্গার গ্রামীণ জীবন, দুর্গার মৃত্যুর পর যে শূন্যতা — সেটা আজকের অনেক পরিবারের ছায়ার মতো লাগে।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদ্মা নদীর মাঝি-তে নদীর স্রোতের মতো অর্থনৈতিক চাপ জেলে পরিবারের ঐক্য ধুয়ে নিয়ে যায়। আর সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের পূর্ব-পশ্চিম-এ শহুরে মধ্যবিত্তের একক পরিবারের সংকট উঠে আসে।
নারী শিক্ষার প্রসার, শ্রমের বাজারে নারীদের প্রবেশ, জমির বিভাজন — এসব পুরনো অর্থনৈতিক ভিত্তি ভেঙে দিয়েছে। এককালে যৌথ পরিবার ছিল নিরাপত্তার জায়গা। কিন্তু চাকরি আর শহরের টানে সবাই ছড়িয়ে পড়ল। বন্ধন আলগা হয়ে গেল। আজ স্বাধীনতা পেয়েছি, কিন্তু সঙ্গে এসেছে গভীর একাকিত্ব।
দাদু মারা যাওয়ার পর প্রথম বছর মা বলেছিলেন, “এবার বাড়িতে শান্তি।” আমি তখন বুঝিনি। পরে বুঝলাম — দাদু ছিলেন শেষ সেতু। তাঁর পর... তাঁর পর আর কিছু নেই। চাচারা ফোন ধরেন না। মাসিরা দেখে রেখে দেন। কাকারা ‘ব্যস্ত’ বলেন। হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে ‘ওম শান্তি’ স্টিকার পাঠানোর পর কেউ আর কথা বাড়ায় না। সেই যৌথতার শেষ টুকুও যেন ডিজিটাল হয়ে গেল।
সাহিত্য কখনো কখনো ভবিষ্যতের দিকেও আঙুল তোলে। আজকের ছেলেমেয়েরা দাদু-দিদার কোলের সেই উষ্ণতা খুব কমই পাচ্ছে। ফলে মানসিক চাপ বাড়ছে, সম্পর্কগুলো ক্রমশ পাতলা হয়ে যাচ্ছে।
তবু কিছু পরিবার এখনো চেষ্টা করে যাচ্ছে। কিন্তু প্রশ্নটা থেকেই যায় — এটুকুই কি যথেষ্ট? আমি নিজেও ঠিক জানি না।
যৌথ পরিবারের ভাঙন শেষ পর্যন্ত শুধু একটা ঘরের ব্যাপার নয়। এটা পুরো সমাজেরই একটা সমস্যা।
তোমার কাছে যৌথ পরিবার মানে কী? একটা গন্ধ, একটা শব্দ, নাকি একটা অসমাপ্ত কথা?
#যৌথপরিবার #বাংলাসাহিত্য
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।