কাল সকালে আবার
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণমূলক লেখা
৩ নভেম্বর ২০২৬
সকালে ঘুম থেকে উঠে ছেলেটি প্রতিদিনের মতো গোসল করে। আলমারি থেকে অপেক্ষাকৃত ভালো জামাটি বের করে পরে। টেবিলের ওপর রাখা জীবনবৃত্তান্তের কয়েকটি ফটোকপি ব্যাগে ঢুকিয়ে ঘর থেকে বের হয়। কোথায় যাবে, কার সঙ্গে দেখা করবে, কোন প্রতিষ্ঠানে লোক নিচ্ছে, এসব নিয়ে আগের রাতে অনেকক্ষণ ভেবেছে।
একসময় তার সকালগুলো এমন ছিল না। অফিসে যাওয়ার তাড়া থাকত। মাসের প্রথম সপ্তাহে বেতন পাওয়ার অপেক্ষা থাকত। নিজের খরচের পাশাপাশি বাড়িতে কিছু টাকা দেওয়ার অভ্যাসও তৈরি হয়েছিল। মাস শেষে মায়ের হাতে টাকা তুলে দিলে মা খুব বেশি কিছু বলতেন না। শুধু টাকাটা রেখে দিতেন।
চাকরিটা চলে যাওয়ার পর প্রথম কয়েক দিন সে কাউকে কিছু বুঝতে দেয়নি। পরিচিতদের ফোন করেছে, পুরোনো সহকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। ভেবেছিল, কয়েক দিনের মধ্যেই অন্য কোথাও একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে। কিন্তু দিন গড়িয়ে সপ্তাহ হয়েছে, সপ্তাহ পেরিয়ে মাস।
এখন সকালে ঘর থেকে বের হওয়ার সময় মায়ের সঙ্গে চোখাচোখি হলে মা কিছু জিজ্ঞেস করেন না। হয়তো বুঝতে পারেন, ছেলেটি কোথায় যাচ্ছে। তবু যাওয়ার আগে বলেন, দুপুরে কিছু খেয়ে নিস।
ছেলেটি মাথা নেড়ে বেরিয়ে যায়।
সারাদিন এক অফিস থেকে আরেক অফিসে ঘোরে। কোথাও জীবনবৃত্তান্ত জমা দেয়, কোথাও পরিচিত কারও সঙ্গে দেখা করে। কোনো কোনো জায়গায় তাকে বসিয়ে রাখা হয়। কেউ বলে, পরে যোগাযোগ করবেন। কেউ বলে, আপাতত লোক নেওয়া হচ্ছে না। আবার কোথাও তার অভিজ্ঞতার সঙ্গে কাজের মিল পাওয়া যায় না।
একদিন একটি প্রতিষ্ঠানে সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, আগের চাকরিটা ছাড়লেন কেন?
সে একটু থেমে উত্তর দিল। প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক সমস্যার কারণে কয়েকজন কর্মীকে ছাঁটাই করা হয়েছিল। কথাটা বলার সময় তার মনে হলো, নিজের কোনো দোষ না থাকলেও তাকে যেন একটা ব্যাখ্যা দিতে হচ্ছে।
বাড়ি ফেরার পথে বাসে বসে সে ফোনের দিকে তাকিয়ে থাকে। কোনো নতুন বার্তা এসেছে কি না, কোনো পরিচিত মানুষ ফোন করেছে কি না। প্রতিবার ফোনের পর্দা জ্বলে উঠলে বুকের ভেতর সামান্য একটা আশা তৈরি হয়। তারপর আবার নিভে যায়।
বাড়িতে ফিরে মা জিজ্ঞেস করেন, দুপুরে খেয়েছে কি না। সে বলে, হ্যাঁ। মা আর কিছু বলেন না।
কিন্তু ঘরের টেবিলের ওপর জমতে থাকে জীবনবৃত্তান্তের ফটোকপি। কোনোটা একবার ভাঁজ করা, কোনোটা ব্যাগের মধ্যে থেকে কোণায় ছিঁড়ে গেছে। কয়েকটি কাগজের ওপর প্রতিষ্ঠানের নাম ও ফোন নম্বর লেখা। একদিন সে হিসাব করতে বসেছিল, গত দুই মাসে কতগুলো প্রতিষ্ঠানে যোগাযোগ করেছে। হিসাবটা শেষ করেনি।
বন্ধুরা মাঝেমধ্যে ফোন করে। কেউ জানতে চায়, নতুন কোথাও যোগ দিয়েছে কি না। কেউ বলে, চিন্তা করিস না, কিছু একটা হয়ে যাবে। সে হাসিমুখে কথা শেষ করে। কিন্তু ফোন রাখার পর অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে থাকে।
আগে সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরলে তার হাতে বাজারের ব্যাগ থাকত। কখনো মায়ের জন্য ওষুধ আনত, কখনো ছোটখাটো সংসারের জিনিস। এখন বাড়ি ফেরার সময় তার হাতে থাকে একটি ব্যাগ, যার ভেতরে কয়েকটি জীবনবৃত্তান্ত আর পানির বোতল।
একদিন মা তার ঘরে এসে টেবিলের ওপর ছড়িয়ে থাকা কাগজগুলো গুছিয়ে দিতে চাইলেন। ছেলেটি বলল, থাক, আমি গুছিয়ে নেব।
মা কাগজগুলো আর সরালেন না। শুধু টেবিলের এক পাশে রাখা খালি পানির গ্লাসটি নিয়ে চলে গেলেন।
রাত বাড়ে। ছেলেটি আবার মুঠোফোনে চাকরির বিজ্ঞপ্তি দেখে। নিজের যোগ্যতার সঙ্গে মেলে এমন কয়েকটি পদে আবেদন করে। কোথাও অভিজ্ঞতা বেশি চাওয়া হয়েছে, কোথাও বয়সের শর্ত আছে, কোথাও আবার বেতন এত কম যে যাতায়াত খরচ হিসাব করতেই দ্বিধা হয়।
তবু সে আবেদন করে।
পরদিনও সকালে গোসল করে জামা পরে বের হয়। ব্যাগে নতুন কয়েকটি জীবনবৃত্তান্ত রাখে। আগের দিনের কাগজগুলোও ফেলে দেয় না। সেগুলোর পেছনে নতুন ঠিকানা লিখে রাখে।
এভাবে কত দিন চলবে, সে জানে না। মাকেও আর কিছু বলে না।
একদিন সকালে একটি প্রতিষ্ঠানে সাক্ষাৎকার দিয়ে বের হওয়ার সময় তাকে জানানো হলো, নির্বাচিত হলে জানানো হবে। কথাটা সে আগেও অনেকবার শুনেছে। তাই এবার খুব বেশি আশা করেনি।
তিন দিন পর দুপুরে তার মুঠোফোনে একটি ফোন আসে। ওপাশ থেকে জানানো হয়, তাকে কাজে যোগ দেওয়ার জন্য নির্বাচিত করা হয়েছে। পরদিন প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে আসতে বলা হয়।
ফোন রেখে সে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকে। তারপর মাকে ফোন করে শুধু বলে, মা, একটা চাকরি হয়েছে।
ওপাশ থেকে মা কী বলেছিলেন, তা পাশের মানুষটি শুনতে পায়নি। শুধু দেখেছিল, ছেলেটি অনেক দিন পর একটু হাসল।
সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে মা জিজ্ঞেস করেন, কিছু হলো? ছেলেটি মাথা নেড়ে বলে, হ্যাঁ।
টেবিলের ওপর তার জীবনবৃত্তান্তের ফটোকপিগুলো তখনো পড়ে আছে। কয়েকবার ভাঁজ হওয়া, কোথাও কালির দাগ, কোথাও পুরোনো প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা কেটে নতুন ঠিকানা লেখা।
সে কাগজগুলো একসঙ্গে করে টেবিলের ড্রয়ারে রাখতে যায়। তারপর একটি কাগজ হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে।
কাল সকালে আর ওগুলো নিয়ে বের হতে হবে না। তবু কাগজগুলো ফেলে দিতে তার ইচ্ছে করে না।
কতগুলো দরজায় যে এগুলো নিয়ে দাঁড়িয়েছিল, তার হিসাব কাগজগুলোই জানে।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।