হারার ভেতরের জয়
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী | ১১ মার্চ ২০২৬
কখনও কখনও মনে হয়, মানুষ নিজের ইচ্ছার সঙ্গে কতটা বেঁচে থাকে, আর কতটা অন্যদের খুশি রাখতে হারিয়ে দেয়। আমরা ছোটবেলা থেকেই শিখি, ভালো মানুষ হতে হলে মানিয়ে চলতে হবে। কাউকে কষ্ট দেবার আগে থেমে থাকতে হবে। কিন্তু বারবার এই আপসগুলো একসময় ভেতরে এক অদৃশ্য স্থান তৈরি করে—যেখানে নিজের মতামত প্রকাশ করা অপরিচিত।
গত মঙ্গলবার অফিসে একটি ছোট মিটিং চলছিল। আলোচনায় সবাই নিজের মতামত জানাচ্ছিল। আমার মাথায় তখন ভিন্ন একটি দিক ছিল—একটি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু অসুবিধাজনক প্রস্তাব। বলার সাহস থাকলেও আমি চুপ করে রইলাম। অন্যরা কথা চালিয়ে গেল, সিদ্ধান্তও হয়ে গেল। বাইরে থেকে সব ঠিকই ছিল—কোনও বিরোধ নেই, কোনও অস্বস্তিও চোখে পড়েনি। কিন্তু ভেতরে অনুভব করলাম, আমার কণ্ঠটি চাপা হয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছিল, আমি একধরনের হারার মধ্যে রয়েছি—অবাধ্য না হওয়া এক ধরনের পরাজয়।
সেই সপ্তাহেই আরেকটি মিটিং-এ দেখলাম, আমার এক সহকর্মী রাফিয়া নিজের প্রস্তাবটি পিছিয়ে দিলেন—যদিও সেটি যথেষ্ট যুক্তিসঙ্গত ছিল। বাইরে থেকে এটি মসৃণ ও প্রশংসনীয় মনে হয়, কিন্তু কাছ থেকে দেখলে তার নিজের ইচ্ছার স্থান ক্রমশ কমতে শুরু করেছে। প্রতিবার নিজের কথা না বলার অভ্যাস তাকে নতুন করে শেখায়—চুপ করে থাকা, সামান্য আপস, সামান্য পিছিয়ে আসা।
লিফটে উঠে আমি আয়নায় মুখটা দেখলাম। পাশের সহকর্মী হেসে বললেন, "তুমি তো কখনোই না বলো না।" আমি চা-এর কাপের দিকে তাকালাম। চা ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল। কোনো সিদ্ধান্ত নেই—শুধু একটি ক্ষণিক অনুভূতি। বাইরে থেকে তা সামান্য অপ্রকাশিত মনে হতে পারে, কিন্তু ভেতরে এটি কখনো কখনো অদৃশ্য ভার হিসেবে জমে ওঠে।
কতটা হারলে এটি ভদ্রতা হয়, আর কতটা নিজের কাছেই পরাজয় হয়ে যায়—সেটি প্রতিদিনই নতুন করে বোঝার বিষয়। নিজেকে মানিয়ে চলা আর নিজের অস্তিত্ব রক্ষা করার সীমারেখা প্রতিটি মুহূর্তে পরীক্ষা হয়। এই দ্বন্দ্বটি কোনো সহজ সমাধান পায় না; এটি শুধু অনুভূত হয়, চাপা থাকে, এবং কখনো কখনো অদৃশ্য ভার হিসেবে গড়ে ওঠে।
আমি এখনও জানি না সেই সীমারেখা কোথায়। প্রতিদিন সকালে আয়নার সামনে দাঁড়ালে মুখটা যেন নিজের মতোই থাকে। নিজের কণ্ঠটিকে শোনার সাহস পাওয়া হয়তো একদিনই এই চাপা দ্বন্দ্বকে স্পষ্ট করে দেখাবে। আর সেই স্পষ্টতা হয়তো শুধু হারার মধ্যেই লুকানো ছোট্ট জয়।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।