আধুনিক যুগেও কুসংস্কার টিকে আছে
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী কলাম | ফেব্রুয়ারি ২৪, ২০২৬
গত শীতে ঢাকার একটি হাসপাতালে দেখা হলো পঞ্চাশোর্ধ্ব রহমান সাহেবের সাথে। উচ্চ রক্তচাপ নিয়ে ভর্তি, কিন্তু তার আগে তিন দিন পানিতে ভেজানো তালপাতার পাতা পান করেছেন—এক "বিশেষজ্ঞের" পরামর্শ। "ডাক্তার তো লিখে দেবে ওষুধ, কিন্তু এটা তো প্রাকৃতিক," বলছিলেন তিনি, অক্সিজেন মাস্ক পরা অবস্থায়। এই ঘটনা ভাবিয়ে তোলে—আমরা কি সত্যিই আধুনিক হয়েছি, নাকি প্রযুক্তির আড়ালে ভয় আর অজ্ঞতা পুরনো জায়গাতেই রয়ে গেছে?
মস্তিষ্কবিজ্ঞানীরা বলেন, কুসংস্কার আসলে "ইতিবাচক পুনর্বলীকরণ"-এর জটিল ফাঁদ। একবার পরীক্ষায় "ভাগ্যবান কলম" ব্যবহার করে ভালো ফল পেলে, মস্তিষ্ক ডোপামিন (আনন্দের রসায়ন) নিঃসরণ করে। এটি একটি স্নায়ুপথ গড়ে তোলে, যা সময়ের সাথে শক্তিশালী হয়। পরে সেই কলম ছাড়া পরীক্ষা দিতে গেলে উদ্বেগ বাড়ে, শারীরিক অস্বস্তি হয়—যদিও কলমের সাথে ফলাফলের কোনো যৌক্তিক সম্পর্ক নেই। এভাবেই অযৌক্তিক বিশ্বাস স্বনির্মিত ভবিষ্যদ্বাণী হয়ে দাঁড়ায়। মনে হয় কলমই কাজ করেছে, বাস্তবে কাজ করেছে মনের শক্তি।
এই স্নায়ুপথের প্রক্রিয়া আমার বাবার ক্ষেত্রেও দেখা গেল— বাবা প্রতি শুক্রবার নির্দিষ্ট কাপে চা খেতেন, "ব্যবসায় লাভ হয়।" একদিন কাপ ভেঙে গেল, সেদিন সত্যিই লোকসান হলো। তিনি ভাবলেন, "আমি জানতাম।" কিন্তু পরে বুঝলাম, সেদিন তিনি মানসিকভাবে বিচলিত ছিলেন, তাই ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কাপ নয়, মনোবিজ্ঞান কাজ করেছিল। এই ঘটনা শিখিয়েছে—কুসংস্কার টিকে থাকে কারণ আমরা সহঘটনাকে কার্যকারণ সম্পর্ক ভাবতে পছন্দ করি।
কুসংস্কার ছড়ায় সামাজিক প্রমাণীকরণের মাধ্যমে। ফেসবুকে এক ভিডিও ভাইরাল হলো—"এই তাবিজ পরলে চাকরি হয়।" হাজার শেয়ার, কমেন্টে অসংখ্য "সত্যি কাজ হয়েছে।" কেউ যাচাই করে না, কারণ "অন্যেরা বিশ্বাস করছে"—এটাই প্রমাণ হিসেবে কাজ করে। এটি গোষ্ঠীভাবে অনুসরণের প্রভাব, মনোবিজ্ঞানের একটি শক্তিশালী নিয়ম।
গ্রামের আমার ফুপু হাসপাতালে যেতে চান না। কারণ, প্রতিবেশী বলেছেন, "সেখানে নাকি আত্মা আছে, রাতে শব্দ হয়।" এই ভয় সম্প্রদায় দ্বারা প্রেরিত। একজনের কল্পনা, পুরো গ্রামের স্বাস্থ্য ঝুঁকি। ডিজিটাল যুগে এই সংক্রমণ আরও দ্রুত। অদ্ভুত ভিডিও, অলৌকিক গল্প, মিথ্যে দাবি মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ে। যাচাই না করেই মানুষ বিশ্বাস করে, কারণ এগুলো আবেগকে নাড়া দেয়, যুক্তিকে নয়।
সবচেয়ে বিস্ময়কর—শিক্ষিতদের কুসংস্কার। কারণ, শিক্ষা ও সমালোচনামনস্ক চিন্তা এক নয়। আমার এক প্রফেসর বন্ধু, পিএইচডি ডিগ্রি লাভকারী, বাড়ির দরজায় নির্দিষ্ট দিকে মুখ করে তাবিজ ঝুলিয়ে রেখেছেন—"ব্যবসায় বা করিয়ারের অনিশ্চয়তা সহ্য করা কঠিন, তাবিজটি তাদেরকে 'নিয়ন্ত্রণের ভ্রম' দেয়। নিশ্চয়তার জন্য, ক্ষতি কী?"
এখানে কাজ করে নিয়ন্ত্রণের ভ্রম—জটিল, অনিয়ন্ত্রিত জগতকে নিয়ন্ত্রণের ভ্রম। বিজ্ঞান বলে, অনিশ্চয়তা সহ্য করা মানুষের জন্য কঠিন। তাই "অতিরিক্ত নিশ্চয়তা" খোঁজা হয়, যুক্তি যতই হোক না কেন। শিক্ষিত মানুষেরা ভাবে, "আমি জানি এটি অযৌক্তিক, কিন্তু না করলে যদি..."—এই "যদি"-ই কুসংস্কারের শক্তি।
কুসংস্কার শুধু ব্যক্তিগত নয়, প্রাতিষ্ঠানিকও। তাবিজ বিক্রি, জ্যোতিষী পরামর্শ, ভাগ্যবিড়ালা—এক বহু-বিলিয়ন ডলার শিল্প। এদের বিজ্ঞাপনে ব্যবহার হয় ভয়-ভিত্তিক বিপণন: "না করলে বিপদ, করলে লাভ।" ভয় মানুষের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রেরণা, আর ব্যবসা তা ব্যবহার করে।
রাজনীতিতেও দেখা যায়। নির্দিষ্ট দিনে শপথ, নির্দিষ্ট রং পোশাক, নির্দিষ্ট দিকে মুখ—এগুলো প্রতীকী প্রদর্শন, জনগণের মনোযোগ বিক্ষেপের কৌশল। মানুষ ভাবে নেতা "বিশেষ", কিন্তু বাস্তবে এটি কেবল প্রদর্শন, বিশ্বাস নয়।
বিজ্ঞান শেখা যথেষ্ট নয়। দরকার "সন্দেহশীল অভ্যাস"—নিজের বিশ্বাসকে চ্যালেঞ্জ করার সাহস। আমি নিজে কয়েক বছর ধরে লক্ষ্য করি—আমার "ভাগ্যবান" জুতো পরার প্রবণতা আছে কিনা। একদিন সচেতনভাবে অন্য জুতো পরে পরীক্ষায় গেলাম। ফল একই। তথ্যের একটি বিন্দু, কিন্তু মনোভাব বদলে দিয়েছে।
পরিবারে আলোচনা জরুরি। আমার ভাতিজাকে বলি না, "এসব বিশ্বাস করো না।"
বলি, "কেন মনে হয় এটি কাজ করে?
কী প্রমাণ চাই?
কাজ না করলে কী হতো?"
প্রশ্ন করতে শেখানো, উত্তর নয়। কারণ, যে প্রশ্ন করে, সে কখনো অন্ধকারে থাকে না।
আধুনিকতা মানে স্মার্টফোন নয়, মনের স্বাধীনতা। কুসংস্কারের বিরুদ্ধে লড়াই জ্ঞানের যুদ্ধ নয়, ভয়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। রহমান সাহেব এখন সুস্থ, কিন্তু তার মতো আরো কতজন, যাদের "প্রাকৃতিক" চিকিৎসা শেষ সময় নষ্ট করে দেয়?
কত শিশু টিকা না পেয়ে অসুস্থ হয়, একজন বন্ধু মা তার পাঁচ বছরের মেয়েকে টিকা না দিয়েছেন কারণ প্রতিবেশী বলেছেন 'টিকা দিলে মেয়ের সৌন্দর্য নষ্ট হবে'—সেই মেয়ে এখন পলিওতে আক্রান্ত, কত নারী ঝাড়ফুঁকের নির্যাতন সহ্য করে?
আমাদের প্রজন্মের দায়িত্ব—শুধু নিজে বের হওয়া নয়, সন্দেহশীল অভ্যাস গড়ে তোলা। কারণ, কুসংস্কার টিকে থাকে চুপ থাকার মধ্যে দিয়ে। একটি প্রশ্ন, একটি আলোচনা, একটি সাহস—এতেই শুরু হয় পরিবর্তন। আজ আপনি নিজের পরিবারে একটা কুসংস্কার নিয়ে আলোচনা শুরু করুন। দেখবেন, পরিবর্তনের রাস্তা খুলছে।
#কুসংস্কার #বিজ্ঞানমনস্কতা #সচেতনতা #সমালোচনামনস্কচিন্তা
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।