পরামর্শ বনাম দায়
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণমূলক লেখা | ১৭ অক্টোবর ২০২৬
পঞ্চাশ বছর বয়সে কেউ চাকরি হারালে তাঁকে নতুন করে শুরু করার পরামর্শ দেওয়া সহজ। কিন্তু সেই পরামর্শ যিনি দিচ্ছেন, তিনি কি ভেবে দেখেছেন, এই বয়সে একজন মানুষের সামনে বাস্তবে কতগুলো দরজা খোলা থাকে? সংসারের দায়িত্ব, সন্তানের ভবিষ্যৎ, চিকিৎসার খরচ এবং নিয়মিত আয়ের প্রয়োজন যখন একসঙ্গে এসে দাঁড়ায়, তখন নতুন করে শুরু করার কথা যতটা সুন্দর শোনায়, বাস্তবে তা ততটাই কঠিন।
আমাদের সমাজে ব্যর্থতার দায় সাধারণত ব্যক্তির ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়। কেউ চাকরি হারালে তাঁর যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, আর্থিক সংকটে পড়লে আগের সিদ্ধান্তগুলোকে দোষ দেওয়া হয়। অথচ দীর্ঘ কর্মজীবনের পর একজন মানুষ কেন কর্মহীন হয়ে পড়লেন, তাঁর অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর সুযোগ ছিল কি না, কিংবা তাঁকে নতুন কর্মসংস্থানের উপযোগী করে তোলার কোনো ব্যবস্থা ছিল কি না, সেই প্রশ্নগুলো খুব কমই আলোচনায় আসে।
সমস্যাটা শুধু কাজ হারানো নয়, অনেক সময় সমস্যাটা হলো কাজ হারানোর পর সমাজ ও প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে একজন মানুষের মূল্য কমে যাওয়া।
বাংলাদেশের কর্মসংস্থানের বাস্তবতায় বয়স একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অনেক নিয়োগের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট বয়সসীমা থাকে। আবার বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে অভিজ্ঞ কর্মীদের নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রেও বেতন, বয়স এবং দীর্ঘমেয়াদি কর্মক্ষমতা নিয়ে নানা হিসাব করা হয়। ফলে একজন দক্ষ মানুষও জীবনের এমন এক পর্যায়ে এসে কর্মহীন হতে পারেন, যখন তাঁর অভিজ্ঞতা সবচেয়ে বেশি, অথচ নতুন চাকরি পাওয়ার সুযোগ তুলনামূলকভাবে কম।
এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন রয়েছে। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা অর্জনের পরও যদি একজন মানুষ কর্মক্ষেত্রে নিজের জায়গা ধরে রাখতে না পারেন, তাহলে তাঁর ব্যক্তিগত যোগ্যতার পাশাপাশি নিয়োগব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাও কি পর্যালোচনা করা উচিত নয়?
অবশ্যই সব চাকরি সবার জন্য ধরে রাখা সম্ভব নয়। প্রতিষ্ঠানকে পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়, দক্ষতা বাড়াতে হয় এবং প্রয়োজনে কর্মীসংখ্যা পুনর্বিন্যাস করতে হয়। কিন্তু সেই প্রক্রিয়ায় একজন কর্মীর দীর্ঘদিনের অবদান ও ভবিষ্যৎ জীবিকার প্রশ্নটিও বিবেচনায় থাকা দরকার। কর্মী ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া তুলনামূলকভাবে সহজ; ছাঁটাইয়ের পর তাঁর জীবনে কী ঘটছে, সেই দায় নেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তোলা অনেক কঠিন।
এই দায় শুধু নিয়োগদাতার নয়। সরকারেরও ভূমিকা রয়েছে। বয়স্ক কর্মীদের জন্য পুনঃপ্রশিক্ষণ, স্বল্পমেয়াদি দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সহায়তা এবং বাস্তবসম্মত পুনর্বাসনব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। অভিজ্ঞ মানুষদের পরামর্শক হিসেবে কাজে লাগানো, ক্ষুদ্র উদ্যোগে সহায়তা দেওয়া কিংবা নতুন পেশায় প্রবেশের সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে। এসব উদ্যোগ কেবল একজন কর্মহীন মানুষের উপকার করবে না, তাঁর অর্জিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকেও সমাজের কাজে লাগাবে।
তবে নতুন করে শুরু করার অর্থ সব সময় আগের অবস্থানে ফিরে যাওয়া নয়। একজন ব্যাংক কর্মকর্তা হয়তো আর আগের বেতনের চাকরি পাবেন না। তাঁকে কম আয়ের কাজ গ্রহণ করতে হতে পারে, নতুন দক্ষতা অর্জন করতে হতে পারে, কিংবা নিজের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ভিন্ন কোনো পেশায় যেতে হতে পারে। এসব সিদ্ধান্তের সঙ্গে আত্মসম্মান, পারিবারিক দায়িত্ব এবং আর্থিক নিরাপত্তার প্রশ্ন জড়িয়ে থাকে। তাই পরিবর্তনের পরামর্শ দেওয়ার আগে পরিবর্তনের মূল্যটিও বুঝতে হবে।
একই সঙ্গে ব্যক্তির নিজের দায়িত্বও অস্বীকার করা যায় না। সময়ের সঙ্গে দক্ষতা হালনাগাদ করা, আয়ের বিকল্প উৎস বিবেচনা করা এবং পরিস্থিতি বদলালে নতুন সিদ্ধান্ত নেওয়ার মানসিকতা থাকা জরুরি। কিন্তু ব্যক্তিগত উদ্যোগের কথা বলে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতাকে আড়াল করা ঠিক নয়। একজন মানুষ চেষ্টা করবেন, আর রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের দায় এড়িয়ে যাবে, এমন ব্যবস্থাকে ন্যায্য বলা যায় না।
জীবনের কোনো পর্যায়ে এসে পরিচিত পথ বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তখন বিকল্প পথ খুঁজতে হয়, কখনো নিজের প্রত্যাশাও বদলাতে হয়। কিন্তু প্রতিটি মানুষের পক্ষে একইভাবে ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব নয়। কারও সঞ্চয় আছে, পরিবারের সহযোগিতা আছে; কারও এসবের কিছুই নেই। ফলে সবার কাছে একই ধরনের সাফল্য আশা করাও বাস্তবসম্মত নয়।
দেরি হয়েছে কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর শুধু বয়স দিয়ে নির্ধারণ করা যায় না। দেখতে হবে, একজন মানুষের সামনে কী সুযোগ রয়েছে, কী সীমাবদ্ধতা রয়েছে এবং সেই সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করতে তিনি কী ধরনের সহায়তা পাচ্ছেন।
একটি ট্রেন ছেড়ে গেলে অন্য পথ খোঁজা সম্ভব। কিন্তু যাঁর হাতে ভাড়া নেই, তাঁর কাছে বিকল্প পথের পরামর্শ খুব বেশি কাজে আসে না। তাঁর প্রথম প্রয়োজন যাত্রা চালিয়ে যাওয়ার মতো বাস্তব সহায়তা।
তাই নতুন করে শুরু করার সাহস যেমন জরুরি, তেমনি জরুরি এমন একটি সমাজ গড়ে তোলা, যেখানে জীবনের মাঝপথে কর্মহীন হয়ে পড়া মানুষকে তাঁর বয়সের কারণে অপ্রয়োজনীয় মনে করা হবে না।
জীবনে দেরি হতে পারে, সুযোগ সীমিত হতে পারে, কিছু স্বপ্ন অপূর্ণও থেকে যেতে পারে। সবকিছু নতুন করে পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই। কিন্তু একটি কঠিন সময়ের কারণে মানুষের অভিজ্ঞতা, যোগ্যতা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকে অস্বীকার করারও কোনো যুক্তি নেই। ব্যক্তির চেষ্টা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা পাশাপাশি এগোলেই নতুন করে শুরু করার কথাটি নিছক সান্ত্বনা না হয়ে বাস্তব সম্ভাবনায় পরিণত হতে পারে।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।