সীমার ওপারে
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণমূলক লেখা | ২ নভেম্বর ২০২৬
পঞ্চাশ বছর বয়সে চাকরি হারানো একজন মানুষকে আমাদের সমাজ কী চোখে দেখে? প্রশ্নটা সহজ মনে হলেও এর উত্তর অস্বস্তিকর। কর্মজীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও অনেক মানুষ এই বয়সে এসে নতুন চাকরির বাজারে নিজেদের প্রায় অপ্রয়োজনীয় অবস্থায় দেখতে পান। যে অভিজ্ঞতা একসময় তাঁদের প্রতিষ্ঠানের সম্পদ ছিল, চাকরি হারানোর পর সেই অভিজ্ঞতাই নতুন নিয়োগের ক্ষেত্রে যথেষ্ট বলে বিবেচিত হয় না।
একজন তরুণ চাকরি হারালে তাঁকে বলা হয়, সামনে অনেক সময় পড়ে আছে। মধ্যবয়সী কাউকে একই পরিস্থিতিতে পড়তে দেখলে পরিচিত মানুষের প্রথম প্রশ্ন হয়, এখন কী করবেন?
এই দুটি প্রতিক্রিয়ার মধ্যেই আমাদের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য স্পষ্ট।
আমরা মানুষের যোগ্যতাকে প্রায়ই তাঁর বর্তমান পদবি, আয় কিংবা প্রতিষ্ঠানের পরিচয় দিয়ে বিচার করি। ফলে চাকরি হারানো মানে শুধু মাসিক আয়ের উৎস বন্ধ হওয়া নয়, অনেকের কাছে নিজের সামাজিক পরিচয় হারিয়ে ফেলার অভিজ্ঞতাও।
দীর্ঘদিনের সহকর্মীরা ব্যস্ত হয়ে পড়েন। পরিচিত মানুষের ফোন কমে আসে। পারিবারিক অনুষ্ঠানে গেলে কেউ সহানুভূতি জানান, কেউ অপ্রয়োজনীয় পরামর্শ দেন। সবচেয়ে বিব্রতকর মুহূর্তটি আসে তখন, যখন কেউ জানতে চান, নতুন কোথাও যোগ দিয়েছেন কি না।
প্রশ্নকর্তার কাছে এটি সাধারণ কৌতূহল। উত্তরদাতার কাছে কখনো নিজের অসহায়ত্ব নতুন করে স্বীকার করার মতো।
এখানে ব্যক্তিগত ব্যর্থতার চেয়ে বড় একটি সামাজিক সমস্যা রয়েছে।
আমাদের কর্মক্ষেত্রে অভিজ্ঞতার মূল্য নিয়ে যথেষ্ট অসংগতি দেখা যায়। চাকরিতে থাকতে একজন কর্মীর দীর্ঘ অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। অথচ নতুন নিয়োগের সময় অনেক প্রতিষ্ঠান অপেক্ষাকৃত কম বয়সী প্রার্থীকে অগ্রাধিকার দেয়। এর পেছনে বেতন কাঠামো, প্রযুক্তিগত দক্ষতা কিংবা প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব পরিকল্পনা কাজ করতে পারে। কিন্তু বয়সকে যোগ্যতার বিকল্প মাপকাঠি বানানো হলে অভিজ্ঞ কর্মীদের জন্য সুযোগ সংকুচিত হয়।
অন্যদিকে কর্মজীবনের মাঝপথে নতুন দক্ষতা অর্জনের সুযোগও সবার সমান নয়। প্রশিক্ষণের খরচ, প্রযুক্তির পরিবর্তন এবং পারিবারিক দায়িত্ব অনেকের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
তাই শুধু দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর পরামর্শ দিয়ে এই সংকটের সমাধান সম্ভব নয়।
একজন মানুষ নতুনভাবে শুরু করতে চাইলেও তাঁর জন্য উপযুক্ত প্রশিক্ষণ, কাজের সুযোগ এবং প্রয়োজনীয় আর্থিক নিরাপত্তা থাকতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকার ও নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর যৌথ উদ্যোগ প্রয়োজন। মধ্যবয়সী কর্মহীন মানুষের জন্য স্বল্প খরচে দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ, প্রশিক্ষণকালীন আর্থিক সহায়তা এবং নিয়োগে বয়সভিত্তিক বৈষম্য কমানোর কার্যকর নীতিমালা চালু করা যেতে পারে। অভিজ্ঞ কর্মীদের পরামর্শক বা খণ্ডকালীন কাজে যুক্ত করার সুযোগও বাড়ানো প্রয়োজন।
কর্মসংস্থানের সংকটকে কেবল ব্যক্তিগত মনোবলের পরীক্ষায় পরিণত করলে প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব আড়ালে চলে যায়।
তবু প্রশ্ন থেকে যায়, প্রতিকূল পরিস্থিতিতে মানুষ নিজের অবস্থানকে কীভাবে দেখবেন?
দীর্ঘদিন একটি পেশায় থাকার ফলে মানুষ অনেক সময় নিজের সব যোগ্যতাকে সেই পেশার সঙ্গে এক করে ফেলেন। একজন ব্যাংক কর্মকর্তা হয়তো হিসাব, ব্যবস্থাপনা, গ্রাহকসেবা কিংবা ঝুঁকি মূল্যায়নে অভিজ্ঞ। কিন্তু চাকরি হারানোর পর তিনি নিজেকে শুধু একজন সাবেক ব্যাংক কর্মকর্তা হিসেবে দেখতে শুরু করেন।
তাঁর অর্জিত দক্ষতা অন্য কোথায় কাজে লাগতে পারে, সেই প্রশ্নটি অনেক সময় নিজের কাছেই করা হয় না।
অবশ্য দক্ষতা থাকা আর সেই দক্ষতা কাজে লাগানোর সুযোগ পাওয়া এক বিষয় নয়। বাজারে চাহিদা না থাকলে অভিজ্ঞতার মূল্যও সীমিত হয়ে পড়ে। এই বাস্তবতা স্বীকার করেই বিকল্প পথের কথা ভাবতে হবে।
আমাদের আরেকটি সমস্যা হলো, আমরা সাফল্যকে একটি নির্দিষ্ট বয়সের মধ্যে অর্জন করার বিষয় হিসেবে দেখি। পঁয়ত্রিশে প্রতিষ্ঠা, পঞ্চাশে আর্থিক নিরাপত্তা, ষাটে অবসর। এই হিসাবের বাইরে কারও জীবন চলে গেলে তাঁকে ব্যতিক্রম হিসেবে দেখা হয়।
কিন্তু মানুষের জীবন কোনো নির্ধারিত সময়সূচি মেনে এগোয় না।
কেউ অল্প বয়সে প্রতিষ্ঠিত হয়েও পরে সব হারান। কেউ দীর্ঘদিন সংগ্রাম করে সামান্য স্থিতি খুঁজে পান। আবার কারও জীবনে এমন অসুস্থতা আসে, যা তাঁর পূর্বপরিকল্পনার প্রায় সবকিছু বদলে দেয়।
যে মানুষটি আজ কর্মহীন, তিনি হয়তো দীর্ঘদিন একটি পরিবারের দায়িত্ব পালন করেছেন। যে মানুষটি আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়েছেন, তিনি হয়তো জীবনের বড় একটি অংশ চিকিৎসার পেছনে ব্যয় করেছেন। তাঁদের বর্তমান অবস্থাকে ব্যক্তিগত অযোগ্যতার প্রমাণ হিসেবে দেখা অন্যায়।
“দৃষ্টি যেখানে সীমিত, সম্ভাবনা সেখানে সীমাহীন” কথাটি তাই আক্ষরিক অর্থে গ্রহণ করতে আমার আপত্তি আছে।
মানুষের সম্ভাবনা সত্যিকার অর্থে সীমাহীন নয়। বয়স, স্বাস্থ্য, অর্থনৈতিক অবস্থা এবং সামাজিক কাঠামো তার পরিধি নির্ধারণ করে। তবে আমাদের দৃষ্টির সীমাবদ্ধতার কারণে সেই পরিধি কখনো বাস্তবের চেয়েও ছোট হয়ে যায়।
এই পার্থক্যটি বোঝা জরুরি।
একজন মানুষের পক্ষে হয়তো আগের অবস্থানে ফিরে যাওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু তাঁর অভিজ্ঞতা অন্য কোনো কাজে লাগতে পারে। আবার সেটিও সম্ভব না হলে তাঁকে ব্যর্থ হিসেবে বিবেচনা করার কোনো যুক্তি নেই।
সমাজের দায়িত্ব শুধু সফল মানুষকে সম্মান জানানো নয়, বিপর্যস্ত মানুষটির জন্যও সম্মানজনকভাবে বেঁচে থাকার পরিবেশ তৈরি করা। কর্মসংস্থানের সুযোগ, বয়সনিরপেক্ষ মূল্যায়ন এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে শুধু ব্যক্তিকে নতুন স্বপ্ন দেখার পরামর্শ দেওয়া যথেষ্ট নয়।
কারণ মানুষের মর্যাদা তাঁর উপার্জনের সঙ্গে শেষ হয়ে যায় না।
(বিঃদ্রঃ- লেখাটি যখন বিভিন্ন গ্রুপে পোস্ট হবে সে তারখটি দেওয়া হয়েছে ।)
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।