ডিজিটাল যন্ত্রণা: যুবকদের অদৃশ্য যুদ্ধ
মোহাম্মাদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী | ১৫ নভেম্বর, ২০২৫
আমার বন্ধু রাকিব। বয়স ২৬। গত বছর সে চাকরি হারিয়েছে। সকালে ঘুম থেকে উঠেই ফোন হাতে নেয়। ইনস্টাগ্রামে স্ক্রল করে।
দেখে—তার ক্লাসমেট ঢাকায় ফ্ল্যাট কিনেছে, আরেকজন দুবাইতে ঘুরছে। রাকিবের মনে হয়, সে ব্যর্থ।
সে আমাকে বলেছিল, “ভাই, আমার জীবনটা যেন একটা ফিল্টার ছাড়া ছবি—কোনো রঙ নেই।”
এই গল্প শুধু রাকিবের নয়। বাংলাদেশে প্রতি তিনজন যুবকের মধ্যে একজন এখন NEET—অর্থাৎ, নট ইন এডুকেশন, এমপ্লয়মেন্ট অর ট্রেনিং। তারা পড়াশোনা করছে না, চাকরি করছে না, কোনো প্রশিক্ষণও নিচ্ছে না।
এই ৩০.৯% যুবকের মধ্যে অনেকেই রাত জেগে ফোনে অন্যের জীবন দেখে। তুলনা করে। নিজেকে ছোট মনে করে। এই তুলনা তাদের মনের মধ্যে একটা অদৃশ্য ক্ষত তৈরি করে—যেটা কেউ দেখে না, কিন্তু রক্তপাত চলতে থাকে।
আমি নিজেও এই যুদ্ধের মধ্যে ছিলাম। ২০২৩ সালে আমার চাকরি চলে গেল। সারাদিন ফেসবুকে দেখতাম—বন্ধুরা প্রমোশন পাচ্ছে, বিয়ে করছে, বাচ্চা নিচ্ছে। আমার মনে হতো, আমি পিছিয়ে পড়ছি। রাতে ঘুম আসত না।
একদিন মা বললেন,
“তুই কি অসুস্থ?”
আমি বলতে পারিনি—আমি অসুস্থ, কিন্তু ওষুধ লাগবে না, লাগবে একটা বন্ধু।
সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের জীবনে এসেছে যেন একটা দুধারা তলোয়ার। একদিকে সংযোগ, আরেকদিকে বিষ।
প্রতিটি পোস্ট আমাদের মনে প্রশ্ন জাগায়—
“আমি কেন পারছি না?”
এই প্রশ্ন যখন রাতে ঘুম ভাঙায়, তখন শুরু হয় ডিপ্রেশন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যারা দিনে ৩ ঘণ্টার বেশি সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে, তাদের মধ্যে উদ্বেগের মাত্রা ২.৭ গুণ বেশি।
কিন্তু সমস্যাটা শুধু ফোনের নয়। আমাদের পরিবার, সমাজ, শিক্ষাব্যবস্থা—সবাই যেন একটা অলিখিত চাপ দেয়: “পারফেক্ট হও।”
বাবা-মা বলেন, “পড়াশোনা কর, চাকরি কর।”
কেউ জিজ্ঞেস করে না, “তুই ঠিক আছিস?”
স্কুল-কলেজে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কোনো ক্লাস নেই। ফলে যুবকরা তাদের যন্ত্রণা লুকিয়ে রাখে।
আমি যখন এই যন্ত্রণার মধ্যে ছিলাম, তখন একটা ছোট্ট ঘটনা আমাকে বদলে দিয়েছে।
আমার পাড়ার একটা কমিউনিটি সেন্টারে প্রতি শুক্রবার সন্ধ্যায় যুবকরা জমায়েত হয়। কোনো এজেন্ডা নেই। শুধু চা আর গল্প। প্রথম দিন আমি গিয়েছিলাম লজ্জায়। কিন্তু যখন শুনলাম—আরেকজনও চাকরি হারিয়েছে, আরেকজনের বাবা অসুস্থ, আরেকজন প্রেমে ব্যর্থ—তখন বুঝলাম, আমি একা নই।
ওই সেন্টারে আমরা কথা বলি। কেউ কাঁদে, কেউ হাসে।
কেউ বলে, “আমি আজ একটা ছোট কাজ শুরু করেছি—অনলাইনে টিউশনি দিচ্ছি।”
কেউ বলে, “আমি ফোন বন্ধ করে বই পড়ছি।”
এই গল্পগুলো আমাদের মধ্যে একটা আশা জাগায়। এই আশা কোনো ফিল্টার ছাড়া, কোনো লাইক ছাড়া।
আমি এখন ফোন কম ব্যবহার করি। সকালে উঠে প্রথমে জানালা খুলি। বাইরে দেখি—রাস্তায় লোক হাঁটছে, পাখি ডাকছে।
এই বাস্তব জীবন আমাকে মনে করিয়ে দেয়—আমার জীবনটা আমার। অন্যের জীবন দেখে নয়, নিজের পায়ে হেঁটে এগোতে হবে।
যুবকদের জন্য আমার একটা ছোট পরামর্শ:
ফোন বন্ধ করো না, কিন্তু সময় বেঁধে দাও। দিনে ৩০ মিনিটের বেশি সোশ্যাল মিডিয়া নয়।
একজন বন্ধু খুঁজে নাও। যার সঙ্গে মুখোমুখি কথা বলা যায়।
ছোট কাজ শুরু করো। একটা বই পড়া, একটা গাছ লাগানো, একটা ডায়েরি লেখা—এগুলোই আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনে।
ডিজিটাল যুগ আমাদের হাতে একটা শক্তিশালী হাতিয়ার দিয়েছে। কিন্তু এই হাতিয়ার যদি আমাদের মনকে ক্ষত করে, তাহলে আমাদেরই সেটা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। আমাদের যুদ্ধটা সোশ্যাল মিডিয়ার সঙ্গে নয়—নিজের মনের সঙ্গে।
আর এই যুদ্ধে জিততে হলে লাগবে একটা হাত—যেটা ধরলে বোঝা যায়, আমি একা নই।
#আমারগল্প #মানসিকস্বাস্থ্য #যুবকেরযুদ্ধ #বাস্তবজীবন #সংযোগ
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।