অন্যের জীবনের হিসাব
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণমূলক লেখা
৩ নভেম্বর, ২০২৬
লোকটা নতুন গাড়ি কিনেছেন। আত্মীয়স্বজন এসে গাড়ি দেখছেন, ছবি তুলছেন, অভিনন্দন জানাচ্ছেন। কেউ বলছেন, “এবার তো বেশ বড়লোক হয়ে গেলে!” কেউ আবার গাড়ির দাম জানতে চাইছেন।
লোকটা হাসছেন। এত দিনের পরিশ্রমের পর নিজের একটা গাড়ি হয়েছে, আনন্দ তো লাগবেই। শুধু তাঁর স্ত্রী জানেন, গত কয়েক মাস ধরে মানুষটাকে ঠিকমতো রাতের খাবার খেতে দেখেননি। খেতে বসে ফোন আসে, তিনি উঠে যান। ফিরে এসে খাবার ঠান্ডা হয়ে গেলে দু-এক লোকমা খেয়ে আবার কাজে বসেন।
সেদিন রাতেও স্ত্রী ভাত বেড়ে টেবিলে বসে আছেন। ঘড়িতে এগারোটা। লোকটা গ্যারেজে গাড়ির গায়ে হাত বুলিয়ে দেখছেন। তারপর ফোনটা কানে নিয়ে বললেন, “না ভাই, কালকের মধ্যে টাকাটা জোগাড় করতেই হবে।”
স্ত্রী একবার জানালা দিয়ে তাকালেন। তারপর ভাতের থালাটা ঢেকে রাখলেন।
গাড়িটা কেনার দিন মানুষটি যতটা আনন্দ পেয়েছিলেন, সেই আনন্দের পেছনে কতগুলো কিস্তি, কতটা দুশ্চিন্তা আর কতগুলো নির্ঘুম রাত জমে আছে, বাইরে থেকে তা বোঝার উপায় নেই।
জানালার ওপাশে
একই সময়ে পাশের গলির ছোট্ট বাড়িটির ছাদে বাবা আর মেয়ে বসে আছে। লোকটির কোনো গাড়ি নেই। মাসের শেষ দিকে বাজারের খরচ মেলাতে তাঁকে বেশ কয়েকবার হিসাব করতে হয়। মেয়েটি নতুন জামা চেয়েছে, তিনি এখনো কিনে দিতে পারেননি।
তবু রাতে কাজ থেকে ফিরে মেয়েটি যখন বলে, “বাবা, আজ স্কুলে কী হয়েছে জানো?” তিনি ফোনটা পাশে রেখে শোনেন। মেয়ের গল্পের মাঝখানে হাসেন, প্রশ্ন করেন। ছাদ থেকে নামার সময় মেয়েটি তাঁর হাত ধরে থাকে।
সেই দৃশ্যটা যদি গাড়িওয়ালা লোকটি দূর থেকে দেখতেন, হয়তো তাঁরও ভালো লাগত। হয়তো মনে হতো, মানুষটা কত নিশ্চিন্তে মেয়ের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছেন!
কিন্তু তিনি কি জানতেন, সেই বাবা রাতে বাজারের খাতা খুলে বসেন? চাল, ডাল, তেল আর মেয়ের স্কুলের খরচ লিখে শেষে কয়েকটি অঙ্ক মেলাতে পারেন না? মেয়ের চাওয়া পূরণ করতে না পারার কষ্ট নিয়ে তিনিও যে চুপচাপ বসে থাকেন, সেটা কি ছাদের দৃশ্য দেখে বোঝা যায়?
একজনের গাড়ি আছে, কিন্তু সময়ের অভাব। অন্যজনের সময় আছে বলে মনে হয়, কিন্তু টাকার অভাব তাঁকে প্রতিদিন তাড়া করে।
দূর থেকে দুজনের জীবনই অন্য রকম দেখায়। কাছে গেলে বোঝা যায়, কারও জীবনই ছবির মতো সাজানো নয়।
যে হিসাব চোখে পড়ে না
গাড়িওয়ালা লোকটির আত্মীয়রা তাঁর নতুন গাড়ি দেখেছেন। কেউ দেখেননি, গাড়ির কিস্তির তারিখ এগিয়ে এলে তিনি কীভাবে খরচের খাতা নিয়ে বসেন। তাঁর স্ত্রী জানেন, রাতে খাবার ঠান্ডা হয়ে যায়; কিন্তু তিনিও হয়তো জানেন না, স্বামীর মাথায় ঠিক কতটা চাপ জমেছে।
পাশের বাড়ির মানুষটিকে দেখে মনে হতে পারে, তাঁর জীবন সহজ। মেয়ের সঙ্গে গল্প করার সময় আছে, সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরেন, ছুটির দিনে পরিবারের পাশে থাকেন। কিন্তু তাঁর পকেটের হিসাব কেউ জানে না। দোকানে গিয়ে মেয়ের পছন্দের জিনিসটা হাতে নিয়ে আবার রেখে আসার কষ্টটাও বাইরে থেকে দেখা যায় না।
আমরা প্রায়ই অন্যের জীবনের সুন্দর মুহূর্তগুলো দেখি। কারও নতুন গাড়ি, কারও পরিবারের সঙ্গে হাসিমুখের ছবি, কারও বেড়াতে যাওয়া। তারপর নিজের জীবনের সঙ্গে সেগুলোর তুলনা করি।
নিজের পুরো জীবনের সঙ্গে অন্যের জীবনের বেছে নেওয়া কয়েকটি সুন্দর মুহূর্ত মিলিয়ে দেখি।
এখানেই হিসাবটা গড়বড় হয়ে যায়। কারণ, অন্যের জীবনের যে অংশটুকু আমাদের চোখে পড়ে, তার সঙ্গে নিজের জীবনের আড়ালে থাকা সব দুশ্চিন্তা, ব্যর্থতা আর অপূর্ণতাও আমরা মেলাতে বসি।
দুটো অসম্পূর্ণ খাতা
রাত আরও গভীর হলে গাড়িওয়ালা লোকটি ঘরে ফিরলেন। টেবিলে ঢাকা দেওয়া খাবার পড়ে আছে। স্ত্রী ঘুমিয়ে পড়েছেন কি না, তিনি খেয়াল করলেন না। ফোনের আলোয় বসে পরদিনের কাজের হিসাব মেলাতে লাগলেন।
পাশের বাড়ির বাবা তখন বাজারের খাতা খুলেছেন। মেয়ের স্কুলের বেতন আর মাসের বাকি খরচ লিখে কয়েকবার যোগ করলেন। অঙ্কটা মিলল না। তিনি খাতাটা বন্ধ করে রাখলেন।
একজনের সামনে গাড়ির কিস্তির হিসাব, অন্যজনের সামনে সংসারের বাজার। একজনের ঘরে গাড়ি আছে, অন্যজনের ঘরে মেয়ের হাত ধরে ছাদে বসার অবসর। দুজনের জীবনেই কিছু পাওয়া আছে, কিছু না-পাওয়াও রয়ে গেছে।
কিন্তু সকালে যখন গাড়িওয়ালা লোকটি গাড়ি নিয়ে বের হবেন, পাশের বাড়ির মানুষটি হয়তো আবার তাঁর দিকে তাকিয়ে ভাববেন, লোকটার জীবন কত সুন্দর!
আর গাড়িওয়ালা লোকটি রাস্তার পাশে বাবা-মেয়েকে একসঙ্গে হাঁটতে দেখলে হয়তো এক মুহূর্তের জন্য নিজের ঘরের কথা ভাববেন।
রাত শেষে দুজনেই খাতা বন্ধ করেছেন। শুধু কারও হিসাবেই সব অঙ্ক মেলেনি।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।