বড়দের জুতা, ছোটদের পা
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী । ২৪ মে, ২০২৬
“ওর পায়ের মাপ ৫। আমরা জোর করে ৮ নম্বর জুতা পরায় দিছি।
বলে দিছি—‘বড় হইলে ফিট হবে’।
এই মেয়েটা হাঁটবে কীভাবে?”
আমরা কিশোরী মেয়েদের কাছে একসাথে তিনটা জিনিস চাই।
এক: বড়দের মতো ম্যাচিউরিটি। সব বুঝতে হবে। রাগ দেখানো যাবে না।
দুই: বাচ্চাদের মতো বাধ্যতা। মুখে মুখে তর্ক না। যা বলছি, তাই।
তিন: দেবীদের মতো ধৈর্য। সহ্য করো। মানিয়ে নাও। চুপ থাকো।
তিনটা রোল। একটা মানুষ।
একটা ব্রেইন — যেটা এখনো তৈরি হইতেছে।
ওর বয়স ১৩। অথচ আমরা চাই ২৫ বছরের মাথা।
সায়েন্স বলে, মস্তিষ্কের যে অংশটা সিদ্ধান্ত, আবেগ আর ঝুঁকি বোঝে—তা পুরোপুরি ম্যাচিউর হতে সময় লাগে প্রায় ২০–২৫ বছর।
মাঝখানের বয়সটা আমরা ওকে দিয়ে বাঁচতে দিই না।
রাগ হয়।
কিন্তু সেই রাগটা কখনো শব্দ পায় না।
ভেতরেই আটকে থাকে।
ও ভুল করবে। ভাঙবে। আবার শিখবে।
এটাই তো স্বাভাবিক।
কিন্তু আমরা ভুল করার স্পেস দেই না। শুধু রেজাল্ট চাই। A+। লক্ষ্মী মেয়ে। পারফেক্ট।
ফলাফল কী হয়?
৫ নম্বর পায়ে ৮ নম্বর জুতা পরলে দুইটা জিনিস হয়।
এক: পা ছিলে রক্ত বের হয়। সে সব সহ্য করে, নিজেকে শেষ করে দেয়। হাসে।
কিন্তু ভেতরে?
দুই: হাঁটা বন্ধ করে দেয়। দরজা লাগায়। ফোনের ভেতর ঢুকে যায়।
আমরা বলি, “মোবাইল খাইছে”।
আমরা দেখি সে ফোনে আছে। কিন্তু দেখি না সে আসলে কোথা থেকে পালাচ্ছে।
ফোনটা সমস্যা না।
ওটা শুধু পালানোর জায়গা।
আসলেই কি মোবাইল খাইছে?
নাকি আমরা ওর পা কাটছি?
আমরা কী কী “বড়দের জুতা” ওদের পরাই?
১. ইমোশনাল লেবার: “তোর মা অসুস্থ, সংসারটা তুই দেখ”। “ছোট ভাই কাঁদতেছে, থামা”।
যে বয়সে ওর নিজের কান্না থাকার কথা, সে অন্যের কান্না সামলায়।
ক্লান্ত লাগে।
খুব ক্লান্ত।
২. সম্মানের বোঝা: “কিছু করলে লোকে কী বলবে”। “আমাদের মান-সম্মান তোর হাতে”।
১৪ বছরের ঘাড়ে পুরা গুষ্টির প্রেস্টিজ।
৩. ডাবল লাইফ: বাইরে হাসিমুখ, ভেতরে চাপা কান্না। দিনের বেলা পারফেক্ট, রাতে ক্লান্ত একটা মানুষ।
জায়গা নাই।
৪. সিদ্ধান্তহীন জীবন: “সাইন্স নিতে হবে”। “ওই জামা না”। “ওই ছেলের সাথে মিশবা না”।
১৮ বছর পর হঠাৎ বলি, “এবার নিজের লাইফ নিজে ডিসাইড করো”।
হাস্যকর।
তাহলে করবো কী?
জুতা খুলেন।
একটু দাঁড়ান।
খুব তাড়াহুড়ো না।
ওর বয়স ১৪। ১৪ বছরের মতোই ট্রিট করেন। ৪০ বছরের ধৈর্য চাইয়েন না।
রাগ করবে। কাঁদবে। দরজা লাগাবে।
ঠিক আছে।
এটা ক্রাইম না।
পড়তে দেন। উঠতে হেল্প করেন।
ছোট সিদ্ধান্ত নিতে দেন। চুল কাটতে চাইলে কাটুক।
পরে হয়তো আবার শিখবে।
ভুল হলে বসে বুঝান।
চিৎকার না।
শুধু একটু থামেন।
‘বড়’ না, ‘মানুষ’ বানান।
‘না’ বলতে শেখা। হেল্প চাইতে শেখা। কাঁদতে শেখা।
কিছু জায়গা আছে, যেখানে আর কথা চলে না।
শুধু বোঝা যায়।
নিজের পায়ের দিকে তাকান।
আপনি কিশোরী বয়সে কোন জুতা পরছিলেন?
শ্বশুরবাড়ি সামলানোর জুতা? পড়া বাদ দেওয়ার জুতা?
ব্যথা লাগছিল?
এখনো লাগে?
তাহলে আপনার মেয়ের পায়ে ওই জুতা দিয়েন না।
কিশোরী মানে ছোট মানুষ না।
কিশোরী মানে তৈরি হতে থাকা মানুষ।
ওকে ছোট করে বানাবেন না। ওকে বড় হওয়ার সময় দিন।
জুতা না কেটে… পা বড় হতে দিন।
আপনি যদি কখনো এমন কিছু দেখে থাকেন, লিখে ফেলুন।
কারণ আপনার একটা লাইন হয়তো কারও জন্য নিজেকে প্রথমবার চিনে ফেলা।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।