বিশ্বস্ততার দাম
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণমূলক | ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বিশ্বস্ততা খুব দামি একটা জিনিস।
এর দাম টাকায় দিতে হয় না। দিতে হয় সময় দিয়ে, নিজের সুবিধা ছাড়ার মধ্য দিয়ে, কখনো কখনো ঝুঁকি নিয়েও। তাই মুখে সবাই বিশ্বস্ততার কথা বললেও বাস্তবে বিশ্বস্ত থাকা সহজ নয়।
কারণ ভালো সময়ে কারও পাশে থাকা কঠিন নয়। কঠিন হলো, তার পাশে দাঁড়ানো যখন পাশে দাঁড়ালে নিজেরই কিছু হারানোর সম্ভাবনা থাকে।
কর্মক্ষেত্রে এর একটা ছোট্ট দৃশ্য প্রায়ই দেখা যায়।
কোনো সহকর্মীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। মিটিংয়ে সবাই চুপ। কেউ জানে অভিযোগটা পুরোপুরি সত্য নয়, কিন্তু কেউ কথা বলতে চায় না। কারণ আজ তার হয়ে কথা বললে কাল নিজের নামটাও আলোচনায় আসতে পারে।
হঠাৎ একজন বলে উঠলেন, “স্যার, সিদ্ধান্তটা আবার দেখা দরকার। বিষয়টা যেভাবে বলা হচ্ছে, পুরোটা ঠিক নয়।”
কথাটা বলার পর ঘরটা কিছুক্ষণ চুপ হয়ে থাকে।
এই মানুষটি হয়তো কোনো পুরস্কার পাবেন না। বরং নিজের জন্য একটা অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করলেন। তবু তিনি কথা বললেন।
বিশ্বস্ততা অনেক সময় এমনই দেখতে হয়।
বন্ধুত্বেও একই সত্য আছে, যদিও তার চেহারা আলাদা।
বন্ধু নতুন চাকরি পেয়েছে, গাড়ি কিনেছে, ভালো বাড়িতে উঠেছে। তার আনন্দে যোগ দেওয়া সহজ। কিন্তু একদিন সে চাকরি হারাল। ফোন করা কমিয়ে দিল। মানুষের সঙ্গে দেখা করতে সংকোচ বোধ করছে। তখন তার পাশে বসার মতো বন্ধুর সংখ্যা হঠাৎ কমে যায়।
সেই সময় একজন ফোন করে বলে, “চল, চা খাই। কথা না বললেও হবে।”
এই একটি বাক্যের জন্য কোনো বড় আয়োজন লাগে না। কিন্তু এর মধ্যে যে বিশ্বস্ততা থাকে, তার মূল্য অনেক।
কারণ তখন বন্ধুত্ব থেকে পাওয়ার মতো কিছু নেই।
বরং দিতে হচ্ছে সময়।
সম্পর্কের ক্ষেত্রেও বিশ্বস্ততার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হয় তখন, যখন সম্পর্কটা আর সহজ থাকে না। রাগ হয়, ভুল বোঝাবুঝি হয়, অভিমান জমে। মানুষ তখন খুব সহজেই অন্যের ব্যক্তিগত কথাকে অস্ত্র বানিয়ে ফেলতে পারে।
কেউ আপনার দুর্বলতার কথা জানে। জানে কোন কথায় আপনি ভেঙে পড়বেন। সম্পর্ক খারাপ হওয়ার পর সে যদি সেই কথাগুলো অন্যের কাছে বলে বেড়ায়, তাহলে একসময় বুঝতে হয়—ভালোবাসা ছিল, কিন্তু বিশ্বস্ততা ছিল না।
কারণ বিশ্বস্ততা শুধু সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার নাম নয়। সম্পর্ক ভেঙে গেলেও যে বিশ্বাস আপনার কাছে রাখা হয়েছিল, তার মর্যাদা রাখা বিশ্বস্ততার অংশ।
এখানেই আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে।
বিশ্বস্ততা আর অন্ধ আনুগত্য এক জিনিস নয়।
আপনি কাউকে ভালোবাসেন বলে তার সব ভুলকে সঠিক বলতে হবে—এমন কোনো কথা নেই।
বরং সত্যিকারের বিশ্বস্ত মানুষই অনেক সময় সবচেয়ে অস্বস্তিকর কথাটা বলে।
যে বন্ধু আপনার প্রতিটি ভুলে হাততালি দেয়, সে হয়তো আপনাকে খুশি রাখছে। কিন্তু যে বন্ধু একসময় চুপ করে বলে, “তুই ভুল করছিস”—তার কথাটা শুনতে খারাপ লাগলেও সেই কথার মূল্য বেশি।
কারণ সে আপনার মন পাওয়ার চেষ্টা করছে না। সে আপনাকে হারাতে চায় না।
বিশ্বস্ততা তাই প্রশংসা নয়, প্রয়োজন হলে প্রতিবাদও।
কেউ অন্যায় করলে তার পাশে দাঁড়ানো বিশ্বস্ততা নয়। বরং অন্যায়ের বিরুদ্ধে তাকে থামানোই অনেক সময় তার প্রতি সবচেয়ে বড় দায়বদ্ধতা।
এই জায়গাটাই আমাদের সমাজে প্রায়ই গুলিয়ে যায়। আমরা এমন মানুষ চাই, যে আমাদের সঙ্গে থাকবে। কিন্তু অনেক সময় এমন মানুষ চাই না, যে আমাদের ভুলের সময়ও সত্যিটা বলবে।
কর্মক্ষেত্রে বিষয়টি আরও জটিল।
অনেক প্রতিষ্ঠান কর্মীর কাছে বিশ্বস্ততা চায়। কর্মী যেন কঠিন সময়ে প্রতিষ্ঠানের পাশে থাকে, অতিরিক্ত দায়িত্ব নেয়, প্রয়োজনে ছুটির দিনেও কাজ করে। এগুলো কর্মজীবনের বাস্তবতা হতে পারে।
কিন্তু প্রশ্নটা উল্টো দিক থেকেও করা দরকার।
প্রতিষ্ঠানটি কর্মীর বিপদের সময় কতটা বিশ্বস্ত?
যে কর্মী দশ বছর একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন, অসুস্থ শরীর নিয়েও অফিস করেছেন, রাতের ফোন ধরেছেন, প্রতিষ্ঠানের সংকটে নিজের সময় দিয়েছেন—একদিন যদি তার প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়, তখন প্রতিষ্ঠান কি তার দশ বছরের অবদানটুকু মনে রাখে?
নাকি একটি ই-মেইলেই সম্পর্ক শেষ হয়ে যায়?
সব প্রতিষ্ঠান এক রকম নয়। সব সম্পর্কও নয়। কিন্তু এই প্রশ্নটি করা জরুরি, কারণ বিশ্বস্ততা যদি শুধু এক পক্ষের কাছ থেকে প্রত্যাশা করা হয়, তাহলে সেটি আর বিশ্বস্ততা থাকে না। সেটি হয়ে যায় সুবিধা নেওয়ার একটি ব্যবস্থা।
মানুষের জীবনে এমন কিছু মানুষ থাকেন, যাদের মূল্য আমরা অনেক সময় তাদের উপস্থিতিতে বুঝি না।
তারা আপনার অনুপস্থিতিতে আপনার সম্মান রক্ষা করেছে। বিপদের সময় ফোন ধরেছে। আপনার ভুলের সময় আপনাকে থামিয়েছে। আপনার সাফল্যে নিজের ক্ষতি না গুনে খুশি হয়েছে।
তাদের সঙ্গে সম্পর্কের কোনো লিখিত চুক্তি ছিল না।
ছিল শুধু বিশ্বাস।
আর বিশ্বাসের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হয় তখন, যখন বিশ্বাস ভাঙার সুযোগ আপনার সামনে খোলা থাকে।
আপনি চাইলে কারও গোপন কথা বলে দিতে পারেন। চাইলে বন্ধুর দুর্বলতাকে নিজের সুবিধায় ব্যবহার করতে পারেন। চাইলে সুযোগ বুঝে পুরোনো সম্পর্ক অস্বীকার করতে পারেন।
কিন্তু করেন না।
কারণ আপনার কাছে মানুষটির বিশ্বাসের একটা দাম আছে।
সেই দামই বিশ্বস্ততার দাম।
এটা সবসময় লাভজনক নয়। কখনো কখনো বরং ক্ষতির।
তবু কিছু মানুষ লাভ-ক্ষতির হিসাবের বাইরে গিয়ে সম্পর্কের মর্যাদা রাখে। হয়তো সে কারণেই জীবনের শেষ দিকে এসে মানুষ সম্পদের চেয়ে মানুষের কথা বেশি মনে রাখে।
কে কত বড় পদে গেল, কতটা সফল হলো—এসব সময়ের সঙ্গে ম্লান হয়ে যায়।
কিন্তু কে কঠিন সময়ে পাশে ছিল, কে আপনার অনুপস্থিতিতে আপনার সম্মান রেখেছিল, কে ভুলের সময়ও সত্যিটা বলেছিল—এসবের হিসাব কোনো খাতায় লেখা থাকে না।
তবু মানুষ সেই হিসাবই সবচেয়ে বেশি মনে রাখে।
বিশ্বস্ততা তাই সস্তা কোনো গুণ নয়।
এটা সময় চায়। আত্মসংযম চায়। কখনো নিজের স্বার্থের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস চায়।
সবাই বিশ্বস্ত মানুষ খোঁজে।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত আসল প্রশ্নটা অন্য জায়গায়।
কেউ আমার ওপর বিশ্বাস রাখলে, আমি সেই বিশ্বাসের কতটা দাম দিতে পারি?
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।