বাবার চোখে পরিবার ও সন্তানের ভবিষ্যৎ
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী | ফেব্রুয়ারি ১১, ২০২৬
একজন বাবার চোখে দুনিয়া সবসময় দুই ভাগে বিভক্ত।
এক অর্ধেক ঘরের ভেতরে—পরিবারের নরম আলোয় ভরা। যেখানে মাসের শেষ দিনে খরচের হিসাব মেলাতে হয়, অসুখ এলে ঘুম ভেঙে যায়, আর টিনের ছাদের নিচে বসে নিরাপদ থাকার স্বপ্ন জমানো হয়।
অন্য অর্ধেক আকাশে—সন্তানের আকাশ। দূরের, খোলা, অনিশ্চিত। যেখানে তার স্বপ্ন ডানা মেলে, নিজের মতো করে উড়তে চায়।
এই দুই দৃষ্টির মাঝখানে টান শুরু হয় ঠিক তখনই, যখন সন্তান একদিন বলে—
“বাবা, আমি অন্য পথে যেতে চাই।”
এই বাক্যটা বাবার কানে শুধু একটা সিদ্ধান্ত নয়। এটা একসাথে ভালোবাসা, ভয় আর দায়িত্বের শব্দ। তখন বাবার ভেতরে নীরব একটা ঝড় ওঠে। বাইরে কিছু বলা হয় না, কিন্তু ভেতরে সবকিছু নড়ে যায়।
এই দ্বন্দ্বের শিকড়ে আছে ভালোবাসার এক অদ্ভুত দ্বৈততা।
বাবা জানেন—পরিবারের শক্ত মাটি না থাকলে সন্তানের স্বপ্ন টিকে না। আবার সন্তানের আলো নিভে গেলে, সংসারের আলোও একদিন নিভে যায়। তাই তার মাথার ভেতর বারবার একটা প্রশ্ন ঘোরে—
“এই পথে কি নিরাপত্তা আছে? আমার সন্তানের ভবিষ্যৎ কি সত্যিই সুরক্ষিত?”
একটা ছোট দৃশ্য মনে পড়ে।
ছেলের স্কুলজীবনের কথা। প্রজেক্ট জমা দেওয়ার আগের রাত। ঘরে বাতি জ্বলছে, সবাই ঘুমাচ্ছে। ছেলে বই খুলে বসে আছে। বাবা পাশে বসে কিছু বলছেন না। শুধু মাঝে মাঝে তাকিয়ে দেখছেন—ছেলেটা চেষ্টা করছে কি না। সেদিন কোনো উপদেশ ছিল না। ছিল শুধু উপস্থিতি।
কিন্তু বড় সিদ্ধান্ত এলে সেই নীরবতা আর সহজ থাকে না।
যখন বাবা বলেন, “এই বিষয় পড়ে কী হবে? শেষে চাকরি পাবে তো?”—সন্তানের কানে তা শোনায় ডানা কেটে নেওয়ার মতো।
কিন্তু বাবার কণ্ঠে জমে থাকে নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা। নিজের দেখা ব্যর্থতা। নিজের করা ভুল। তিনি জানেন, একটা ভুল সিদ্ধান্ত কতটা ভারী হতে পারে।
বাবার প্রজন্মের আকাশ ছিল ছোট, কিন্তু নির্ভরযোগ্য।
আশির–নব্বইয়ের দশকে মধ্যবিত্ত পরিবারের পথ ছিল গোনা কয়েকটা—সরকারি চাকরি, ব্যাংকের ডেস্ক, ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ড্রয়িং বোর্ড, ডাক্তারের স্টেথোস্কোপ। ঝুঁকি মানেই ছিল বিপদ। নিরাপত্তা মানেই সম্মান। সমাজ স্পষ্ট করে শিখিয়েছিল—একবার ভুল করলে সব শেষ।
বাবার মানচিত্রে সেই পুরোনো রাস্তাগুলো আজও আঁকা। সেখানে প্রতিটি বাঁক চেনা, প্রতিটি গন্তব্য আগেই নির্ধারিত।
কিন্তু সন্তানের মানচিত্র আলাদা।
ইন্টারনেট, ফ্রিল্যান্সিং, স্টার্টআপ—এই শব্দগুলো তার কাছে শুধু চাকরির বিকল্প নয়, নিজের জায়গা খোঁজার ভাষা। আজকের দিনে ক্যারিয়ার মানে শুধু মাসের শেষে বেতন নয়; এটি নিজের পরিচয় খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা।
বাবার চোখে যা অনিশ্চয়তা, সন্তানের চোখে তা সম্ভাবনা।
এই দুই আকাশের দূরত্ব আসলে বয়সের নয়।
এটা দেখার অভ্যাসের দূরত্ব। ভয়ের ভাষার দূরত্ব।
এই দূরত্ব প্রথমে খুব চুপচাপ আসে।
খাবারের টেবিলে কথা কমে যায়। ফোনে চোখ বেশি থাকে। বাবা প্রশ্ন করতে চান, কিন্তু জানেন না কীভাবে শুরু করবেন। সন্তান উত্তর দিতে চায়, কিন্তু ভয় পায়—ভুল বুঝলে কী হবে?
একদিন ছেলে বলে,
“বাবা, আমি এটা সত্যিই করতে চাই। ব্যর্থ হলেও আমি নিজের দায় নিজে নেব।”
বাবা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকেন। মাথা নাড়েন। ভেতরে প্রশ্ন জমে থাকে, কিন্তু মুখে আসে না। এই মুহূর্তটাই সবচেয়ে ভারী—ভালোবাসা আর স্বপ্ন মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যায়।
এই ভুল বোঝাবুঝি দীর্ঘ হলে তার ফলও কঠিন হয়।
যৌথ পরিবার ভাঙে। বাবা–মা ধীরে ধীরে একা হয়ে যান। সন্তান নিজের লড়াইয়ে মানসিক চাপে পড়ে। বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত পরিবারে এই দৃশ্য নতুন নয়—ফোনে কথা কমে যাওয়া, ঈদে না ফেরা, নীরব দূরত্ব।
বাবার ভেতরে তখন চলে আরেক যুদ্ধ।
তিনি ভাবেন—“আমি কি সন্তানের পথ আটকে দিচ্ছি? আমার ভয় কি ওর স্বপ্নের শত্রু?”
কিন্তু সমাজ তাকে শেখায়নি এই প্রশ্নগুলো উচ্চস্বরে করতে। তাকে শক্ত হতে বলা হয়েছে। ফলে সেই চাপ নেমে আসে সন্তানের ওপর।
তবুও, আলো পুরোপুরি নিভে যায় না।
যদি বাবা সন্তানের স্বপ্নকে শুধু ঝুঁকি না ভেবে চেষ্টা হিসেবে দেখেন, আর সন্তান বাবার ভয়ের পেছনের দায়িত্বটা বুঝতে শেখে—তখন মাঝখানে একটা নতুন জায়গা তৈরি হয়।
সেখানে বাবা নির্দেশ দেন না, কিন্তু অভিজ্ঞতা ভাগ করেন।
সন্তান সিদ্ধান্ত নেয়, কিন্তু বাস্তবতা অস্বীকার করে না।
এক সন্ধ্যায়, কোনো বড় সাফল্যের পর নয়—সাধারণ এক কথোপকথনে ছেলে বলে,
“বাবা, তোমার কথাগুলো মাথায় রেখেই এগিয়েছি।”
এই বাক্যটা বাবার জন্য যথেষ্ট। কারণ তিনি বোঝেন—ভরসা পুরোপুরি হারায়নি।
সবশেষে, বাবার সবচেয়ে বড় জয় সন্তানের সফলতা নয়।
জয় হলো—সন্তান ডানা মেলে উড়তে পারে, আর ফিরে এসে জানে—এখানে একটা চোখ আছে, যে এখনো অপেক্ষা করে।
এই দ্বন্দ্ব কোনো এক দিনের গল্প নয়।
এটা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলা এক নীরব কথোপকথন।
বোঝাপড়া হলে, এই টানাপোড়েনই একদিন শক্ত বন্ধনের সেতু হয়ে দাঁড়ায়।
#বাবারচোখে #পরিবারওভবিষ্যৎ #প্রজন্মেরদ্বন্দ্ব
#সন্তানেরস্বপ্ন #বাংলাবিশ্লেষণ
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।