শক্ত মেয়েটির ক্লান্তি
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণমূলক লেখা | ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
দুপুরের খাবার শেষ হতে তখনও কয়েক মিনিট বাকি। রান্নাঘর থেকে একবার ডাল, একবার ভাত, একবার ভাজি নিয়ে টেবিলে আসছে মেয়েটি। সবাই খেয়ে নিয়েছে কি না, সেটাই তার চিন্তা। নিজের প্লেটে খাবার তুলে বসার আগেই কেউ একজন বলল, “তোমার শরীরটা কেমন যেন লাগছে।”
মেয়েটি হাসল।
“কিছু না। আমি ঠিক আছি।”
এই “আমি ঠিক আছি” কথাটা অনেক নারী খুব সহজে বলে ফেলেন। এত সহজে যে, একসময় নিজের কাছেও হয়তো মনে হয় সত্যিই ঠিক আছেন।
অথচ শরীরটা ক্লান্ত। মাথাটা ভার। কয়েক রাত ভালো ঘুম হয়নি। মনের মধ্যে হয়তো জমে আছে কোনো অভিমান, কোনো অপূর্ণ ইচ্ছা, কোনো কথা যা কাউকে বলা হয়নি।
তবু তিনি ঠিক আছেন।
কারণ তাঁকে ছোটবেলা থেকেই শক্ত হতে শেখানো হয়েছে।
শক্ত মেয়ে কাঁদে না। শক্ত মেয়ে সংসারের সমস্যা নিয়ে বাড়াবাড়ি করে না। শক্ত মেয়ে নিজের কষ্টের কথা বারবার বলে না। দরকার হলে নিজের ইচ্ছাটা সরিয়ে রাখে। সবাইকে সামলায়।
আর যখন সে সত্যিই সব সামলাতে শেখে, তখন আমরা খুব সহজে বলে দিই, “ও তো শক্ত মেয়ে।”
প্রশংসার মতো শোনালেও কথাটার মধ্যে একটা অদৃশ্য দায়িত্ব আছে। যেন সে শক্ত, তাই তাকে আর আগলে রাখার প্রয়োজন নেই।
ছোটবেলায় মেয়েরা শিখে যায়, কোন কথায় বড়রা খুশি হন। কখন চুপ থাকতে হয়। কখন নিজের ইচ্ছা গোপন করতে হয়। বেশি কথা বললে সমস্যা, বেশি প্রশ্ন করলে জেদ, নিজের মতামত ধরে রাখলে স্বভাব খারাপ। আর অন্যের কথা মেনে নিলে—“মেয়েটা খুব বুঝদার।”
বিয়ের পর এই প্রত্যাশা আরও বাড়ে।
নতুন বাড়িতে মানিয়ে নিতে হবে। সম্পর্কগুলো বুঝতে হবে। স্বামীর মেজাজ বুঝতে হবে। শ্বশুর-শাশুড়ির পছন্দ-অপছন্দ মনে রাখতে হবে। সন্তান হলে তার দায়িত্বও প্রায় স্বাভাবিকভাবেই মায়ের কাঁধে এসে পড়ে।
সবাই ধরে নেয়, সে পারবে।
কেউ খুব একটা জানতে চায় না, সে পারছে কীভাবে।
এই জায়গাটাতেই নারীর জীবনের একটি বড় বৈপরীত্য তৈরি হয়। তার যত্ন নেওয়ার ক্ষমতাকে সবাই মূল্য দেয়, কিন্তু তার নিজের যত্নের প্রয়োজনটাকে খুব সহজে ভুলে যায়।
সে অন্যের ক্লান্তি বুঝবে। নিজের ক্লান্তির কথা বললে হয়তো শুনবে, “আর একটু কষ্ট করো।”
সে সবার মন খারাপ বুঝবে। নিজের মন খারাপের কথা বললে বলা হবে, “এত কিছু নিয়ে ভাবার কী আছে?”
সে অন্যের রাগ সামলাবে। নিজে রাগ করলে বলা হবে, “তুমি তো খুব বেশি প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছ।”
ধীরে ধীরে একজন নারী বুঝে যান, নিজের অনুভূতির জন্য এই সংসারে খুব বেশি জায়গা নেই।
তার কান্নার জন্য আলাদা কোনো ঘর নেই।
তাই সে রান্নাঘরে গিয়ে কাঁদে। বাথরুমের দরজা বন্ধ করে কাঁদে। রাতে সবাই ঘুমিয়ে গেলে চুপচাপ কাঁদে। তারপর সকালে উঠে আবার বলে, “আমি ঠিক আছি।”
কিন্তু এই গল্পের আরেকটি দিকও আছে, যেটা নিয়ে আমরা অস্বস্তি বোধ করি।
সবসময় পুরুষই যে নারীর ওপর চাপ তৈরি করেন, তা নয়। অনেক সময় একজন নারীও আরেকজন নারীর জীবনে সেই একই চাপ তৈরি করেন।
সব শাশুড়ি বউয়ের শত্রু নন। সব ননদও নয়। অসংখ্য নারী আছেন, যারা নতুন বউকে আপন করে নেন, অন্যায় হলে পাশে দাঁড়ান, তাকে পরিবারের একজন মানুষ হিসেবে জায়গা দেন।
কিন্তু অন্য ছবিটাও আছে।
একজন শাশুড়ি হয়তো একসময় ভোরে উঠে পুরো সংসারের কাজ করেছেন। নিজের ইচ্ছা বিসর্জন দিয়েছেন। অসুস্থ শরীর নিয়েও কাজ করেছেন। তখন কেউ তাঁকে জিজ্ঞেস করেনি, তাঁর কষ্ট হচ্ছে কি না।
বহু বছর পর সেই একই বাড়িতে নতুন একজন মেয়ে এলে তিনি হয়তো বলেন,
“আমরাও তো করেছি।”
কথাটা এখানেই শেষ নয়।
এর ভেতরে লুকিয়ে থাকে একটি পুরোনো হিসাব—আমি যেহেতু সহ্য করেছি, তোমাকেও করতে হবে।
কিন্তু আমি যে কষ্ট পেয়েছি, সেটাই কি পরের মানুষের জন্য নিয়ম হয়ে যাবে?
একজন নারী নিজের জীবনে যে কষ্ট পেয়েছেন, সেই কষ্টকে দুইভাবে ব্যবহার করতে পারেন। তিনি চাইলে বলতে পারেন, “আমি যে কষ্ট পেয়েছি, তুমি যেন সেটা না পাও।” আবার চাইলে বলতে পারেন, “আমি যখন সহ্য করেছি, তুমিও করবে।”
দুই সিদ্ধান্তের মধ্যে পার্থক্য খুব বড়।
প্রথমটি অতীত থেকে শিক্ষা নেয়। দ্বিতীয়টি অতীতকে আবার বাঁচিয়ে রাখে।
এখানেই আসে “মেয়েরাই মেয়েদের সবচেয়ে বড় শত্রু”—এই বহুল ব্যবহৃত কথাটি।
কথাটা পুরোপুরি সত্য নয়। আবার পুরোপুরি মিথ্যাও নয়।
কোনো মেয়েই আরেকজন মেয়ের শত্রু হয়ে জন্মায় না। পরিবার আর সমাজের পুরোনো নিয়ম কখনো কখনো মানুষকে সেই ভূমিকায় দাঁড় করিয়ে দেয়। কেউ সেই নিয়ম মেনে নেন, কেউ প্রশ্ন করেন, আবার কেউ নিজের পাওয়া সামান্য ক্ষমতাটুকু অন্যের ওপর প্রয়োগ করেন।
একজন নারী নিজের জীবনে যে অবহেলা সহ্য করেছেন, পরে যদি নিজের চেয়ে দুর্বল অবস্থানে থাকা আরেকজন নারীর ওপর একই আচরণ করেন, তাহলে তাঁর নিজের কষ্টকে অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু সেই কষ্ট অন্য কাউকে কষ্ট দেওয়ার অধিকারও দেয় না।
একজন মানুষ একসময় নির্যাতিত ছিলেন বলে পরে অন্য কাউকে নির্যাতন করার অধিকার পান না। বরং সেখানেই চাইলে তিনি পুরোনো চক্রটা থামিয়ে দিতে পারেন।
পরিবর্তন শুধু পুরুষের আচরণ বদলানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পরিবারে নারীদের নিজেদের ভূমিকাও নতুন করে ভাবতে হবে।
একজন মা মেয়েকে শুধু “সব সহ্য কর” বলবেন না। বলবেন, অন্যায় হলে কথা বলতে।
একজন শাশুড়ি বউকে নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী না ভেবে একজন মানুষ হিসেবে দেখবেন।
একজন ননদ মনে রাখবেন, ভাইয়ের স্ত্রী হওয়ার আগে মেয়েটি একজন স্বতন্ত্র মানুষ।
একজন স্বামী বুঝবেন, স্ত্রী সংসার করছে মানেই তার শ্রমের কোনো মূল্য নেই—এমন নয়।
আর একজন নারী যখন আরেকজন নারীর কষ্ট দেখবেন, তখন প্রথম প্রশ্নটা হতে পারে, “তুমি কী ভুল করেছ?” নয়; “তোমার কী হয়েছে?”
হয়তো পরিবর্তন সেখান থেকেই শুরু হয়।
নারীকে শক্ত হতে হবে—এটা সত্যি। জীবন সবসময় সহজ নয়। সংসারেও দায়িত্ব থাকবে, সম্পর্কেও ছাড় দিতে হবে।
কিন্তু শক্ত হওয়ার অর্থ যদি হয় সবসময় নিজের কষ্ট লুকিয়ে রাখা, তাহলে সেই শক্তির ভেতরে কোথাও একটা নিঃসঙ্গতা তৈরি হয়।
আর সেই নিঃসঙ্গ নারীকে আমরা দূর থেকে দেখে বলি,
“ও তো খুব শক্ত।”
হয়তো সে শক্ত নয়।
হয়তো সে শুধু অনেক দিন ধরে ভেঙে পড়ার সুযোগ পায়নি।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।