শহীদ হাদীর কবরের পাশে ফিরনাস
মোহাম্মাদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী | ডিসেম্বর ২৪, ২০২৫
হাদির কবরের পাশে বাবাকে খুঁজছে ফিরনাস—এই দৃশ্য কাঁদাবে আপনাকেও।
আমি আজ যে দৃশ্যটা দেখলাম, সেটা শুধু চোখে দেখার নয়—এটা বুকের ভেতর ঢুকে যাওয়ার মতো এক বাস্তবতা। শহীদ শরীফ ওসমান বিন হাদির কবরের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তার আট মাসের অবুঝ সন্তান ফিরনাসকে দেখে আমার মনে হলো, জীবন কখনো কখনো কতটা নির্মম হতে পারে।
শিশুটির চোখে কোনো ভয় নেই, কোনো অভিযোগ নেই—আছে শুধু এক অজানা খোঁজ। সে জানে না, তার মুখে যে “বাবা” শব্দটা আসার কথা ছিল, সেই ডাকটা আর কোনোদিন পূর্ণতা পাবে না।
হাদির স্ত্রীর কথা শুনতে শুনতে আমি নিজেকে আর সামলাতে পারছিলাম না। তিনি বলছিলেন—তিন মাসে হয়তো ত্রিশ মিনিটও তার স্বামী ছেলেটাকে কোলে নিতে পারেননি। দেশ, রাজপথ, মানুষের অধিকার—সবকিছু মিলিয়ে হাদি নিজের সংসারের সময়টুকুও দিতে পারেননি। কথাগুলো বলার সময় তার কণ্ঠে যে হাহাকার ছিল, সেটা ভাষায় ধরা যায় না।
একবার তিনি হাসতে হাসতে বলেছিলেন, মাঝে মাঝে মজা করে বাচ্চাটাকে ডেকে বলা হতো—“ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র তোমার সাথে দেখা করতে আসছে।” সেই হাসির আড়ালে যে কতটা ত্যাগ লুকিয়ে ছিল, আজ তা হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া যায়।
কোন এক টকশো চলা কালে এক জায়গায় এসে হাদী থেমে গেলেন। চোখ ভিজে কাঁপা কণ্ঠে বললেন—এই প্রথম মনে হয়েছিল, যদি আল্লাহ তাকে নিয়ে যান, তাহলে যেন কেউ তার বাচ্চাটার দিকে একটু খেয়াল রাখে।
এই কথাটা শুনে আমার মনে হলো, একজন মানুষ মৃত্যুকে কতটা কাছে থেকে অনুভব করলে এমন কথা বলতে পারে!
ফিরনাস আজও জানে না তার বাবার গল্প। সে জানে না, তার বাবা দেশের সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখতেন। জানে না, বাবার কাঁধে বন্দুক নয়—ছিল সাহস আর সত্যের ভার। আজ সে বাবার নিথর ছবির দিকে তাকিয়ে কেন হাসে?
এই প্রশ্নটার কোনো উত্তর আমার কাছে নেই। হয়তো সে বাবার মুখে নিজের অস্তিত্ব খুঁজে পায়। হয়তো সে বুঝতে পারে না মৃত্যু কী, কিন্তু বুঝে ফেলে ভালোবাসা কী।
হাদির বড় বোন কাঁদতে কাঁদতে বলছিলেন—ভাই চলে যাওয়ার পর থেকে ফিরনাস বদলে গেছে। ছবি দেখালে সে খিলখিল করে হাসে। এই দৃশ্যটা আমার মনে গভীর দাগ কেটে দিয়েছে। একটা শিশু কীভাবে অবচেতনে তার বাবার অনুপস্থিতি অনুভব করে, সেটা দেখার পর আর আগের মতো থাকা যায় না।
সম্প্রতি বনশ্রীতে হাদির ভাড়া বাসায় সরকারের দুজন উপদেষ্টা গিয়েছিলেন। তারা পরিবারটির খোঁজ নিয়েছেন, ছোট্ট ফিরনাসকে কোলে নিয়ে আদর করেছেন।
হাদি চেয়েছিলেন তার ছেলে বড় হয়ে সংগ্রামী হবে, সাহসী হবে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলবে। সেই স্বপ্ন থেকেই তিনি নাম রেখেছিলেন ‘ফিরনাস’—যার অর্থ বিপ্লবী, সাহসী। আজ নামটা শুনলেই বুকের ভেতর কেমন করে ওঠে।
কবরের পাশে সাধারণ মানুষের ভিড় দেখে আমি অবাক হয়েছি। উত্তরা থেকে আসা এক ভদ্রলোক বলছিলেন—হাদির সাথে তার কোনো রক্তের সম্পর্ক নেই, তবুও মৃত্যুর দিন রাতে ঘুমাতে পারেননি। জানাজায় যেতে পারেননি বলে আজ সন্তান নিয়ে ছুটে এসেছেন। সারারাত তিনি আর তার স্ত্রী হাদির ভিডিও দেখেছেন, আর চোখের পানি থামাতে পারেননি। এই মানুষগুলোই প্রমাণ করে—দেশপ্রেম কোনো পরিচয়ের অপেক্ষা করে না।
অনেকে বলছিলেন, হাদির মতো হওয়া সম্ভব না। কিন্তু তার রেখে যাওয়া বিদ্রোহের সুর, তার স্বাধীনতার চেতনা যেন নতুন প্রজন্মের প্রাণে থাকে। আজকের তরুণরা পরাধীনতা মানতে চায় না, মাথা উঁচু করে সত্য বলতে চায়—এই সাহসটাই ছিল হাদির সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার।
এখানে এসে বারবার একটা কথাই শুনেছি—বিচার চাই। শুধু দাফন করে দোয়া করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। যে মানুষটা সত্য নিয়ে দাঁড়িয়েছিল, তাকে যারা নির্মমভাবে হত্যা করেছে, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। খুনি কেন এখনো ধরা পড়েনি—এই প্রশ্নটা কেবল পরিবারের নয়, পুরো জাতির।
আমি সিরাজগঞ্জ থেকে আসা এক মানুষকে দেখেছি, আবার দেখেছি গাজীপুর, কেরানীগঞ্জ, নোয়াখালী—বাংলাদেশের প্রায় সব জেলা থেকেই মানুষ এসেছে। কবরের পাশে দাঁড়িয়ে সবাই কাঁদছে, দোয়া করছে। মনে হচ্ছিল, হাদি একজন মানুষ ছিলেন না—তিনি ছিলেন বাংলাদেশের এক অমূল্য সম্পদ।
আজ ফিরনাস এতিম, ঠিকই। কিন্তু সে একা নয়। এই দেশের কোটি মানুষের দোয়া, ভালোবাসা আর দায়িত্ব আজ তার সাথে। শহীদ শরীফ ওসমান বিন হাদির আত্মত্যাগ আর তার সন্তানের নীরব চাহনি ইতিহাসের পাতায় শুধু লেখা থাকবে না—এটা আমাদের বিবেককে প্রতিদিন প্রশ্ন করবে।
আমি এই লেখা শেষ করছি একটাই প্রত্যাশা নিয়ে—আমরা যেন ভুলে না যাই।
আমরা যেন বিচার চাইতে ভুলে না যাই।
আর যেন কোনো ফিরনাসকে আর এভাবে বাবার ছবি দেখে হাসতে না হয়।
#শহীদ_হাদি #ফিরনাস #দেশপ্রেম
#বিচার_চাই #বাংলাদেশ #শহীদের_রক্ত
#স্বাধীনতার_চেতনা #NeverForget
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।