অধোরাতে ঘুম ভাঙলে
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী। জানুয়ারি ০৯, ২০২৬
অধোরাতে ঘুম ভাঙলে—মনে পড়ে।
গায়ক তালাত মাহমুদের গানে ঠিক কী মনে পড়তো, তা আমার জানা নেই। তবে এই লাইনটি শুনলেই বুকের ভেতর কোথাও একটা দীর্ঘশ্বাস জমে ওঠে।
ছোটবেলায় অধোরাতে ঘুম ভেঙে গেলে আমার একটাই ভয় কাজ করত—সকাল হলে স্কুলে যেতে হবে। ইচ্ছে হতো, রাতটা যেন কোনোদিন শেষ না হয়। আজ ভাবি, সেই স্কুলজীবনকেই এখন কতটা মিস করি। সত্যিই জীবন বড় বিচিত্র; যেটা একদিন বোঝা মনে হয়, সময়ের আরেক প্রান্তে সেটাই হয়ে ওঠে সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত স্মৃতি।
অধোরাতে ঘুম ভাঙলে—সব মানুষের মনে কি এক জিনিসই ভেসে ওঠে? না। মানুষের বয়স, অভিজ্ঞতা, যন্ত্রণা আর স্বপ্ন অনুযায়ী স্মৃতির রং বদলে যায়।
একটি শিশুর হয়তো মনে পড়ে প্রবাসে থাকা বাবার মুখ।
বয়সের ভারে নুয়ে পড়া মানুষটির মনে ভেসে আসে মৃত্যুচিন্তা।
তরুণ লেখকের মনে সংশয়—তার লেখাটি ঠিকভাবে প্রকাশিত হবে তো? পাঠক কি গ্রহণ করবে?
বিনিয়োগকারীর মনে ভয়—শেয়ারবাজারে ধস নামবে না তো?
আর দেবদাসেরা আজও হয়তো পার্বতীর চিঠির অপেক্ষায় থাকে।
আমার এক খালাতো ভাই উচ্চশিক্ষার জন্য দেশের বাইরে থাকে। একদিন তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম,
—আচ্ছা, অধোরাতে ঘুম ভেঙে গেলে তোমার কী মনে পড়ে?
সে একটু চুপ করে থেকে বলেছিল,
—দেশের কথা খুব মনে পড়ে রে।
এই একটি বাক্যেই যেন প্রবাসজীবনের সব শূন্যতা ধরা পড়ে।
আমরা আসলে সারাক্ষণ ছুটে চলি আমাদের পছন্দের জিনিসগুলোর পেছনে, আর ভয়ংকর জিনিসগুলো নিঃশব্দে আমাদের তাড়া করে বেড়ায়। তবু মাঝেমধ্যে অধোরাতে ঘুম ভেঙে গেলে মনে পড়ে যায় এমন সব বাস্তবতা, যেগুলো আমরা ইচ্ছা করেই দিনের আলোয় ভুলে থাকতে চাই।
অধোরাতে ঘুম ভাঙলে আমার মনে পড়ে কাঁদছে আবরার ফাহাদের মা।
মনে পড়ে সীমান্তের ক্যাম্পগুলোতে মানবেতর জীবনযাপন করা প্রায় দশ লাখ রোহিঙ্গা মানুষের কথা। সদ্য জন্ম নেওয়া একটি শিশুর অপরাধ কী ছিল?
মনে পড়ে এক দশকের বেশি সময় ধরে কাঁদছে সিরিয়ানরা।
আর ফিলিস্তিন—সেই ভূমিতে যেন হৃদয়ের রক্তক্ষরণ থামছেই না।
অধোরাতে ঘুম ভাঙলে আমার মনে হয়—পৃথিবী ভালো নেই।
পৃথিবীর বড় অসুখ হয়েছে।
সবাই ব্যস্ত নিজের স্বার্থে।
আমরা আটকে পড়েছি ছয় ইঞ্চির মোবাইলের পর্দায়, অথচ চোখ ফিরিয়ে নিচ্ছি বাস্তবের যন্ত্রণা থেকে।
করোনা মহামারির সময় আমরা হারিয়েছি অনেক আপন মানুষকে। থমকে গিয়েছিল অর্থনীতির চাকা। অনেকে হারিয়েছেন চাকরি, সম্মান, আত্মবিশ্বাস।
তবু সেই দুর্যোগের মধ্যেও যারা পরিবারের মুখে দুবেলা ভাত তুলে দিতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজে বেরিয়ে পড়েছিলেন—তাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।
অধোরাতে ঘুম ভেঙে গেলে কখনো কখনো আমি যেন বাংলামায়ের হাহাকার শুনতে পাই।
অজ্ঞতা, মাদকাসক্তি, নৈতিক অবক্ষয়—প্রতিদিন আমাদের গ্রাস করে চলেছে।
মুক্তিযোদ্ধারা যে সোনার বাংলার স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই স্বপ্ন আমরা কতটা ধারণ করতে পেরেছি?
সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে আমাদের দায়বদ্ধতা কোথায়?
অধোরাতে ঘুম ভাঙলে মনে পড়ে—যে ভূখণ্ডের মাটিতে মাথা রেখে আমি ঘুমাই, সেই দেশটা এমনি এমনি আসেনি।
এই দেশ কিনতে হয়েছে রক্ত, ত্যাগ আর তিতিক্ষার বিনিময়ে।
শহীদের রক্তের ঋণ শোধ করতে হলে আমাদের সবাইকে এক হয়ে কাজ করতে হবে।
আজ এটিই হোক প্রতিটি বাঙালির অঙ্গীকার।
অধোরাতে ঘুম ভাঙলে মনে পড়ে অনাহারে থাকা সেই সব অসহায় শিশুদের কথা—যাদের দিন কাটে ফুটপাতে, আর রাত কোনোমতে কেটে যায় স্টেশনের এক কোণে। তখন সুকান্তের মতো আমিও বলতে চাই—
“এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাবো আমি।”
নিজের কর্মে উৎকর্ষ সাধন করে প্রতিটি দিন সাফল্যমণ্ডিত হোক। সুন্দর চিন্তার বিকাশ ঘটুক। দুশ্চিন্তার কালো ছায়া সরে গিয়ে পৃথিবী দেখুক নতুন দিনের আলো।
আর যদি সত্যিই অধোরাতে ঘুম ভেঙে যায়—তবে হতাশায় নয়, দুশ্চিন্তায় নয়;
হাসিমুখে, নিশ্চিন্তে আবার ঘুমিয়ে পড়ুক এই পৃথিবীর প্রতিটি মানবসন্তান।
এই আশাবাদ রেখেই লেখাটি শেষ করছি।
#অধোরাতে_ঘুম_ভাঙলে #বাংলা_প্রবন্ধ #মানুষের_কথা #সময়ের_কথা
#মানবতা #দেশ_ও_দায়িত্ব #আশাবাদ #বাংলা_লেখালেখি #ThoughtsAtMidnight
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।