বাংলা সাহিত্যের ক্ষতি করছে কি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা?
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী | ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
“এখন যদি একটি মেশিন কয়েক সেকেন্ডে একটি গল্প লিখে দিতে পারে, তাহলে একজন লেখকের এত বছর ধরে লিখে যাওয়ার প্রয়োজনটা কোথায়?”
প্রশ্নটা নতুন নয়।
কিন্তু বাংলা সাহিত্যের জন্য প্রশ্নটা দিন দিন আরও জরুরি হয়ে উঠছে।
কারণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন শুধু প্রযুক্তির বিষয় নয়। এটি লেখালেখির টেবিলেও ঢুকে পড়েছে।
একটি বিষয় দিলেন।
কয়েক মুহূর্ত অপেক্ষা করলেন।
গল্প তৈরি।
কবিতা তৈরি।
প্রবন্ধ তৈরি।
ভাষা সুন্দর করা যায়। বানান ঠিক করা যায়। একটি দুর্বল লেখাকেও অনেক সময় বেশ পরিপাটি দেখানো যায়।
তাহলে কি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বাংলা সাহিত্যের ক্ষতি করছে?
আমার উত্তর—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিজে যতটা বিপজ্জনক নয়, তার চেয়ে বেশি বিপজ্জনক এর ওপর লেখকের অতিরিক্ত নির্ভরতা।
কারণ সাহিত্য শুধু সুন্দর বাক্যের নাম নয়।
একজন মানুষ কেন লিখছেন—সেটাও সাহিত্যের অংশ।
একজন বাবা রাত জেগে মেয়ের পড়ার খরচের হিসাব করছেন।
একজন বৃদ্ধ জানালার পাশে বসে অপেক্ষা করছেন এমন একজনের জন্য, যে আর কোনোদিন আসবে না।
একজন মানুষ হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে জীবনের দিকে নতুন করে তাকাচ্ছেন।
এই অভিজ্ঞতাগুলো থেকে যখন একটি বাক্য বেরিয়ে আসে, তখন তার ভেতরে শুধু শব্দ থাকে না।
থাকে জীবন।
থাকে স্মৃতি।
থাকে ভয়।
থাকে অনুশোচনা।
থাকে এমন কিছু, যা লেখক নিজেও হয়তো পুরোপুরি ব্যাখ্যা করতে পারেন না।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সেই অভিজ্ঞতার ভাষা তৈরি করতে পারে।
কিন্তু অভিজ্ঞতাটা তার নিজের নয়।
এখানেই পার্থক্য।
একটি মেশিন হয়তো লিখতে পারে—
“বৃষ্টির রাতে তার মন খারাপ হয়ে গেল।”
কিন্তু একজন মানুষ লিখতে পারেন—
“বৃষ্টি শুরু হওয়ার পরও লোকটা বারান্দা থেকে কাপড় তুললেন না। যে শার্টটা ভিজছিল, সেটা ছিল তার মৃত ছেলের।”
দুটি বাক্যই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে তৈরি করা সম্ভব।
কিন্তু দ্বিতীয় বাক্যের পেছনে যদি সত্যিকারের জীবন থাকে, তখন তার ওজন অন্যরকম।
সাহিত্যের শক্তি শুধু বাক্যে নয়।
বাক্যের পেছনে থাকা জীবনে।
তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে পুরোপুরি বাতিল করে দেওয়াও ভুল হবে।
একজন লেখক বানান সংশোধনে এটি ব্যবহার করতে পারেন। একটি দীর্ঘ লেখার কাঠামো নিয়ে পরামর্শ নিতে পারেন। একটি বাক্যের বিকল্প খুঁজতে পারেন। তথ্য সাজাতে পারেন। নিজের লেখার দুর্বল জায়গা চিহ্নিত করার জন্য সাহায্য নিতে পারেন।
এসব ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা একজন সহকারী হতে পারে।
সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন লেখক নিজের হয়ে লেখার দায়িত্বটাই মেশিনের হাতে তুলে দেন।
তখন তিনি আর লেখক থাকেন না।
তিনি হয়ে যান মেশিনের তৈরি লেখার সম্পাদক।
আর সবচেয়ে বড় বিপদটা এখানেই।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সাধারণত লেখাকে মসৃণ করতে পারে।
কিন্তু সাহিত্য সবসময় মসৃণ হতে চায় না।
কখনো একটি বাক্য একটু কাঁচা থাকবে।
কখনো কোনো চরিত্র কথা শেষ করবে না।
কখনো একটি স্মৃতি ব্যাখ্যা ছাড়াই থেকে যাবে।
মানুষের লেখায় এই অসম্পূর্ণতাগুলোই অনেক সময় তাকে মানুষ করে।
অতিরিক্ত মসৃণ লেখা কখনো কখনো জীবনের খসখসে সত্যটাকেই মুছে দেয়।
আরেকটি বিপদ আরও গভীর।
যদি সবাই একই ধরনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে লেখে, তাহলে ধীরে ধীরে লেখার ভাষা কি একই রকম হয়ে যাবে না?
একই ধরনের শুরু।
একই ধরনের আবেগ।
একই ধরনের উপমা।
একই ধরনের প্রশ্ন।
একই ধরনের সমাপ্তি।
তখন সবচেয়ে বড় সংকট হবে লেখার সংখ্যা নয়।
লেখকের নিজস্ব কণ্ঠের সংকট।
ফেসবুকের যুগে আমরা দেখেছি—লাইক পাওয়ার জন্য লেখক নিজের ভাষা বদলে ফেলতে পারেন।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে আরেকটি বিপদ যোগ হলো—সহজে ভালো শোনানোর জন্য লেখক নিজের কণ্ঠটাই মেশিনের হাতে তুলে দিতে পারেন।
তাই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে ভয় পাওয়ার চেয়ে একজন লেখকের নিজের কাছে একটি প্রশ্ন রাখা বেশি জরুরি—
আমি কি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে ব্যবহার করছি, নাকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আমার হয়ে লিখছে?
টেবিলে একটা ল্যাপটপ খোলা।
স্ক্রিনে একটা সুন্দর প্যারাগ্রাফ।
বাক্যগুলো পরিপাটি। শব্দগুলো নিখুঁত।
কিন্তু কয়েক সেকেন্ড চুপ করে তাকিয়ে থাকার পর প্রশ্নটা হয়তো আরও কঠিন হয়ে আসে—
“এটা কি আমার?”
এই প্রশ্নের উত্তরই একজন লেখকের আসল পরীক্ষা।
আগামী দিনের বাংলা সাহিত্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা থাকবে।
এটাকে ঠেকিয়ে রাখা সম্ভব নয়।
প্রশ্ন হলো, তার সঙ্গে লেখকের সম্পর্কটা কেমন হবে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যদি লেখকের হাতে কলমের মতো থাকে, হয়তো তা নতুন সম্ভাবনা তৈরি করবে।
কিন্তু যদি কলমটাই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার হাতে চলে যায়, তাহলে বাংলা সাহিত্য হয়তো অনেক লেখা পাবে—
কিন্তু কম মানুষ পাবে।
কারণ শেষ পর্যন্ত সাহিত্য শুধু কে কত সুন্দর লিখতে পারে, তার প্রতিযোগিতা নয়।
সাহিত্য হলো—
কে নিজের সত্যটা নিজের কণ্ঠে বলতে পারে।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।