নিশির দিনগুলো গল্প-৬ : চাকরির দরজা মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন ১৫ জুলাই, ২০২৬ স্বামী হারানোর পর সে শুধু একজন বিধবা হয়ে থাকল না, হয়ে গেল একজন চাকরিপ্রার্থীও। অভিক চলে যাওয়ার পর প্রথম কয়েক মাস নিশি বুঝতেই পারেনি দিনগুলো কীভাবে কেটে যাচ্ছে। মানুষ আসছে, যাচ্ছে, সান্ত্বনা দিচ্ছে। তারপর একসময় সবাই নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে গেল। শুধু সংসারের খরচগুলো আগের মতোই রয়ে গেল। এক সন্ধ্যায় ডাইনিং টেবিলে বসে খাতা খুলে হিসাব করছিল নিশি। বাড়িভাড়া, বিদ্যুৎ বিল, মেঘের বিশ্ববিদ্যালয়ের ফি, মিশির কলেজের বেতন... হিসাব মেলাতে গিয়ে হঠাৎ থেমে গেল। টাকাটা আর মিলছে না। অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল। পরদিন সকালে আলমারির নিচে রাখা পুরোনো ফাইলটা বের করল। সার্টিফিকেটগুলো হাতে নিয়ে ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তে অভিকের কথা মনে পড়ল। একদিন অভিক হেসে বলেছিল, "তুমি চাকরি না করলেও চলবে। আমি তো আছি।" কথাটা তখন ভালোবাসা ছিল। আজ সেই কথাটাই বুকের ভেতর একটু ব্যথা হয়ে বাজল। নিশি ফাইলটা ব্যাগে ভরে নিল। ভাবল, এবার নিজের জন্য নয়, মেঘ আর মিশির জন্য তাকে বের হতেই হবে। প্রতিদিন কোথাও না কোথাও জীবনবৃত্তান্ত জমা দিত। কোথাও থেকে কোনো খবর আসত না। একদিন এক অফিসে সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে শুনল, "এত বছর কী করেছেন?" "সংসার সামলেছি।" সামনের ভদ্রলোক মাথা নেড়ে বললেন, "আমাদের তো অভিজ্ঞ লোক দরকার।" নিশি শুধু "আচ্ছা" বলে বেরিয়ে এল। আরেকটা অফিসে ঢুকতেই প্রথম প্রশ্ন ছিল, "আপনার স্বামী নেই?" "না।" "দুই মেয়ে আছে শুনলাম। অফিসের চাপ সামলাতে পারবেন তো?" নিশির ইচ্ছে করছিল বলে, "এত বছর একা হাতে সংসারের চাপ সামলেছি, অফিস কি তার চেয়েও কঠিন?" কিন্তু কিছু বলল না। চুপচাপ বেরিয়ে এল। এভাবেই দিন কাটছিল। সকালে বের হওয়া, দুপুরে এক কাপ চা আর একটা বিস্কুট খেয়ে থাকা, বিকেলে আবার আরেকটা অফিস। তারপর ক্লান্ত শরীরে বাড়ি ফেরা। দরজা খুলতেই মিশি জিজ্ঞেস করত, "মা, আজ কোনো খবর হলো?" নিশি হাসত, "এখনও না। হবে।" সেই হাসিটা যে কত কষ্টে হাসা, সেটা শুধু সে-ই জানত। একদিন বাড়ি ফিরে দেখল, টেবিলের ওপর একটা খাম রাখা। মিশি বলল, "এটা তোমার জন্য।" ভেতরে তিন হাজার টাকা। নিশি অবাক হয়ে তাকাল, "এত টাকা কোথায় পেলি?" মিশি লজ্জা পেয়ে বলল, "পাশের বাড়ির দুটো বাচ্চাকে পড়াই। প্রথম মাসের টাকা।" নিশির চোখ ভিজে উঠল। সে শুধু মেয়েকে জড়িয়ে ধরল। কিছু কথা থাকে, যেগুলো মুখে বলা যায় না। প্রায় চার মাস পর একটা ছোট প্রতিষ্ঠানে হিসাবরক্ষকের চাকরি হলো তার। বেতন খুব বেশি ছিল না। তবু নিয়োগপত্রটা হাতে নিয়ে সে অনেকক্ষণ বসে রইল। মনে হচ্ছিল, অনেক দিন পর কেউ যেন আবার তাকে বিশ্বাস করেছে। বাড়ি ফিরে দরজা খুলেই বলল, "মেঘ... মিশি... চাকরিটা হয়ে গেছে।" দুই মেয়ে দৌড়ে এসে মাকে জড়িয়ে ধরল। অনেক দিন পর সেই বাড়িতে আবার হাসির শব্দ উঠল। প্রথম বেতন পাওয়ার দিন ব্যাংক থেকে বেরিয়ে নিশি ফোনটা হাতে নিল। অভিকের নম্বরটা সে এখনও মুছে ফেলতে পারেনি। নম্বরটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে আস্তে করে বলল, "তুমি বলেছিলে, আমি পারব। এতদিন পরে তোমার কথাটাই সত্যি হলো।" তারপর ফোনটা ব্যাগে রেখে বাড়ির দিকে হাঁটা দিল। সেদিন তার মনে হয়েছিল, চাকরি শুধু বেতন দেয় না। কখনো কখনো একটা চাকরি মানুষকে আবার নিজের চোখে নিজের মূল্যটাও ফিরিয়ে দেয়। চলবে.........গল্প-৬ : ঈদের দিন (ঈদের আগের রাতে প্যাকেট দুটো বের করতেই মিশি অবাক হয়ে বলল, "তুমি তো বলেছিলে কিনবে না!" ")
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।