হারানো বইমেলা
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী | ১৩ মার্চ ২০২৬
স্টল #২৪৭। ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহ, ২০১৭। এক লেখক—নাম মনে নেই, মুখ মনে আছে—ছোট হাতের কাঁপুনি, চোখে অচেনা সততা। ছাত্রেরা চারপাশে ঘেরাও করেছে। আমি দূরে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম। চশমার ফ্রেম বারবার ঠিক করছিলেন। পাশের মাটিতে শুকনো পাতা ছড়িয়ে আছে। কেউ জিজ্ঞেস করল, "এই বইটা দেখেছেন?"
কোনো উত্তর নেই—শুধু নিঃশব্দ বোঝাপড়া।
ভাগ্নে একদিন বলেছিল—“মামা, বইমেলায় কেন যাব? অনলাইনে তো সব মিলছে।” আমি চুপ করে রইলাম। সে জানে না যে সেই সময়ে কী হারাচ্ছে। কেউ জানে না যতক্ষণ না নিজে নিজে অনুভব করে।
বইমেলা কেবল বিক্রির স্থান নয়। তা ছিল আকস্মিক বিস্ময়ের খোঁজ। ধীরে ধীরে চোখে পড়া, পৃষ্ঠার ঘর্ষণ, হঠাৎ হাসি, পাশের কারোর চশমা ঠিক করার ক্ষণিক। একবার এক ছেলে নতুন কবিতার বই হাতে দাঁড়িয়ে বলল, "বেশি ভালো না, তবে অনুভূতি আছে।" অনলাইন রিভিউ এই সূক্ষ্ম হতাশা ধরতে পারে না।
উপস্থিতি শেখায়। দাঁড়ানো মানে শুধু দেখা নয়। ধৈর্য ধরে খোঁজা। হঠাৎ কোনো বই হাতে নেওয়া। চোখ পৃষ্ঠায় আটকে থাকা। লেখকের সঙ্গে নীরব চোখের সংলাপ। একজন এসে জিজ্ঞেস করল, "আপনি কি লেখেন?"
আমি মাথা নাড়ালাম। শব্দ ছাড়াই বোঝা গেল—ক্ষুদ্র অভিব্যক্তি, কিন্তু গভীর। শহরের চাপে হারিয়ে যাওয়া অনুভূতি মেলার নীরবতায় ফিরে এসেছে।
নতুন প্রজন্ম দ্রুত চায়। পড়া দ্রুত। প্রতিক্রিয়া দ্রুত। দেখেছিলাম এক ছেলেকে—কয়েক সেকেন্ড পৃষ্ঠা উল্টাল, তারপর ফোন। রিভিউ চেক। চোখে আগ্রহের খোঁচা ম্লান। বই নিজেই কথা বলছে, যদি কেউ থামে। কিন্তু সে থেমে থাকল না। আমরা হারাচ্ছি সেই নিরব আনন্দ, যা স্ক্রিনে কখনো ফিরবে না।
বইমেলা সামাজিক ছিল। শুধু কেনা নয়—আড্ডা, গল্প, অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়া। পাশের স্টলে এক বৃদ্ধ বই সাজাচ্ছিলেন। চোখে ভাব, মুখে মৃদু হাসি—যেন বলছে, "আমার পালা শেষ।" পাশের মেয়ে হেসে বলল, "এত বই নিয়ে কী হবে?" বৃদ্ধ হেসে বলল না। এই সংলাপ, এই ক্ষুদ্র উদাসীনতা, অনলাইনে পাওয়া যায় না।
এক যুবক, নতুন গল্পের বই হাতে, তার আঙুলের খোঁচায় আবিষ্কার করল, প্রতিটি পৃষ্ঠায় শব্দের ওজন—যা শুধু চোখে পড়ে, মন স্পর্শ করে। এক নারী, ছোট্ট কবিতার খাতা হাতে, হঠাৎ হাসি—যেন ভুলে গিয়েছিলো সময়ের চাপ। এই ক্ষুদ্র ঘটনার জ্বলন, অনলাইন কোনো স্ক্রিনে ধরে রাখতে পারবে না।
ডিজিটাল সুবিধা স্বীকার করি—বই আসে দ্রুত, রিভিউ পড়া যায়, লেখককে চেনা যায়। কিন্তু আকস্মিক বিস্ময়? হঠাৎ আকর্ষণীয় পৃষ্ঠা? অচেনার সঙ্গে শুরু হওয়া সংলাপ যা শেষ হয় না? স্ক্রিন দেয় না। কাগজের ঘর্ষণ দেয় না। নরম স্পর্শ দেয় না। গন্ধ দেয় না।
স্টল #১০৩। এক বৃদ্ধ ধীরে ধীরে বই গুছাচ্ছেন। চোখে শান্তির ছাপ, মুখে দীর্ঘ অভিব্যক্তি। বললেন, "এইবার দীর্ঘকালীন অধ্যায় শেষ।" আলাদা আবহ, আলাদা শিক্ষা—এখন শুধু শেষ নয়, বরং দীর্ঘ সময় ধরে তৈরি সংযমের প্রতিফলন।
স্টল বন্ধ। মাটিতে শুকনো পাতা। কাগজের গন্ধ। বৃদ্ধের চোখে সেই নিরব অভিব্যক্তি। কিছু হারিয়েছে, কিন্তু বই এখনো কথা বলে—মনের গহীনে, নিঃশব্দ নদীর মতো, ধীরে ধীরে ভিড়ের ওপর বইয়ের প্রতিফলন ছড়াচ্ছে, যেন বইমেলা নিজেই শেষ হয়ে আরও জীবন্ত হয়েছে।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।