মুক্তির নাম ভালোবাসা
(প্রেম, স্বাধীনতা ও সম্পর্কের)
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণমূলক লেখা | মনস্তত্ত্ব
২৩ অক্টোবর ২০২৬
“অনন্ত মৈত্রী এক জ্বলন্ত সূর্য। তাকে আবদ্ধ করতে যেয়ো না, ধ্বংস হয়ে যাবে।”
কথাটার মধ্যে ভালোবাসার এক কঠিন সত্য লুকিয়ে আছে। আমরা অনেক সময় কাউকে ভালোবাসতে গিয়ে তাকে নিজের মতো করে গড়ে তুলতে চাই। সে কী করবে, কার সঙ্গে মিশবে, কীভাবে কথা বলবে—সবকিছুর মধ্যে নিজের পছন্দের ছাপ দেখতে চাই। অথচ যে মানুষটির স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্ব একদিন আমাদের আকৃষ্ট করেছিল, সম্পর্ক গভীর হওয়ার পর সেই স্বাতন্ত্র্যটুকুই মেনে নিতে কষ্ট হয়।
যে পাখির উড়ান দেখে মুগ্ধ হয়েছি, একসময় তাকেই খাঁচায় রাখতে চাই। ভুলে যাই, পাখির সৌন্দর্য শুধু তার পালকে নয়, ডানা মেলে উড়ে যাওয়ার স্বাধীনতাতেও।
মানুষের সম্পর্কেও এমনটা ঘটে। ভালোবাসার শুরুতে দুজন মানুষ একে অপরের ভিন্নতাকে উপভোগ করে। একজনের চিন্তা অন্যজনের চেয়ে আলাদা হতে পারে, পছন্দের জায়গা আলাদা হতে পারে, এমনকি জীবনের স্বপ্নও মিলতে নাও পারে। কিন্তু সম্পর্কের বয়স বাড়লে কেউ কেউ এই পার্থক্যগুলো মুছে দিতে চায়। তাদের ধারণা, সত্যিকারের ভালোবাসা মানেই সবকিছুতে একমত হওয়া, সব সময় কাছে থাকা, প্রতিটি সিদ্ধান্তে অনুমতি নেওয়া।
অথচ কাছাকাছি থাকা আর কাউকে বেঁধে রাখা এক কথা নয়।
ধরা যাক, একজন মানুষ অফিস শেষে পুরোনো কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে কিছুক্ষণ বসেছে। বাড়ি ফিরতে একটু দেরি হয়েছে। তার সঙ্গী হয়তো অপেক্ষা করছিলেন। ফোনে উত্তর পেতে দেরি হওয়ায় তাঁর মন খারাপ হলো। এটা স্বাভাবিক। প্রিয় মানুষটির জন্য অপেক্ষা করলে অভিমান হতেই পারে।
কিন্তু বাড়ি ফেরার পর কথাটা কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়, সেটাই আসল।
“দেরি হবে, একবার জানাতে পারতে”—এ কথা বলার বদলে যদি শুরু হয়, “তোমার বন্ধুদেরই যখন এত দরকার, আমার সঙ্গে সম্পর্ক রেখেছ কেন?” তাহলে একটি সাধারণ অভিমান অন্য দিকে মোড় নেয়। পরেরবার সেই মানুষটি বন্ধুদের সঙ্গে বসার আগে দুবার ভাববে। তারপর হয়তো যাওয়ার ইচ্ছাটাই চেপে রাখবে, শুধু বাড়ি ফিরে আরেকটা ঝগড়া এড়ানোর জন্য।
এভাবে একদিনে কোনো সম্পর্ক বদলে যায় না। ছোট ছোট ঘটনার ভেতর দিয়ে বদলায়। একজন নিজের পছন্দ ছেড়ে দেয়, অন্যজন সেটাকে ভালোবাসার প্রমাণ মনে করে। যে মানুষটি আগে স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজের কথা বলত, সে-ই একসময় কথা বলার আগে হিসাব করতে শেখে।
কেউ কি ইচ্ছা করে এমন করে? সব সময় নয়। কখনো এর পেছনে থাকে হারানোর ভয়, পুরোনো সম্পর্কের তিক্ত অভিজ্ঞতা কিংবা নিজের প্রতি অনিশ্চয়তা। কেউ একবার প্রতারিত হয়েছে বলে নতুন সম্পর্কেও সন্দেহ খুঁজতে থাকে। কেউ অবহেলিত হওয়ার ভয়ে বারবার আশ্বাস চায়। কিন্তু নিজের ভয় সামলাতে গিয়ে অন্যের স্বাধীনতা কেড়ে নিলে সেই ভয় কমে না; বরং সম্পর্কের মধ্যে নতুন দূরত্ব তৈরি হয়।
যে মানুষটিকে হারানোর ভয়ে আঁকড়ে ধরি, আমাদের আচরণেই কখনো কখনো সে দূরে সরে যেতে শুরু করে।
তবে স্বাধীনতার অর্থও এই নয় যে সম্পর্কের কোনো দায় থাকবে না। কেউ প্রতারণা করে, অসম্মান করে কিংবা নিজের ইচ্ছামতো চলার অজুহাতে অন্যের অনুভূতিকে বারবার আঘাত করে গেলে সেটাকে ব্যক্তিস্বাধীনতা বলা যায় না। সুস্থ সম্পর্কের জন্য যেমন নিজের জায়গা দরকার, তেমনি অন্যের অনুভূতির প্রতিও দায়বদ্ধতা থাকা জরুরি।
ভালোবাসা কাউকে বন্দি করে রাখা নয়, আবার দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার নামও নয়। বরং এমন একটি সম্পর্ক, যেখানে দুজন মানুষ কাছাকাছি থেকেও নিজেদের স্বতন্ত্র পরিচয় ধরে রাখতে পারে।
একজন নিজের স্বপ্নের পেছনে সময় দিলে অন্যজন তাকে অপরাধবোধে ভোগাবে না। কেউ কিছুক্ষণ একা থাকতে চাইলে তাকে ভালোবাসার ঘাটতি বলে ধরে নেবে না। মতের অমিল হলে সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার ভয় দেখানোর বদলে কথা বলার চেষ্টা করবে।
এমন সম্পর্ক গড়ে তোলা সহজ নয়। ভালোবাসার সঙ্গে প্রত্যাশা জড়িয়ে থাকে, আর প্রত্যাশা পূরণ না হলে অভিমান জন্মায়। তবু নিজের চাওয়া আর অন্যের অধিকারের মধ্যে সীমারেখা টানতে শিখতে হয়।
জ্বলন্ত সূর্যকে মুঠোয় ধরতে গেলে তার আলো পাওয়া যায় না, বরং নিজের হাতই পুড়ে যায়। মানুষকেও নিজের ইচ্ছার মধ্যে আটকে রাখতে গেলে একসময় তার স্বাভাবিক হাসি, স্বতঃস্ফূর্ততা আর মনের উষ্ণতা হারিয়ে যেতে পারে। বাইরে থেকে সে পাশে থাকে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে দূরে সরে যায়।
অনন্ত মৈত্রী মানে কখনো বিচ্ছেদ হবে না, এমন নিশ্চয়তা নয়। বরং মতের অমিল, অভিমান ও ব্যক্তিগত সীমাবদ্ধতার মধ্যেও পরস্পরের প্রতি সম্মান ধরে রাখার চেষ্টা।
কাউকে ভালোবাসলে তার পাশে দাঁড়াও, তার স্বপ্নকে গুরুত্ব দাও, তার সঙ্গে সময় কাটাও। কিন্তু তার সমস্ত পৃথিবীটাকে নিজের চারপাশে ঘুরতে বাধ্য কোরো না।
কারণ ভালোবাসা তখনই সুন্দর, যখন সেখানে দুজনেরই নিঃশ্বাস নেওয়ার জায়গা থাকে।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।