ঢাকের তালে ঢাকার স্মৃতি
(ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি)
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণমূলক লেখা
২৫ অক্টোবর ২০২৬
দুর্গাপূজায় ধুনুচি হাতে নাচছেন একজন মুসলমান। পাশে দাঁড়িয়ে তাঁর হিন্দু বন্ধু হাততালি দিচ্ছেন। পূজার আয়োজনে যোগ দেওয়া সেই মানুষটিই আবার শবে বরাতে বন্ধুদের সঙ্গে আতশবাজি বানাচ্ছেন, খাচ্ছেন হালুয়া-রুটি। ধর্ম আলাদা, কিন্তু আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো দেয়াল নেই।
পুরান ঢাকার প্রবীণ বাসিন্দা তারকনাথ ঘোষের স্মৃতিতে এমনই এক সময়ের ছবি পাওয়া যায়। ২০২৫ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর ‘দ্য ডেইলি স্টার’ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘দুর্গাপূজা ও ঢাকার যৌথ অতীত’ শীর্ষক প্রতিবেদনে তাঁর স্মৃতিচারণ উঠে এসেছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, একসময় দুর্গাপূজায় তাঁর মুসলমান বন্ধুরা ধুনুচি নাচে অংশ নিতেন, ঢাক-ঢোলের আয়োজনে যোগ দিতেন। অন্যদিকে শবে বরাতে তিনিও বন্ধুদের সঙ্গে হাতে তৈরি আতশবাজি বানানো ও হালুয়া-রুটি খাওয়ার আনন্দে শামিল হতেন।
এই স্মৃতি শুধু পুরোনো ঢাকার হারিয়ে যাওয়া দিনের গল্প নয়। এটি একটি প্রশ্নও সামনে আনে—দুর্গাপূজার ইতিহাসে মুসলমানদের অবদান কতটা, আর সেই ইতিহাসের কতটুকু আমরা জানি?
ইতিহাসের পথে
বাংলায় দুর্গাপূজার ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করতে গেলে ধর্মীয় ঐতিহ্য, জমিদারদের পৃষ্ঠপোষকতা এবং সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ—এই তিনটি দিক সামনে আসে।
অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতকে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে বড় আকারের দুর্গাপূজার আয়োজন পরিচিতি পায়। বিত্তশালী পরিবার ও জমিদারদের পৃষ্ঠপোষকতায় পূজা ক্রমে জাঁকজমকপূর্ণ হয়ে ওঠে। পরে বিভিন্ন অঞ্চলে সর্বজনীন পূজার বিস্তারের সঙ্গে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণও বাড়ে।
২০২৫ সালের ১ অক্টোবর ‘দ্য ডেইলি স্টার’-এ প্রকাশিত ‘ঢাকায় দুর্গাপূজা: সময়ের পথ ধরে’ শীর্ষক প্রতিবেদনে ঢাকার পূজার বিবর্তন, জমিদারি ব্যবস্থার অবসান এবং জনসাধারণের অনুদানে আয়োজিত পূজার প্রসঙ্গ উঠে এসেছে।
এই ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, বড় আয়োজনের পৃষ্ঠপোষকদের নাম ইতিহাসে সহজেই জায়গা পায়। কিন্তু সেই আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত সাধারণ কারিগর, শ্রমজীবী মানুষ ও প্রতিবেশীদের কথা তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত হয়।
মুসলমানদের অবদান খুঁজতে গেলে তাই শুধু পূজার সূচনা বা পৃষ্ঠপোষকতার ইতিহাস দেখলে চলবে না। দেখতে হবে, বাংলার সামাজিক জীবন, শিল্প ও লোকসংস্কৃতিতে তাঁদের অংশগ্রহণ কোথায় ছিল।
নজরুলের কলমে দেবী
বাংলার সাংস্কৃতিক ইতিহাসে মুসলমানদের অবদানের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত কাজী নজরুল ইসলাম। তিনি মুসলমান কবি। তাঁর সাহিত্য ও সংগীতে ইসলামি ঐতিহ্যের শক্তিশালী উপস্থিতি রয়েছে। একই সঙ্গে দেবী কালীর বন্দনায় রচিত তাঁর শ্যামাসংগীত বাংলা সংগীতের উল্লেখযোগ্য সম্পদ।
‘আমার কালো মেয়ের পায়ের তলায়’ তাঁর পরিচিত শ্যামাসংগীতগুলোর একটি। এই গানে দেবী কালীর প্রতি ভক্তি ও নিবেদনের প্রকাশ ঘটেছে। নজরুলের এই সৃষ্টিকে দুর্গাপূজার প্রত্যক্ষ অবদান বলা ঠিক হবে না, কারণ শ্যামাসংগীত মূলত দেবী কালীর বন্দনাকেন্দ্রিক। তবে এটি বাংলার ধর্মীয় সংগীতের ইতিহাসে মুসলমান শিল্পীর সৃজনশীল অংশগ্রহণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
২০১৮ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস থেকে প্রকাশিত ‘হিন্দুধর্মের ইতিহাস: দেবী’ গ্রন্থে গবেষক র্যাচেল ফেল ম্যাকডারমটের একটি অধ্যায়ে নজরুলের কালী-বিষয়ক কবিতা ও শ্যামাসংগীত নিয়ে আলোচনা রয়েছে।
নজরুলের অবদান বুঝতে হলে তাঁকে কোনো একটি পরিচয়ের মধ্যে আটকে রাখা যায় না। তাঁর ইসলামি গান যেমন আমাদের সাংস্কৃতিক সম্পদ, তেমনি তাঁর শ্যামাসংগীতও বাংলা সংগীতের ইতিহাসে স্বতন্ত্র স্থান অধিকার করে আছে।
একজন কবির শিল্পীসত্তা কখনো কখনো তাঁর নিজের ধর্মীয় পরিচয়ের সীমানা ছাড়িয়ে বৃহত্তর মানুষের অনুভূতিকে স্পর্শ করে। নজরুলের শ্যামাসংগীত তারই একটি দৃষ্টান্ত।
মণ্ডপের আড়ালের মানুষ
একটি দুর্গাপূজার মণ্ডপে দেবীর প্রতিমা সবার চোখে পড়ে। কিন্তু প্রতিমার পেছনে থাকে মৃৎশিল্পীর শ্রম, মণ্ডপের কাঠামো, রং, সাজসজ্জা, আলোর ব্যবস্থা এবং অসংখ্য মানুষের কাজ।
ঢাকার দুর্গাপূজার ইতিহাসবিষয়ক প্রতিবেদনটিতে প্রতিমা নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত স্থানীয় কুমোরদের দীর্ঘ ঐতিহ্যের কথা বলা হয়েছে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তাঁরা মাটি, খড় ও বাঁশ দিয়ে প্রতিমা নির্মাণ করে আসছেন।
এই পেশার ইতিহাসে মুসলমান কারিগরদের অংশগ্রহণ কতটা ছিল, তা নির্দিষ্টভাবে জানার জন্য আরও অনুসন্ধান দরকার। একই কথা প্রযোজ্য ঢাকি, মণ্ডপ নির্মাণের শ্রমিক, সাজসজ্জার কারিগর ও অন্যান্য পেশাজীবীর ক্ষেত্রেও।
তবে ধর্মীয় উৎসবের আয়োজন শুধু উপাসকদের কাজের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে নানা পেশার মানুষের শ্রম ও জীবিকা। সেই শ্রমের ইতিহাস সংরক্ষণ করা গেলে উৎসবের সামাজিক ইতিহাসও আরও পূর্ণতা পাবে।
পুরান ঢাকার যে শিক্ষা
তারকনাথ ঘোষের স্মৃতিচারণের তাৎপর্য হলো, সেখানে দুই সম্প্রদায়ের মানুষ শুধু একে অন্যের উৎসব দেখতেন না; বরং বিভিন্ন আয়োজনে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতেন। তাঁর মুসলমান বন্ধুরা দুর্গাপূজায় ধুনুচি নাচতেন, আর তিনি শবে বরাতের আয়োজনে বন্ধুদের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নিতেন।
এই স্মৃতিতে কোনো ধর্মীয় পরিচয় বিলীন হয়ে যায়নি। মুসলমান বন্ধুরা হিন্দু হয়ে যাননি, তারকনাথ ঘোষও মুসলমান হননি। তাঁরা নিজেদের পরিচয় বজায় রেখেই একে অন্যের সামাজিক জীবনের অংশ হয়েছিলেন।
এমন সম্পর্ককে শুধু উৎসবের কয়েকটি দিনের সৌজন্য বলে দেখলে ভুল হবে। প্রতিবেশীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা, বন্ধুত্ব এবং একে অন্যের আনন্দে যোগ দেওয়ার মধ্য দিয়েই একটি এলাকার সামাজিক জীবন গড়ে ওঠে।
পুরান ঢাকার এই অভিজ্ঞতা সমগ্র বাংলার ইতিহাসের একমাত্র চিত্র নয়। সাম্প্রদায়িক সংঘাত ও অবিশ্বাসের ঘটনাও ঘটেছে। কিন্তু সংঘাতের স্মৃতি সংরক্ষণ করতে গিয়ে সহযোগিতার স্মৃতিকে বাদ দিলে ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হারিয়ে যায়।
অবদানের প্রকৃত অর্থ
দুর্গাপূজার ধর্মীয় ঐতিহ্য হিন্দু সমাজের নিজস্ব উত্তরাধিকার। সেই ঐতিহ্যের প্রতি সম্মান রেখেই বাংলার মুসলমানদের সাংস্কৃতিক ও সামাজিক অবদান নিয়ে আলোচনা করা যায়।
কাজী নজরুল ইসলামের শ্যামাসংগীত তার একটি শিল্পসৃষ্টির উদাহরণ। পুরান ঢাকার মানুষের স্মৃতিচারণ পারস্পরিক অংশগ্রহণের একটি দৃষ্টান্ত। আর উৎসব ঘিরে বিভিন্ন পেশার মানুষের কাজের ইতিহাস আরও অনুসন্ধানের অপেক্ষায় রয়েছে।
দুর্গাপূজায় মুসলমানদের অবদান কত শতাংশ—এমন প্রশ্নের নির্ভরযোগ্য উত্তর দেওয়ার মতো সামগ্রিক পরিসংখ্যান আমাদের হাতে নেই। তবে সাংস্কৃতিক সৃষ্টি ও সামাজিক অংশগ্রহণের নির্দিষ্ট উদাহরণগুলো দেখায়, বাংলার বৃহত্তর ইতিহাসে মুসলমানদের উপস্থিতি উপেক্ষা করার মতো নয়।
ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করতে সব সম্প্রদায়ের অবদানকে স্বীকৃতি দিতে হয়। তার জন্য কারও ধর্মীয় পরিচয় বদলে দেওয়ার প্রয়োজন নেই, আবার অন্যের অবদান মুছে দেওয়ারও কোনো যুক্তি নেই।
দুর্গাপূজার প্রতিমা কার হাতে গড়া, ঢাকের তালে কারা নেচেছে, আর উৎসব শেষে কারা কার বাড়িতে ফিরে গেছে—এসব ছোট ছোট স্মৃতির মধ্যেও বাংলার ইতিহাসের বড় একটি অংশ লুকিয়ে আছে।
সময়ের সঙ্গে অনেক আয়োজন বদলে যায়, অনেক সম্পর্কও হারিয়ে যায়। কিন্তু পুরান ঢাকার মানুষের স্মৃতি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ভিন্ন ধর্মের মানুষও একে অন্যের জীবনের আপন অংশ হয়ে উঠতে পারেন।
বাংলার ইতিহাসের সেই অধ্যায়গুলো খুঁজে বের করা এবং যথাযথ প্রমাণের ভিত্তিতে সংরক্ষণ করা—ইতিহাসেরই এক নীরব দাবি।
সূত্র ও পাঠ-সহায়িকা
১. ‘দুর্গাপূজা ও ঢাকার যৌথ অতীত’, ‘দ্য ডেইলি স্টার’, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫।
২. রিদওয়ান আকরাম, ‘ঢাকায় দুর্গাপূজা: সময়ের পথ ধরে’, ‘দ্য ডেইলি স্টার’, ১ অক্টোবর ২০২৫।
৩. র্যাচেল ফেল ম্যাকডারমট, ‘একজন মুসলমান কবি, হিন্দু মা দেবী কালী এবং কাজী নজরুল ইসলাম’, ‘হিন্দুধর্মের ইতিহাস: দেবী’, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস, ২০১৮, পৃষ্ঠা ২৮১–৩০৩।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।