বাবাকে নিয়ে লেখা মানেই ভূমিহীন আবেগ
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
অনুলিখন। জানুয়ারি ০৩,২০২৬
বাবাকে নিয়ে কোনো লেখার আসলে ভূমিকা লাগে না। সে লেখা হোক কবিতায়, গদ্যে কিংবা নিঃশব্দ দীর্ঘশ্বাসে—বাবা এমন এক অনুভব, যার শুরু নেই, শেষও নেই।
তবুও ইচ্ছে করলে লেখা যেত বাবার ভূমিকা।
এই লেখার শুরুতেই লেখা যেত—
“এই সব শব্দ সেই মানুষটিকে উৎসর্গ,
যার কাঁধে ভর করেই আমার দাঁড়ানো শেখা।”
কিন্তু বাবা কি কখনো শব্দে ধরা দেন?
হয়তো এই লেখাটি পড়বেন কয়েকজন মাত্র পাঠক-পাঠিকা।
তাদের মধ্যেও কেউ একজন গভীর মনোযোগ নিয়ে পড়বেন,
আর অজান্তেই বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে উঠবে।
কারণ তারা শুধু লেখা পড়বেন না—তারা তাদের নিজের বাবাকে খুঁজে নেবেন প্রতিটি লাইনে।
আমার লেখা যদি তাদের ভালো লাগে, আমার সৃষ্টি যদি তাদের হৃদয়ে নাড়া দেয়, তবে বুঝি—আমার জীবনের টুকরো টুকরো গল্প কারো না কারো জীবনের সঙ্গে কোথাও মিলে গেছে।
বাবার স্নেহ নিয়ে যত কথা বলা যায়, সবই অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
বাবা রোদে পুড়েছেন, বৃষ্টিতে ভিজেছেন,
জীবনের সমস্ত ক্লান্তি গায়ে মেখেও আমার মুখের দিকে তাকিয়ে হেসেছেন।
সেই স্নেহ আর আদরের নাগাল আমার সারাজীবনের সাধনাতেও পৌঁছানো সম্ভব নয়।
এই লেখা লিখতে লিখতে আমার বুক ভারী হয়,
আর আমি জানি— পড়তে পড়তেও অন্তত একজনের চোখ ভিজবে।
এই লেখাটা তাই আমার জন্য নয়।
এই লেখা সেই বাবার জন্য, যিনি বটবৃক্ষের মতো দাঁড়িয়ে ছিলেন জীবনের সমস্ত ঝড়ের সামনে।
জীবনে যত কষ্টের বর্ষাই নেমে আসুক,আমি ডুবে যাইনি—কারণ বাবার ছায়া ছিল মাথার ওপর।
আজ আর দেখা হবে না বাবা।
সন্ধ্যার বিষণ্ন বাতাসে তোমার স্মৃতি এসে মনখারাপ ছড়িয়ে দেবে।
গোধূলিবেলায় ঘরে ফেরার আয়োজন আর মুখর হবে না আমাদের ছোট্ট শান্তির নীড়ে।
তোমার সেই আকাশি রঙের শার্টটা গায়ে জড়িয়ে
আর কোনোদিন তোমার সঙ্গে দেখা হবে না।
বাবাকে নিয়ে লেখা প্রতিটি শব্দ আমি পাঠকের কথা ভেবে লিখেছি কি না— তা আমি জানি না।
কারণ নিজের অনুভূতির বাইরে গিয়ে অন্যের পছন্দের হিসাব মেলালে লেখা কি আদৌ লেখা হয়ে ওঠে?
তবুও আমি লিখি।
কারণ—“বাবা, তোমায় ভালোবাসি”—এই সামান্য বাক্যটা না বলতে পারার যন্ত্রণা আমাকে আজীবন বয়ে বেড়াতে হবে।
কোনোদিন আর দেখা হবে না আমাদের।
আবার কখনো ভাবি,“বাবা, তুমি নেই—
আমি এখন দহনের দিন গুনি।
জানি না কোন মাস্তুলে এবার আমার জীবনের সাম্পান ঘুরবে।”
সব লেখাতে বাবাকে হুবহু তুলে আনা যায় না।
সম্ভবও নয়। কারণ আমার বাবার গল্প যেমন আমার, তেমনি প্রতিটি পাঠকেরও নিজের একটি বাবা আছেন— নিজস্ব স্মৃতি, নিজস্ব ক্ষত, নিজস্ব ভালোবাসা নিয়ে।
তাই একেকজন একেকভাবে মানে খুঁজে নেবেন
এই লেখার লাইনগুলোতে—
“বাবা, তুমি তো জানো না, তোমাকে ভেবে জেগে থাকতে থাকতে আমি একদিন ছায়া হয়ে গেছি।”
এই পৃথিবীতে বাবা আর ফিরবেন না।
কিন্তু তিনি ভেসে থাকবেন মনের গহীনে— আমার জীবনের একমাত্র সত্য হয়ে।
একান্ত নিঃশব্দ মুহূর্তে বাবা বারবার ফিরে আসেন
আমার চিন্তা-চেতনায়।
সেই সময়টা সমস্ত কোলাহল ছাপিয়ে
শুধু বাবা আর আমি— একটি স্মৃতিময়, কালজয়ী মুহূর্ত হয়ে থাকি।
এই স্মৃতি নিয়েই আমি আজীবন লিখে যাবো।
শুধু বাবার কথা।
আমি বুঝেছি—হৃদয়ের কোন কুঠুরিতে মৃত্যু থাকে,
আর কোন কুঠুরিতে প্রেম।
দুটোর মাঝখানে দেয়ালটা খুব শক্ত।
আমি মানুষ। রক্ত-মাংসের মানুষ।
দুর্বলতা আছে, ঈর্ষা আছে, ভুল আছে।
তবুও বাবা চলে গেলেও তার স্মৃতি রয়ে যায়।
দৃশ্যমান নয়— কিন্তু গভীরভাবে অনুভবযোগ্য।
এক বিস্তৃত বটবৃক্ষের মতো সেই স্মৃতিকে আমি নিজের ভেতর আগলে রেখেছি।
সব ঝড়ের পরে, সব অনাচারের পরেও ভালোবাসে যারা, তাদের হতে হয় উদার।
সবশেষে শুধু এটুকুই লেখা যায়—
পাপাচারে পৃথিবী ভরে গেলেও, আমি প্রার্থনায় কেবল একটাই কথা বলি—“হে সৃষ্টিকর্তা, আমার বাবাকে ভালো রেখো।”
কারণ বাবা ভালো না থাকলে,আমার খুব খারাপ লাগে।
#বাবাকে_নিয়ে #বাবার_স্মৃতি
#নিঃশব্দ_ভালোবাসা #মানবিক_লেখা #বাংলা_গদ্য
#FatherMemory
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।