সন্তানের শত্রু কে?
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
প্রবন্ধ | ৩১ অক্টোবর ২০২৬
আট বছরের ছেলেটি বাবার ফোনের দিকে তাকিয়ে আছে। পর্দায় বাবার নাম ভেসে উঠেছে। ফোনটা ধরার জন্য হাত এগিয়েও থেমে যায়। পাশে বসে থাকা মা কিছুক্ষণ আগে বলেছিলেন, “তোমার বাবা এখন তোমার খোঁজ নিচ্ছে কেন, বুঝি না।” কথাটা হয়তো মায়ের নিজের কষ্ট থেকেই বলা। কিন্তু শিশুটির মনে প্রশ্ন জেগেছে, বাবার ফোন ধরলে মা কষ্ট পাবেন না তো?
বিচ্ছেদের পর অনেক শিশুকে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়, যেখানে মা-বাবার বিরোধের ভার এসে পড়ে তার ওপর। যাঁদের দুজনের কাছ থেকেই ভালোবাসা পাওয়ার কথা, তাঁদের একজনকে ভালোবাসলে অন্যজন কষ্ট পাবেন কি না, সেই হিসাবও তাকে করতে হয়।
কখনো মা, কখনো বাবা নিজের ক্ষোভ, অভিমান কিংবা প্রতিশোধের জায়গা থেকে সন্তানকে অন্য অভিভাবকের বিরুদ্ধে প্রভাবিত করেন। সন্তানের সামনে অন্যজনকে অপমান করা, তাঁর সঙ্গে যোগাযোগে বাধা দেওয়া, তাঁর দায়িত্ব বা ভালোবাসা নিয়ে সন্দেহ তৈরি করা কিংবা শিশুকে দিয়ে নিজের পক্ষের কথা বলানো, এসব আচরণ ধীরে ধীরে সম্পর্ক নষ্ট করতে পারে।
তবে এখানে একটি পার্থক্য বোঝা জরুরি। কোনো অভিভাবক সন্তানের নিরাপত্তার কারণে অন্যজনের সঙ্গে যোগাযোগ সীমিত করলে সেটিকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা বলা যায় না। নির্যাতন, অবহেলা কিংবা ভয় দেখানোর ঘটনা থাকলে শিশুকে নিরাপদ রাখা অবশ্যই প্রয়োজন। সমস্যা তৈরি হয় তখন, যখন সন্তানের কল্যাণের বদলে তাকে ব্যক্তিগত বিরোধ মেটানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
মনোবিজ্ঞানে এ ধরনের পরিস্থিতির সঙ্গে যুক্ত একটি ধারণা হলো ‘আনুগত্যের দ্বন্দ্ব’। শিশুটি তখন মা-বাবার মধ্যে কাউকে বেছে নিতে বাধ্য বোধ করে। মাকে ভালোবাসলে বাবার প্রতি অপরাধবোধ, বাবার সঙ্গে সময় কাটালে মায়ের মন খারাপ হবে কি না, এমন চিন্তা তার স্বাভাবিক আনন্দকেও সংকুচিত করে ফেলে।
ধরা যাক, একটি মেয়ে বাবার কাছ থেকে নতুন জামা পেয়েছে। বাড়ি ফিরে আনন্দের সঙ্গে মাকে জামাটি দেখাল। মা নিজের অভিমান সামলাতে না পেরে বললেন, “এত ভালো বাবা হলে আমাদের ছেড়ে গেল কেন?”
মায়ের কথার পেছনে হয়তো দীর্ঘদিনের কষ্ট আছে। কিন্তু মেয়েটির কাছে বিষয়টি এত সরল নয়। সে বাবার কাছ থেকে পাওয়া জামাটিও ভালোবাসে, আবার মাকেও কষ্ট দিতে চায় না। পরেরবার বাবা কিছু দিলে সে হয়তো আর মাকে দেখাবে না। আনন্দের একটি ছোট ঘটনা তার কাছে গোপন রাখার বিষয় হয়ে দাঁড়াবে।
এভাবেই শিশুর আচরণ বদলাতে পারে। সে ফোন ধরতে চায় না, বাবার কথা উঠলে প্রসঙ্গ পাল্টায়। বাইরে থেকে মনে হতে পারে, সে নিজেই একজনকে অপছন্দ করছে। কিন্তু তার এই আচরণের পেছনে কতটা নিজের অভিজ্ঞতা, আর কতটা পারিবারিক চাপ, তা বোঝা সব সময় সহজ নয়।
তাই শিশুর মুখের কথা শুনেই সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়, আবার তার অনুভূতিকে অস্বীকার করাও অন্যায়। সে কোনো অভিভাবকের কাছে যেতে না চাইলে তার কারণ মন দিয়ে শুনতে হবে। ভয়, খারাপ অভিজ্ঞতা কিংবা অন্যজনের সম্পর্কে বারবার শোনা কথা, কোনটি তার আচরণকে প্রভাবিত করছে, তা বুঝতে নিরপেক্ষ মূল্যায়ন প্রয়োজন।
বাংলাদেশের আইনেও সন্তানের কল্যাণ অভিভাবকত্বসংক্রান্ত সিদ্ধান্তের গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা। অভিভাবক ও প্রতিপাল্য আইন, ১৮৯০ অনুযায়ী, আদালত শিশুর কল্যাণ বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। শিশুর বয়স ও বোঝার ক্ষমতা অনুযায়ী তার মতামতও গুরুত্ব পেতে পারে। তবে তার মতামতই সব ক্ষেত্রে চূড়ান্ত নয়। পারিবারিক আদালত আইন, ২০২৩-ও এ বিষয়ে প্রাসঙ্গিক।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রোগের আন্তর্জাতিক শ্রেণিবিন্যাসে ‘অভিভাবকীয় বিচ্ছিন্নতা’ নামে স্বতন্ত্র কোনো মানসিক রোগের নির্ণয় নেই। তবে এর অর্থ এই নয় যে, বিচ্ছেদের পর কোনো অভিভাবকের প্রভাবে সন্তানের সঙ্গে অন্য অভিভাবকের সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে না। শিশুর আচরণ দেখেই কাউকে অপরাধী ঘোষণা করা কিংবা রোগের নাম দেওয়া উচিত নয়।
মা-বাবার বিচ্ছেদ একটি সম্পর্কের সমাপ্তি হতে পারে, কিন্তু সন্তানের কাছে তাঁদের দুজনের প্রয়োজন শেষ হয়ে যায় না। একজনের প্রতি অন্যজনের ক্ষোভ থাকলেও সন্তানকে বার্তাবাহক বানানো, তার কাছ থেকে অন্য অভিভাবকের খবর নেওয়া কিংবা তাকে দিয়ে অভিযোগ পৌঁছে দেওয়া উচিত নয়।
শেষ পর্যন্ত সেই আট বছরের ছেলেটির ফোনের পর্দা নিভে যায়। বাবা আরেকবার ফোন করেননি। ছেলেটি ফোনটা নামিয়ে রাখে। মা পাশের ঘরে নিজের কাজে ব্যস্ত। কেউ তাকে জিজ্ঞেস করে না, সে আসলে বাবার সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিল কি না।
হয়তো সে বাবাকে ফোন করতে চেয়েছিল। শুধু মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে সাহস পায়নি।
তথ্যসূত্র
১. বাংলাদেশ পারিবারিক আদালত আইন, ২০২৩।
২. অভিভাবক ও প্রতিপাল্য আইন, ১৮৯০।
৩. বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, রোগের আন্তর্জাতিক শ্রেণিবিন্যাস, একাদশ সংস্করণ।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।