শক্ত থাকারও ক্লান্তি আছে
(মনস্তত্ত্ব ও সমকালীন জীবন)
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণমূলক লেখা
২১ অক্টোবর ২০২৬
রাফি অফিসের সবচেয়ে হাসিখুশি ছেলেটা। দুপুরে খাবার টেবিলে বসলে তার কথা শুনে সবাই হাসে। কারও মন খারাপ থাকলে সে পাশে গিয়ে বসে, সহকর্মীর কাজ আটকে গেলে সাহায্য করে। অফিসের কেউ তাকে চিন্তিত দেখলে মজা করে বলে, “তোমার আবার কীসের চিন্তা? তুমি তো সব সামলে নিতে পারো!”
রাফি হাসে। কথাটা অস্বীকার করে না।
সেদিন অফিস থেকে ফিরে সে দরজা খুলে ঘরে ঢুকল। টেবিলের ওপর সকালের চায়ের কাপটা পড়ে আছে। মুঠোফোনে মায়ের তিনটি মিসড কল। বেতন পাওয়ার পর বাড়িতে টাকা পাঠিয়েছে, কিন্তু নিজের মাসের খরচ কীভাবে চালাবে, সেই হিসাবটা এখনো মেলেনি। তার ওপর ছোট ভাইয়ের পড়াশোনার খরচ নিয়ে বাড়ি থেকে নতুন করে কথা এসেছে।
রাফি ফোনটা হাতে নিল, আবার রেখে দিল। মাকে কী বলবে? যে ছেলে বাড়ির সবাইকে ভরসা দেয়, সে নিজেই যে কতটা দুশ্চিন্তায় আছে, সেটা কীভাবে বোঝাবে?
পরদিন অফিসে গিয়ে সে আবার আগের মতো হাসবে। কেউ বুঝবেও না, আগের রাতে তার ঘুম হয়নি।
রাফির মতো মানুষকে আমরা প্রায়ই দেখি। শুধু তাদের নীরবতার খবরটা আমাদের কাছে পৌঁছায় না।
যে মানুষটির কোনো সমস্যা থাকার কথা নয়
কিছু মানুষ ধীরে ধীরে এমন একটা পরিচয় পেয়ে যান, যেখানে তাঁদের দুর্বল হওয়ার সুযোগ থাকে না। পরিবারে তাঁরা দায়িত্বশীল সন্তান, বন্ধুদের কাছে ভরসার মানুষ, কর্মক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য সহকর্মী। সবাই তাঁদের কাছে সাহায্য চাইতে স্বস্তি পান। কিন্তু তাঁদের নিজের প্রয়োজনের কথা শোনার মানুষ কতজন?
রাফিও একসময় নিজের সমস্যা নিয়ে কথা বলত। চাকরি না পাওয়ার সময় বন্ধুকে ফোন করে হতাশার কথা জানিয়েছে, বাড়িতে আর্থিক সংকট হলে মায়ের সঙ্গে আলোচনা করেছে। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার দায়িত্বও বেড়েছে। এখন সে জানে, বাড়িতে নিজের দুশ্চিন্তার কথা বললে মা সারারাত ঘুমাতে পারবেন না। বন্ধুদের কাছে বললে কেউ হয়তো পরামর্শ দেবে, কেউ বলবে, “এত ভাবিস কেন?”
কথাগুলো হয়তো খারাপ উদ্দেশ্যে বলা হয় না। কিন্তু সব সময় সমাধান শুনতে চায় না মানুষ। কখনো সে শুধু চায়, কেউ তার কথাটা শুনুক। তাকে শক্ত হওয়ার পরামর্শ না দিয়ে স্বীকার করুক, তারও কষ্ট হতে পারে।
রাফি তাই আর কিছু বলে না।
সমস্যা হলো, একসময় অন্যের কাছে নিজের শক্তির যে পরিচয় তৈরি হয়, মানুষ নিজেই তার কাছে বন্দি হয়ে পড়ে। সবাই যখন ধরে নেয় সে সামলে নিতে পারবে, তখন সাহায্য চাওয়াটাও তার কাছে নিজের ব্যর্থতা স্বীকার করার মতো মনে হয়।
নিজের মতো থাকার আড়ালে
রাফি নিজের মতো থাকতে ভালোবাসে। কাজ শেষে সবার সঙ্গে আড্ডা দিতে সব দিন তার ইচ্ছা করে না। ছুটির দিনে ফোন বন্ধ রেখে একা বসে থাকতে ভালো লাগে। কিন্তু সে যখন কোনো নিমন্ত্রণ এড়িয়ে যায়, কেউ বলে, “আজকাল খুব ভাব নিচ্ছিস।” কোনো প্রশ্নের উত্তর সংক্ষেপে দিলে কেউ ধরে নেয়, তার অহংকার হয়েছে।
মানুষের ব্যক্তিগত পরিসরকে আমরা অনেক সময় তার আচরণের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে বিচার করি। কেউ কম কথা বললে তাকে অসামাজিক ভাবি, নিজের সমস্যা গোপন রাখলে মনে করি তার কিছুই হয়নি, নিজের সিদ্ধান্তে চললে বলি সে কাউকে গুরুত্ব দেয় না।
অথচ নিজের মতো থাকা মানেই অন্যদের প্রত্যাখ্যান করা নয়। সব আড্ডায় উপস্থিত না থেকেও কাউকে ভালোবাসা যায়। সব অনুভূতি প্রকাশ না করেও সম্পর্কের প্রতি যত্নশীল থাকা যায়।
তবে একা থাকার স্বস্তি আর কষ্ট থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়ার মধ্যে পার্থক্য আছে। রাফি যখন নিজের পছন্দে একা থাকে, তখন হয়তো তার ভালো লাগে। কিন্তু যখন কাউকে কিছু বলতে চেয়েও ভাবে, কেউ বুঝবে না, তখন সেই একাকিত্ব আর স্বস্তির থাকে না।
দুটো অবস্থাকে বাইরে থেকে আলাদা করা কঠিন। কারণ দুটোতেই মানুষটি চুপচাপ থাকে।
সব কথা নিজের মধ্যে রাখার মূল্য
রাফি একদিন অফিসে ভুল করল। বস সবার সামনে তাকে বললেন, “তোমার কাছ থেকে এমন ভুল আশা করিনি। তুমি তো সব সামলে নাও!”
রাফি মাথা নিচু করে কথাটা শুনল। ভুলটা তারই ছিল, সে জানত। কিন্তু গত কয়েক সপ্তাহ ধরে সে ঠিকমতো ঘুমায়নি, বাড়ির চিন্তায় কাজে মন বসাতে পারছিল না। কাউকে কিছু না বলায় কেউ জানতেও পারেনি, তার মনোযোগ কেন কমে যাচ্ছে।
বসের ঘর থেকে বেরিয়ে সহকর্মী জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে?”
রাফি হেসে বলল, “কিছু না, ঠিক হয়ে যাবে।”
এই ‘কিছু না’ কথাটার আড়ালে কত কিছু জমে থাকতে পারে, আমরা সব সময় বুঝি না। কখনো মানুষ বিচারিত হওয়ার ভয়ে বলে না, কখনো অন্যকে চিন্তায় ফেলতে চায় না, আবার কখনো নিজের সমস্যাটাই কোথা থেকে শুরু হয়েছে, তা বুঝে উঠতে পারে না।
দীর্ঘদিন দুশ্চিন্তা চেপে রাখলে তা কমে যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। বরং একই চিন্তা বারবার ফিরে আসতে পারে, ঘুমে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে, সিদ্ধান্ত নেওয়াও কঠিন করে তুলতে পারে। সব সমস্যার সমাধান অন্যের হাতে থাকে না, কিন্তু নিজের অবস্থাটা কাউকে জানানো অনেক সময় সমাধানের প্রথম ধাপ হতে পারে।
এ জন্য সবাইকে সব কথা বলতে হবে না। একজন বিশ্বাসযোগ্য মানুষই যথেষ্ট হতে পারেন। এমন কেউ, যিনি কথা শুনেই বিচার করবেন না, অনুমতি ছাড়া ব্যক্তিগত কথা অন্যকে বলবেন না, প্রতিটি সমস্যার উত্তর দিতে ছুটে যাবেন না।
কারণ মনের কথা ভাগ করে নেওয়া মানেই দুর্বল হয়ে পড়া নয়। বরং কখন নিজের সাহায্য প্রয়োজন, তা বুঝতে পারাও নিজের দায়িত্ব নেওয়ার অংশ।
শক্ত মানুষদেরও পাশে কেউ দরকার
আমরা প্রায়ই বলি, মানুষটাকে শক্ত হতে হবে। কিন্তু শক্ত থাকারও একটা সীমা আছে। প্রতিদিন নিজের ভয় আড়াল করা, সবার সামনে স্বাভাবিক থাকা, নিজের প্রয়োজনকে পিছিয়ে দেওয়া—এসব করতে করতে মানুষ ক্লান্ত হয়ে পড়ে।
যে মানুষটি সব সময় অন্যের পাশে দাঁড়ান, তাঁর পাশেও কেউ দাঁড়াতে পারেন। তাঁকে জোর করে কথা বলাতে হবে না, তাঁর নীরবতাকে অহংকারও ভাবতে হবে না। শুধু এমন একটা সম্পর্কের জায়গা তৈরি করা দরকার, যেখানে তিনি চাইলে বলতে পারবেন, আজ তাঁর ভালো লাগছে না।
রাফি সেদিন রাতেও মায়ের ফোনে কল করল। মা জিজ্ঞেস করলেন, “খেয়েছিস বাবা?”
প্রতিদিনের মতো সে বলতে যাচ্ছিল, “হ্যাঁ, খেয়েছি। সব ঠিক আছে।”
কিন্তু কথাটা বলার আগে একটু থামল।
তারপর বলল, “মা, আজকে মনটা ভালো নেই। একটু কথা বলবি?”
ওপাশে কয়েক মুহূর্ত নীরবতা। তারপর মা বললেন, “বল বাবা, শুনছি।”
রাফি জানালার পাশে চেয়ারে বসে রইল। বাইরে তখনও গাড়ির শব্দ, পাশের বাড়িতে টেলিভিশন চলছে। তার সমস্যাগুলো এক ফোনেই মিটে গেল না। টাকার হিসাবও বদলে গেল না।
তবু অনেক দিন পর সে প্রথমবার নিজের কষ্টটা লুকাল না।
সেদিন মায়ের কাছে রাফি শক্ত ছেলে ছিল না, পরিবারের ভরসা ছিল না, সবার সমস্যা সামলে দেওয়া মানুষটাও ছিল না।
সে শুধু রাফি ছিল—একজন ক্লান্ত মানুষ, যে একটু কথা বলতে চেয়েছিল।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।