মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী। ০৩ ডিসেম্বর ২০২৫
“সফলতা কি আনন্দ দেয়, নাকি আরও চাপের বোঝা?
সফল হলে কি সত্যিই সুখী হব?"
আমার কলিগ আরিফ। ত্রিশ বছর বয়স। কোম্পানির সবচেয়ে কম বয়সী ডেপুটি ম্যানেজার। গত মাসে প্রমোশন পেয়েছে, নতুন গাড়ি কিনেছে, বাসা থেকে বলে “আমাদের গর্ব”। কিন্তু গতকাল রাতে ও আমাকে ফোন করে কাঁদতে কাঁদতে বলল, “ভাই, আমি আর পারছি না। প্রতি রাতে ঘুমের ওষুধ না খেলে ঘুম আসে না। বুকটা এমন ধড়ফড় করে যে মনে হয় এই বুঝি শেষ।” আমি বললাম, “তোর তো সব আছে, তবু?” ও বলল, “এই ‘সব আছে’টাই আমাকে মারছে।”
আমার ছোটবেলার বন্ধু তামিম। আইবিএ পাশ করে ব্যাংকে চাকরি। বছরে দুইবার বিদেশ ঘুরে আসে। ফেসবুকে ছবি দেয়, ক্যাপশন “ড্রিম লাইফ”। কিন্তু গত সপ্তাহে ওর সঙ্গে দেখা। চোখের নিচে কালি। জিজ্ঞেস করলাম, “কী হয়েছে?” বলল, “ভাই, আমার বস বলেছে আরেকটা প্রমোশন না পেলে আমাকে ছেড়ে দেবে। আমি যে এর মধ্যেই শেষ হয়ে গেছি, সেটা কেউ দেখে না।”
আমি নিজেও তো একই। চাকরি ভালো, বেতন ভালো। বাসায় ফোন করলে মা বলেন, “এখন বিয়ে করে ফেল।” বাবা বলেন, “আরেকটা ফ্ল্যাট কিনে রাখ।” আমি হাসি। কিন্তু রাতে যখন একা থাকি, তখন ভাবি—আমি কি সত্যিই এই জীবন চেয়েছিলাম? আমি কি শুধু একটা ট্রফির মতো হয়ে গেছি যেটা সবাই দেখিয়ে বলে “দেখো আমার ছেলে কত সফল”?
আমার বোন রিয়া। এইচএসসি দিয়ে বের হয়েছে ৪.৯০। কোচিং-এ গিয়ে প্রতিদিন ১২ ঘণ্টা পড়ে। গতকাল রাতে ওকে দেখলাম বাথরুমে বসে কাঁদছে। জিজ্ঞেস করলাম, “কী হয়েছে?” বলল, “দাদা, আমি যদি ডাক্তার না হই, তাহলে কেউ আমাকে মানুষই মনে করবে না।” আমি কী বলব? আমি নিজেও তো একই চাপে বড় হয়েছি।
আমরা সবাই একটা ফাঁদে আটকে গেছি। যে ফাঁদের নাম “সফলতা”।
- ভালো রেজাল্ট করতে হবে, নইলে লুজার
- ভালো চাকরি করতে হবে, নইলে বেকার
- বেশি বেতন পেতে হবে, নইলে অপদার্থ
- বিয়ে করতে হবে, নইলে অসম্পূর্ণ
- বাচ্চা নিতে হবে, নইলে বংশহীন
এই “নইলে”গুলো আমাদের গলা টিপে ধরে। আমরা দৌড়াই। আরও দৌড়াই। কিন্তু কোথায় যাচ্ছি, সেটা কেউ জিজ্ঞেস করে না।
আমি যখন বলি, “আমি একটু ব্রেক নিতে চাই, এক বছর ছুটি নিয়ে বাংলাদেশ ঘুরব”, তখন সবাই হাসে। “পাগল হয়েছিস? এখন তো ক্যারিয়ার বানানোর সময়!” আমি চুপ করে যাই। কারণ বোঝানো যায় না যে আমার বুকের ভিতরটা কেমন পুড়ে যাচ্ছে।
আমরা ভুল করতে ভয় পাই। একটা প্রেজেন্টেশন গেল খারাপ, মনে হয় জীবন শেষ। একটা রিলেশনশিপ ভেঙে গেল, মনে হয় আর কেউ ভালোবাসবে না। আমরা নিজেদেরকে ক্ষমা করতে ভুলে গেছি।
আমি আর পারছি না এই দৌড়ে। আমি থামতে চাই। একটু নিশ্বাস নিতে চাই। একটু ভুল করতে চাই। একটু কাঁদতে চাই। আর কেউ যদি বলে, “তুই ব্যর্থ”, আমি বলব, “হ্যাঁ, আমি ব্যর্থ। কিন্তু অন্তত আমি বেঁচে আছি।”
তাই আজ থেকে আমি চেষ্টা করব।
- ছোট ছোট আনন্দ খুঁজব। এক কাপ চা, একটা বই, একটা হাঁটা।
- ভুল করলে হাসব। বলব, “আচ্ছা, এবার অন্যভাবে করব।”
- কাউকে ভালোবাসলে বলে দেব। লুকাব না।
- আর যদি কেউ বলে “তুই পারফেক্ট না”, আমি বলব, “ধন্যবাদ। আমি তো মানুষ।”
সফলতা যদি আমাকে মেরে ফেলে, তাহলে আমি সফল হতে চাই না।
আমি শুধু বাঁচতে চাই। একটু শান্তিতে। একটু নিজের মতো।
তুমি যদি এটাও পড়ে থাকো আর তোমার বুকটা ভারী লাগছে, তাহলে একটা কাজ করো।
আজ একটু থামো।
ফোনটা বন্ধ করো।
চোখ বন্ধ করে নিজেকে জিজ্ঞেস করো, “আমি কি সত্যিই সুখী?”
যদি উত্তর “না” হয়, তাহলে কিছু একটা বদলাও। ছোট হলেও।
কারণ তুমি শুধু একটা সিভি না। তুমি একটা জীবন।
আজ নিজের ভুলকে গ্রহণ করুন। নিজের আনন্দের জন্য ছোট পদক্ষেপ নিন।
#চাপে_বসা_তরুণ #সফলতার_ফাঁদ #ভুল_করেও_ঠিক আছি #থামতে_ভয়_নেই #বাঁচতে_চাই
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।