ঘরের মানুষ
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণমূলক লেখা | ৫ অক্টোবর ২০২৬
সকাল আটটার একটু আগে নিশি মেয়েকে স্কুলে পাঠানোর জন্য ব্যস্ত। এক হাতে টিফিন বক্স, অন্য হাতে মেয়ের চুলের ফিতা। রান্নাঘরে গ্যাস জ্বলছে, শাশুড়ির ওষুধ দেওয়ার সময় হয়ে গেছে।
রহিমা এসে বলল, “আপা, মায়ের ওষুধটা আমি দিয়ে দিচ্ছি। আপনি মেয়েটাকে তৈরি করেন।”
নিশি বলল, “হ্যাঁ, দাও।”
রহিমা শুধু ওষুধটা এগিয়ে দিল না। শাশুড়িকে বিছানা থেকে উঠিয়ে বাথরুমে নিয়ে গেল, মুখ ধুইয়ে দিল, নাশতা সামনে রাখল। তারপর মেয়ের টিফিন গুছিয়ে দিল। নিশি মেয়েকে নিয়ে বের হওয়ার সময় বলল, “রহিমা, মাকে একটু দেখে রেখো।”
রহিমা মাথা নেড়ে বলল, “আপনি যান।”
এই ছোট কথাটার ভেতর একটা পরিবারের বড় দায়িত্ব চলে গেল একজন গৃহশ্রমিকের হাতে।
কিন্তু দিনের শেষে আমরা তাকে কী বলি?
“ও তো বাসায় কাজ করে।”
এই কথাটার মধ্যেই আমাদের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির একটা বড় সমস্যা লুকিয়ে আছে।
একজন অফিসকর্মী সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত কাজ করলে আমরা তাকে কর্মজীবী মানুষ বলি। কিন্তু একজন নারী একই সময়ে ঘর পরিষ্কার করলে, রান্না করলে, শিশুকে খাওয়ালে, বৃদ্ধকে বাথরুমে নিয়ে গেলে কিংবা অসুস্থ মানুষের পাশে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকলে সেটাকে প্রায়ই শুধু “বাসার কাজ” বলে পাশ কাটিয়ে যাই।
আমরা তার শ্রম চাই, কিন্তু তার মানুষটাকে অনেক সময় দেখতে চাই না।
গৃহশ্রমিককে নিয়ে নেতিবাচক ধারণারও কমতি নেই।
“ওদের বিশ্বাস করা যায় না।”
“বেশি স্বাধীনতা দিলে মাথায় উঠে যাবে।”
“ছুটি চাইলেই সমস্যা।”
“বেতন বাড়াতে বলছে কেন?”
এ ধরনের কথা আমাদের খুব পরিচিত।
কিন্তু একই মানুষটির হাতে যখন নিজের সন্তানের দায়িত্ব তুলে দিই, তখন সেই অবিশ্বাস কোথায় থাকে?
অভিক একদিন অফিস থেকে ফিরে দেখল, তার মা বারান্দায় বসে আছেন। রহিমা পাশে বসে পায়ের ব্যথায় তেল মালিশ করছে।
অভিক বলল, “মা, ডাক্তার যে ব্যায়াম করতে বলেছে করেছ?”
মা হেসে বললেন, “রহিমা না থাকলে তো তোমরা জানতেই না আমি ব্যায়াম করছি কি না।”
অভিক মজা করে বলল, “ও তো কাজের জন্যই করে।”
মা এবার একটু বিরক্ত হয়ে বললেন, “তুমি অফিসে কাজ করো। ও এখানে কাজ করে। কাজটা ছোট হলো কীভাবে?”
অভিক চুপ করে গেল।
গৃহশ্রমিকের কাজের যে অংশটা আমরা সবচেয়ে কম দেখি, সেটাই অনেক সময় পরিবারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা।
একজন শিশুকে সময়মতো খাওয়ানো, স্কুল থেকে ফিরলে পাশে থাকা, জ্বর হলে রাত জাগা কিংবা একজন বৃদ্ধের ওষুধের সময় মনে রাখা—এসব শুধু ঘরের কাজ নয়। এর সঙ্গে ধৈর্য, দায়িত্ব আর বিশ্বাস জড়িয়ে থাকে।
অথচ এই কাজগুলোর কোনো আলাদা পদবি নেই। কোনো ডেস্ক নেই। কোনো পদোন্নতি নেই।
আছে শুধু দায়িত্ব।
একদিন রহিমা নিশিকে বলল, “আপা, কাল আমি একটু আগে যাব।”
নিশি বলল, “কেন?”
“মেয়ের স্কুলে যেতে হবে। ওর ফরম জমা দিতে হবে।”
নিশি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “ঠিক আছে। তুমি যাও।”
রহিমা যাওয়ার সময় বলল, “আপা, পরশু একটু বেশি সময় থাকব।”
নিশি বলল, “সেটা নিয়ে চিন্তা করো না।”
রহিমা চলে গেল।
নিশি দরজা বন্ধ করে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল।
তার নিজের মেয়ের স্কুলের ফরম জমা দেওয়া, পরীক্ষার খবর নেওয়া কিংবা অসুস্থ হলে পাশে থাকা—এসবকে সে স্বাভাবিক দায়িত্ব মনে করে। রহিমাও তার মেয়ের জন্য একই কাজ করতে চায়।
পার্থক্য শুধু এই যে, একজনের সন্তানের যত্নকে আমরা সহজেই দায়িত্ব বলি, অন্যজনের প্রয়োজনকে অনেক সময় বাড়তি ঝামেলা মনে করি।
এই দৃষ্টিভঙ্গিটাই বদলানো দরকার।
গৃহশ্রমিকের কাজকে সম্মান করা মানে তাকে দেবতার আসনে বসানো নয়। আবার তাকে সন্দেহের চোখে দেখাও নয়। তিনি একজন কর্মী। তারও ভুল হতে পারে, দায়িত্বে ঘাটতি হতে পারে। যেমন অন্য যেকোনো পেশার মানুষের হয়।
কিন্তু ভুল করলে জবাবদিহি আর মানুষকে ছোট করা এক জিনিস নয়।
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, গৃহশ্রমিকদের কাজের পরিধি অনেক পরিবারেই বেড়েছে, কিন্তু তাদের পরিচয় এখনো প্রায়ই আটকে আছে একটি শব্দে—“কাজের লোক”।
আজ অনেক গৃহশ্রমিক শুধু ঘর পরিষ্কার করেন না। তারা শিশুর যত্ন নেন, বৃদ্ধের পাশে থাকেন, স্কুল থেকে সন্তান আনেন, হাসপাতালে নিয়ে যান, ওষুধের সময় মনে করিয়ে দেন। অর্থাৎ একটি পরিবারের ব্যস্ত জীবনের এমন কিছু দায়িত্ব তারা সামলে দেন, যার অনুপস্থিতি খুব দ্রুত বোঝা যায়।
একদিন সন্ধ্যায় রহিমা চলে যাওয়ার পর অভিকের মেয়ে দৌড়ে এসে বলল, “মা, রহিমা খালা কাল আসবে তো?”
নিশি বলল, “হ্যাঁ।”
মেয়েটা বলল, “দাদুর ওষুধটা তো উনিই মনে করিয়ে দেন।”
অভিক পাশ থেকে শুনছিল।
সে কিছু বলল না।
শুধু টেবিলের ওপর রাখা ওষুধের বাক্সটার দিকে তাকাল।
তারপর প্রথমবারের মতো মনে হলো, এই বাক্সটা প্রতিদিন যে হাতটা ঠিক সময়ে এগিয়ে দেয়, সেই হাতটারও তো একটা নাম আছে।
রহিমা।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।