রোমান্টিকতাবাদ বাস্তবতা থেকে পালানোর একধরনের শিল্প
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
নিবন্ধ। এপ্রিল ০৩, ২০২৬
কিছু মানুষ বাস্তব থেকে পালায় না। তারা তাকে রূপ দেয়।
কথাটা শুনলে প্রথমে একটু অস্বস্তি লাগে। রোমান্টিকতাবাদকে আমরা প্রায়ই সুন্দর কিন্তু অবাস্তব স্বপ্নের জগৎ বলে ভাবি। প্রকৃতির মাঝে হারিয়ে যাওয়া, আদর্শ প্রেমের খোঁজ, অসীম সৌন্দর্যের আকাঙ্ক্ষা—এসবকে সহজেই মুক্তির চেষ্টা বলে ডাকা হয়। তবে গভীরে গেলে মনে হয়, রোমান্টিক শিল্পীরা বাস্তবকে পুরোপুরি অস্বীকার করেন না। তারা সেটাকে নতুন করে গড়ে তোলেন। বাস্তবের কঠিন দিকগুলোকে এড়িয়ে যান না, বরং কল্পনার ছোঁয়ায় রাঙিয়ে একটা আদর্শ জগৎ তৈরি করেন। এটা কি শুধুই আশ্রয় নেওয়া, নাকি সৃজনশীলতার আরেক রূপ?
রোমান্টিকতাবাদের উত্থান ঘটে ইউরোপের শিল্প বিপ্লবের সময়। কারখানার ধোঁয়া, শহরের ভিড়, মানুষের অবিরাম শ্রম—এই বাস্তব থেকে কবিরা প্রকৃতির দিকে ফিরে গিয়েছিলেন। ওয়ার্ডসওয়ার্থ “আমি একা ভেসে বেড়াচ্ছিলাম মেঘের মতো” লিখে যান্ত্রিক জীবন থেকে মুক্তির চেষ্টা করেছিলেন। সেটা শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্যের বর্ণনা নয়। সেটা ছিল যান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে এক ধরনের প্রতিরোধ। কিন্তু এই প্রতিরোধ কি দুর্বলতার লক্ষণ? দেখে মনে হয়, রোমান্টিক কবিরা বাস্তবকে এড়িয়ে যাননি। তারা সেটাকে কল্পনার আয়নায় দেখিয়েছেন, যাতে মানুষ তার ভেতরের আদর্শ জগত খুঁজে পায়।
বাংলা সাহিত্যে জীবনানন্দ দাশের কবিতায় এই স্বাদটা স্পষ্ট। তিনি ধানক্ষেতের কিনারে একা দাঁড়িয়ে থাকেন, অন্ধকার আকাশের নীচে নদীর শব্দ শোনেন। সেটা কি শুধুই আশ্রয়? না। সেটা বাস্তবের ক্লান্তি থেকে সরে এসে একটা আদর্শ বাংলাকে রূপ দেওয়া। “রূপসী বাংলা”য় গ্রামের সাধারণ দৃশ্য এমনভাবে আঁকা হয় যে সেটা আর শুধু গ্রাম থাকে না। “আবার আসিব ফিরে” কবিতায় তিনি লিখেছেন:
“আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে — এই বাংলায়
হয়তো মানুষ নয় — হয়তো বা শঙ্খচিল শালিকের বেশে...”
এখানে মৃত্যুকে দেখা হয়েছে প্রকৃতির সঙ্গে মিলে যাওয়ার একটা ধারাবাহিকতা হিসেবে। ঘাস হয়ে, পাখি হয়ে ফিরে আসা—এটা বাস্তবের শেষ সীমাকে কল্পনায় অতিক্রম করার চেষ্টা।
“বনলতা সেন” কবিতায় ক্লান্ত পথিক “দু-দণ্ড শান্তি” পায় নাটোরের বনলতা সেনের কাছে। “আমি ক্লান্ত প্রাণ এক, চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন...”। বনলতা সেন কি সত্যিকারের নারী, নাকি কাল্পনিক আশ্রয়? এই প্রশ্নটা রোমান্টিকতাবাদের মূলে থেকে যায়। বাস্তব যদি ক্লান্ত করে, তাহলে কল্পনা কি সেটাকে সহনীয় করে তোলে, নাকি শুধু অজুহাত তৈরি করে?
রোমান্টিকতাবাদকে প্রায়ই পালিয়ে যাওয়া বলে সমালোচনা করা হয়। শিল্প বিপ্লবের পর বাস্তববাদী লেখকরা যখন সমাজের কঠোর চিত্র তুলে ধরছিলেন, তখন রোমান্টিকরা প্রকৃতি আর আবেগে আশ্রয় নিয়েছিলেন। কিন্তু এই আশ্রয় কি সত্যিই দুর্বলতা? মনে হয় এটা এক ধরনের প্রতিরোধ। বাস্তবের নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে কল্পনার অস্ত্র। জীবনানন্দের কবিতায় এই প্রতিরোধ স্পষ্ট। আধুনিকতার যান্ত্রিক জীবন থেকে সরে এসে তিনি বাংলার গ্রামীণ প্রকৃতিকে আদর্শায়িত করেন।
কিটসের “নাইটিঙ্গেল” কবিতায় পাখির গানে অমরত্বের স্বপ্ন দেখা হয়েছে। “তুমি মৃত্যুর জন্য জন্মাওনি, অমর পাখি!” — এই লাইন মৃত্যুর বাস্তবকে কল্পনায় জয় করার চেষ্টা। জীবনানন্দের নিঃসঙ্গতাও শুধু অন্ধকার নয়। সেটা প্রকৃতির সঙ্গে মিলে যাওয়ার একটা শান্ত স্বীকারোক্তি। এই স্বীকারোক্তি বাস্তবকে অস্বীকার করে না, বরং তার সঙ্গে একটা সৃজনশীল সম্পর্ক গড়ে তোলে।
রোমান্টিকতাবাদের এই দিকটা শুধু ব্যক্তিগত নয়, সামাজিকও। ঔপনিবেশিক যুগে বাংলায় দীনেন্দ্রনাথ রায় বা প্রমথনাথ চৌধুরীর মতো কবিরা রাজনৈতিক চাপ থেকে সরে প্রকৃতি আর আদর্শ জগতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। জীবনানন্দও তার ব্যতিক্রম নন। তাঁর কবিতায় শহুরে একাকীত্ব আর গ্রামের নীরব সৌন্দর্য পাশাপাশি চলে। এটা পালিয়ে যাওয়া, কিন্তু সৃজনশীল পালিয়ে যাওয়া। বাস্তবকে অস্বীকার না করে তাকে রূপান্তরিত করা।
রোমান্টিকতাবাদ আজও প্রাসঙ্গিক। আমরা যখন প্রতিদিনের চাপে নুয়ে পড়ি, তখন একটা কবিতা বা প্রকৃতির ছবি মনে করিয়ে দেয়—জীবন শুধু কঠিন নয়, সুন্দরও হতে পারে। আশ্রয় নেওয়া যদি দুর্বলতা হয়, তাহলে সৃজনশীলতা কী? সৃজনশীল মানুষ বাস্তবকে যেমন দেখেন, তেমনি তাকে নতুন করে গড়েন। রোমান্টিক শিল্পীরা ঠিক তাই করেছেন। তারা বাস্তব থেকে সরে যাননি। তারা বাস্তবকে রূপ দিয়েছেন।
আশ্রয় নেওয়া কি সত্যিই দুর্বলতা, নাকি সৃজনশীলতার আরেক রূপ?
এই প্রশ্নটা আমাদের সবাইকে ভাবায়। যখন জীবনের চাপ অসহ্য লাগে, তখন প্রকৃতির কাছে ফিরে যাওয়া বা কল্পনায় হারিয়ে যাওয়া কি শুধুই আশ্রয়?
নাকি এগুলোই বাস্তবকে সহ্য করার শক্তি জোগায়?
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।