সব কথা নয়
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণমূলক লেখা
১ নভেম্বর ২০২৬
রাতের খাবার টেবিলে দুজন মানুষ বসে আছেন। একজন কিছু একটা বলতে গিয়েও থেমে গেলেন। অন্যজন বুঝতে পারলেন, কথাটা বলা হয়নি। দুজনেই খাওয়া শেষ করলেন, তারপর যে যার কাজে চলে গেলেন। বাইরে থেকে দেখলে সংসারে কোনো অশান্তি নেই। অথচ সেই না-বলা কথাটাই হয়তো পরদিনও তাঁদের মাঝখানে বসে থাকবে।
সম্পর্কে এমন অনেক মুহূর্ত আসে, যখন মানুষ সত্যিটা জানে, কিন্তু বলতে চায় না। মনে হয়, এখন বললে ঝগড়া হবে। মানুষটি কষ্ট পাবে। কয়েক দিনের ভালো পরিবেশ নষ্ট হবে। তাই বিষয়টা এড়িয়ে যাওয়াই ভালো। কখনো সত্যিই এড়িয়ে যাওয়া ভালো। প্রতিটি কথার জবাব দিতে হয় না, প্রতিটি আচরণের ব্যাখ্যা চাইতে হয় না। কিন্তু সব সময় চুপ করে থাকাকে পরিণত আচরণ ভাবাও ভুল।
আমরা অনেক সময় সঠিক কাজটির চেয়ে সহজ কাজটি বেছে নিই। মুখ খুলে নিজের কষ্টের কথা বলা কঠিন। সামনাসামনি বসে ভুল বোঝাবুঝি পরিষ্কার করা কঠিন। পুরোনো কোনো ঘটনার কথা তুললে আবার মন খারাপ হতে পারে, সম্পর্কের মধ্যে অস্বস্তি তৈরি হতে পারে। তাই মানুষ চুপ থাকে। ভাবে, সময় গেলে সব ঠিক হয়ে যাবে।
কিন্তু সময় সব সমস্যার সমাধান করে না। কিছু সমস্যা সময়ের সঙ্গে আরও জটিল হয়। যে কথাটি আজ শান্তভাবে বলা যেত, কয়েক মাস পরে সেটি জমে থাকা অভিমান নিয়ে বেরিয়ে আসে। তখন আলোচনার বিষয় আর শুধু একটি ঘটনা থাকে না। তার সঙ্গে যুক্ত হয় আগের অনেক অভিযোগ, পুরোনো অপমান, অবহেলার স্মৃতি। দুজন মানুষ তখন সমস্যার সমাধান করতে বসেন না, বরং কে কতটা কষ্ট পেয়েছেন, তার হিসাব মেলাতে থাকেন।
ধরা যাক, স্বামী প্রতিদিন কাজ শেষে বাড়ি ফিরে ক্লান্ত হয়ে চুপচাপ বসে থাকেন। স্ত্রী বিষয়টি নিয়ে কয়েকবার কথা বলতে চেয়েছেন। তাঁর মনে হয়, স্বামী আর আগের মতো সময় দেন না। অন্যদিকে স্বামী ভাবেন, সারাদিনের পরিশ্রমের পর একটু নীরবতা চাইলে এত অভিযোগ কেন? দুজনেরই কিছু সত্য আছে। কিন্তু কেউই অন্যজনের কথাটা মন দিয়ে শুনছেন না। একজন অভিমান জমাচ্ছেন, অন্যজন কথা এড়িয়ে যাচ্ছেন। এভাবে একই ঘরে থেকেও তাঁদের মধ্যে দূরত্ব বাড়ছে।
এখানে কথা বলার অর্থ কাউকে দোষী করা নয়। বরং নিজের অনুভূতিটা এমনভাবে জানানো, যাতে অন্য মানুষটি আক্রমণের শিকার বোধ না করেন। ‘তুমি কখনো আমাকে সময় দাও না’ বললে সামনে থাকা মানুষটি আত্মপক্ষ সমর্থনে ব্যস্ত হয়ে পড়তে পারেন। তার বদলে বলা যায়, ‘ইদানীং তোমার সঙ্গে বসে কথা বলার সময় পাই না, বিষয়টা আমার খারাপ লাগে।’ কথার এই সামান্য পরিবর্তন আলোচনার দরজা খুলে দিতে পারে।
আবার সব সময় কথা বলারও দরকার হয় না। স্বামী একদিন বাড়ি ফিরে মন খারাপ করে চুপচাপ বসে আছেন। স্ত্রী হয়তো বুঝতে পারলেন, আজ তাঁর কিছু একটা হয়েছে। কিন্তু সেদিনই কারণ জানতে চেয়ে প্রশ্নের পর প্রশ্ন না করে ভাবলেন, আজ থাক, কাল কথা বলব। পরদিন সকালে এক কাপ চা এগিয়ে দিয়ে শুধু জিজ্ঞেস করলেন, ‘কাল তোমাকে একটু অন্যরকম লাগছিল, এখন কেমন আছ?’ এইটুকু অপেক্ষা অবহেলা নয়, বরং অন্য মানুষের মনের অবস্থাকে সম্মান করা।
জ্ঞান হলো কোন বিষয়টি ছেড়ে দিতে হবে আর কোনটি নিয়ে কথা বলা জরুরি, সেই পার্থক্য বুঝতে পারা। একবারের ভুল আর বারবার একইভাবে আঘাত করার মধ্যে পার্থক্য আছে। সাময়িক দূরত্ব আর দীর্ঘদিনের অবহেলা এক বিষয় নয়। কোনো মানুষ ভুল বুঝতে পারেন, আবার সেই ভুল সংশোধনের চেষ্টাও করতে পারেন। কিন্তু কেউ যদি বারবার একই আচরণ করেন, আপনার কষ্টের কথা জানার পরও গুরুত্ব না দেন, তাহলে নীরব থাকাকে আর বোঝাপড়া বলা যায় না।
আরেকটি বিষয় মনে রাখা দরকার, সম্পর্কের প্রতিটি আলোচনার শেষেই সমাধান আসবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। আপনি শান্তভাবে নিজের কথা বলতে পারেন, অন্যজন শুনতেও পারেন, তবু তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি বদলাবে না। কারণ সম্পর্ক দুজনের হলেও পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত প্রত্যেককে নিজের ভেতর থেকে নিতে হয়। একজন বারবার কথা বলবেন, আর অন্যজন প্রতিবার এড়িয়ে যাবেন, এমন হলে শুধু ধৈর্য ধরে সম্পর্কের ভার বহন করা যায় না।
কথা বলারও একটা সময় আছে, ভাষা আছে। রাগের মাথায় বলা সত্যও অনেক সময় আঘাতের কারণ হয়। তাই উত্তেজনার মুহূর্তে সিদ্ধান্ত না নিয়ে দুজনের মন শান্ত হলে আলোচনা করা ভালো। পুরোনো ক্ষত নিয়ে কথা বলতে হলে উদ্দেশ্য হওয়া উচিত ক্ষতটা সারানো, নতুন করে কাউকে দোষী বানানো নয়। আর নিজের ভুল থাকলে সেটি স্বীকার করার মানসিকতাও থাকতে হবে।
সম্পর্কে আরাম দরকার, কিন্তু সেই আরাম যদি সত্য এড়িয়ে যাওয়ার নাম হয়, তাহলে একসময় তার মূল্য দিতে হয়। আজকের সামান্য অস্বস্তি হয়তো দুজন মানুষকে কাছাকাছি আনতে পারে। আবার আজকের নীরবতা কাল এমন দূরত্ব তৈরি করতে পারে, যেখান থেকে ফিরে আসা কঠিন।
সব কথা বলতে হবে না। সবকিছু সহ্যও করতে হবে না। কোন কথাটি না বললে সম্পর্কের ক্ষতি হবে, আর কোন কথাটি না বললেও চলে, সেই বোধটুকুই সম্পর্কের পরিণত আচরণ।
কারণ কখনো কখনো একটি সম্পর্ক ভেঙে যায় বড় কোনো ঝগড়ায় নয়, বরং বছরের পর বছর বলা হয়নি এমন কয়েকটি কথার ভারে।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।