তাহলে আমরা কী শিক্ষা পেলাম?
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী | ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
আমরা সন্তানকে স্কুলে পাঠাই। ভালো ফল চাই। তারপর কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, ডিগ্রি, চাকরি, পদোন্নতি, ভালো বেতন। ছোটবেলা থেকেই তাকে শেখাই, জীবনে বড় হতে হবে।
কিন্তু এত কিছুর ভিড়ে একটা প্রশ্ন কোথায় যেন হারিয়ে যায়—
মানুষ হিসেবে সে কেমন হলো?
রেজাল্টের দিন বাবা হয়তো মিষ্টির বাক্স হাতে বাড়ি ফেরেন। সন্তান ভালো করেছে, সবাই খুশি। কিন্তু সেই সন্তান সেদিন স্কুলে একজন সহপাঠীকে অপমান করেছে কি না, দুর্বল কাউকে ঠকিয়েছে কি না, কারও সঙ্গে অন্যায় করেছে কি না—সেই হিসাবটা কেউ নেয় না।
আমরা নম্বরের হিসাব রাখি। চরিত্রের হিসাব রাখি না।
একজন মানুষ উচ্চশিক্ষিত হতে পারেন, ভালো চাকরি করতে পারেন, সমাজে প্রতিষ্ঠিত হতে পারেন। অথচ ঘরে সামান্য মতের অমিল হলেই সম্পর্ক ভেঙে দিতে পারেন। বৃদ্ধ বাবা-মায়ের জন্য নিজের ঘরে জায়গা না থাকলেও তাদের বৃদ্ধাশ্রমে পাঠানোর সামর্থ্য থাকতে পারে।
কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি নিয়ে সরকারি অফিসে বসেন, অথচ ঘুষ ছাড়া ফাইল নড়ান না। কেউ ব্যবসায় সফল, কিন্তু সুযোগ পেলেই ক্রেতাকে ঠকান। কেউ আইন খুব ভালো জানেন, কিন্তু নিজের স্বার্থে আইন ভাঙতেও দ্বিধা করেন না। কেউ নৈতিকতার কথা বলেন, অথচ সুযোগ পেলে অন্যের অধিকারটুকুও নিজের করে নেন।
তাহলে সমস্যা কি শিক্ষিত হওয়ায়?
না।
সমস্যা হলো, আমরা শিক্ষার অর্থটাই হয়তো খুব ছোট করে ফেলেছি।
আমাদের কাছে শিক্ষা মানে ভালো ফল, একটি সার্টিফিকেট, ভালো চাকরি আর সামাজিক প্রতিষ্ঠা। সন্তান কত নম্বর পেল, কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ল, কোথায় চাকরি পেল—এসব জানতে আমরা আগ্রহী।
কিন্তু সে মিথ্যা বলে কি না, দুর্বল কাউকে ঠকায় কি না, নিজের ভুল স্বীকার করতে পারে কি না, বাবা-মায়ের প্রতি দায়িত্বশীল কি না, ক্ষমতা পেলে অন্যায় করবে কি না—এসব নিয়ে আমরা কতটা ভাবি?
আমরা বলি, ‘ভালো করে পড়ো, জীবনে বড় হও।’
কিন্তু কতবার বলি, ‘ভালো মানুষ হও’?
পরীক্ষার ফল প্রকাশ হলে জিজ্ঞেস করি, ‘কত পেয়েছ?’
কতবার জিজ্ঞেস করি, ‘আজ কাউকে কষ্ট দিয়েছ কি?’
চাকরি পাওয়ার খবর শুনে আনন্দ করি। কিন্তু কতজন সন্তানকে বলি, ‘চাকরিতে গিয়ে অন্যায় করার সুযোগ পেলে নিজেকে সামলাতে পারবে তো?’
ডিগ্রি জ্ঞান দিতে পারে। বই চিন্তা করতে শেখাতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয় দক্ষতা তৈরি করতে পারে। কিন্তু সততা, দায়িত্ববোধ, সংযম আর মানবিকতা শুধু পরীক্ষার সিলেবাস থেকে শেখা যায় না।
একজন মানুষ অনেক কিছু জানতে পারেন, অথচ নিজের লোভকে নিয়ন্ত্রণ করতে নাও পারেন।
আইনের ধারা মুখস্থ রাখতে পারেন, অথচ ন্যায়ের অর্থ ভুলে যেতে পারেন।
অর্থ উপার্জনের কৌশল জানতে পারেন, অথচ অর্থের জন্য কোথায় থামতে হবে, সেই বোধ হারিয়ে ফেলতে পারেন।
সেখানেই শিক্ষার সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
অবশ্যই প্রতিটি বিবাহবিচ্ছেদ শিক্ষার ব্যর্থতা নয়। বৃদ্ধাশ্রমে থাকা প্রতিটি বাবা-মাকে সন্তান পরিত্যাগ করেছে, এমনও নয়। আর দুর্নীতির দায় শুধু শিক্ষিত মানুষের ওপর চাপানোও ঠিক নয়।
তবু প্রশ্নটা এড়ানো যায় না।
একজন উচ্চশিক্ষিত মানুষ যদি অন্যায়কে স্বাভাবিক মনে করেন, তাহলে তার শিক্ষা তাকে কোথায় থামাল?
একজন সন্তান যদি অনেক ডিগ্রি নিয়েও বৃদ্ধ বাবা-মাকে বোঝা মনে করেন, তাহলে সেই শিক্ষার কোন জায়গাটা তাকে দায়িত্ববোধ শেখাল?
একজন মানুষ যদি সারাজীবন সাফল্যের পেছনে ছুটতে ছুটতে শেষ পর্যন্ত নিজের বিবেকটাকেই হারিয়ে ফেলেন, তাহলে তার অর্জনের হিসাবটা কী?
শিক্ষা আমাদের জীবিকা অর্জনের দক্ষতা দিয়েছে। কিন্তু জীবনকে সঠিকভাবে চালানোর বোধ কি দিয়েছে?
এই প্রশ্নটাই সবচেয়ে জরুরি।
কারণ সবচেয়ে শিক্ষিত মানুষটি সবসময় সেই ব্যক্তি নন, যার নামের পাশে সবচেয়ে বেশি ডিগ্রি আছে।
হয়তো সত্যিকারের শিক্ষিত মানুষ তিনি, যিনি ক্ষমতা পেয়েও অন্যায় করেন না, সামর্থ্য পেয়েও দুর্বলকে ছোট করেন না, অর্থের জন্য বিবেক বিক্রি করেন না এবং নিজের বাবা-মা, পরিবার ও সমাজের প্রতি দায়িত্ব ভুলে যান না।
শেষ পর্যন্ত সন্তানের হাতে আমরা কী তুলে দিতে চাই?
শুধু একটি সার্টিফিকেট?
নাকি এমন একটি বিবেক, যা কঠিন সময়ে তাকে ঠিক আর ভুলের পার্থক্য বুঝতে শেখাবে?
তাহলে আমরা এত বছর ধরে পড়াশোনা করে আসলে কী শিখলাম?
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।