মানুষ কেন দুঃখ লুকায়
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী | জানুয়ারি ২৮, ২০২৬
গত সপ্তাহে এক বন্ধু ফোন করেছিল। দু-তিন মাস পর কথা। জিজ্ঞেস করল, "কেমন আছিস?"
আমি বললাম, "ভালো। তুই বল?"
সেও বলল, "হ্যাঁ, ভালো আছি।"
কথা শেষ। ফোন রেখে দিলাম। কিন্তু মনে হলো—আমরা দুজনেই মিথ্যে বললাম। এই "ভালো আছি"টা আসলে কী?
একটা অভ্যাস?
নাকি আত্মরক্ষার হাতিয়ার?
মানুষ মুখ ফুটে সুখ বলে। হাসে,গল্প করে, ছবি তোলে। সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট দেয়—নতুন জায়গায় ঘুরতে গেছি, নতুন কিছু কিনেছি। নিজেকে ঠিক আছে বলে প্রমাণ করার একটা তাগিদ থাকে সবসময়।
দুঃখ বলা এত সহজ নয়। যতক্ষণ না কেউ খুব গভীর আগ্রহ নিয়ে জানতে চায়—"সত্যি করে বলো, কেমন আছো?" ততক্ষণ মানুষ চুপ থাকে।
এটাই তো আসল কথা। সুখ বললে কেউ কিছু বলে না। কিন্তু দুঃখ বললে?
"এটা তো এমন কিছু না।"
"সবাই এরকম সময় পার করে।"
"তোমার সমস্যা তো আসলে ছোট।"
এই কথাগুলো শুনে শুনে মানুষ শিখে যায়—চুপ থাকাই ভালো। দুঃখ তখন আর কথা হয় না, হয়ে যায় একটা লজ্জার বিষয়। মনে হয়, আমি দুর্বল। আমার সহ্যক্ষমতা কম।
আমার এক সহকর্মী ছিল। খুব হাসিখুশি টাইপ। অফিসে সবসময় জোকস করত, সবার সাথে মিশত। একদিন হঠাৎ শুনলাম, সে বাসায় একা একা কাঁদে। বছরখানেক ধরে ডিপ্রেশনে ভুগছিল। কেউ জানত না। কারণ সে কাউকে বলেনি। বলতে পারেনি।
কেন পারেনি? কারণ সে নিশ্চিত ছিল না—কেউ তার কথা সত্যি শুনবে কিনা।
কেউ যদি মাঝপথে কথা কাটে, ফোন দেখে, বা নিজের গল্প শুরু করে দেয়—মানুষ তখন আর দুঃখ প্রকাশ করতে চায় না। বুঝে ফেলে, এখানে কথা বলে লাভ নেই।
আমি নিজেও অনেক সময় ঠিকমতো শুনি না। মনে মনে ভাবি—এর সমাধান কী হতে পারে। অথচ সামনের মানুষটা হয়তো সমাধান চায় না। শুধু কথাগুলো বলতে চায়।
দুঃখ শোনার জন্য বড় কিছু করতে হয় না। একটু ধীর হতে হয়, সময় দিতে হয়। চোখে চোখ রাখতে হয়। বিচার না করে, উপদেশ না দিয়ে, শুধু শুনতে হয়।
কিন্তু আমরা তো এখন আর সময় দিতে পারি না। আমরা ব্যস্ত। আমাদের নিজেদের সমস্যা আছে। অন্যের দুঃখ শুনে আমরাও ভারী হয়ে যাই। তাই আমরা দ্রুত শেষ করতে চাই।
এই কারণেই মানুষ মাঝপথেই থেমে যায়। সে বুঝে ফেলে—এই জায়গাটা নিরাপদ নয়।
এটা আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি। দীর্ঘদিন কোনো কিছু না বলে থাকলে, সেটা ভেতরে পাথরের মতো জমে যায়। তখন আর কথায় বের হতে চায় না। ঘুম আসে না। একটা ক্লান্তি লেগে থাকে সারাদিন। হঠাৎ রাগ হয়, বা মন খুব খারাপ হয়ে যায় কোনো কারণ ছাড়াই।
মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, দুঃখ চেপে রাখলে শরীরেও প্রভাব পড়ে। হরমোনাল ভারসাম্য নষ্ট হয়। মাথাব্যথা, বুকে চাপ, হজমের সমস্যা—এসব দেখা দেয়। তবু মানুষ বলে, "সব ঠিক আছে।"
আর এইটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ যেকোনো কাউকে দুঃখ বলে না। সে খোঁজে—কে তাকে বিচার করবে না। কে তাড়াহুড়ো করবে না। কে সমাধান না দিয়ে শুধু পাশে বসে থাকবে।
আমার মনে আছে, ছোটবেলায় মা কখনও আমার কথা কাটত না। আমি যতক্ষণ বলতাম, ততক্ষণ শুনত। কোনো উপদেশ দিত না, কোনো তুলনা করত না। শুধু শুনত। তাই আমি নির্ভয়ে সব বলতে পারতাম।
এখন আর এরকম মানুষ কম পাওয়া যায়। সবাই জানে, কিন্তু কেউ শোনে না।
আমরা যদি অন্যের জন্য সেই নিরাপদ জায়গা হতে পারি তাহলে অনেক মানুষ হালকা হতে পারত।
প্রশ্নের ভঙ্গি বদলানো যায়। "কেমন আছো?" এর বদলে বলা যায়, "ভেতরে কেমন লাগছে?" বা "তোমাকে একটু ক্লান্ত লাগছে, কিছু বলবে?"
কথার মাঝে না ঢুকে, ফোন সাইলেন্ট করে, একটু বেশি সময় দিয়ে বসে থাকলেই অনেক কিছু খুলে যায়। একটি ছোট বাক্য, "আমি শুনছি," কখনও কখনও অনেক কিছু বদলে দিতে পারে।
মানুষ মুখ ফুটে সুখ বলে, কারণ তা সহজ। মানুষ মুখ ফুটে দুঃখ বলে না, কারণ নিরাপত্তা নেই।
কিন্তু যদি আমরা অন্যের জন্য সেই নিরাপদ জায়গা হতে পারি, যেখানে কেউ চুপচাপ, বিচার ছাড়া শোনে—তাহলে মানুষকে আর দুঃখ বলার জন্য ভীষণ বায়না করতে হবে না।
দুঃখ তখন আর ভার থাকবে না। ধীরে ধীরে হালকা হয়ে আসবে।
আর মানুষ, অল্প হলেও, একটু স্বস্তিতে থাকতে পারবে।
#মানুষকেনদুঃখলুকায় #মানসিকস্বাস্থ্য #দুঃখওসুখ #মানবিকসম্পর্ক #সহানুভূতি #মনকথা #বাংলাব্লগ
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।