সিঁড়ি হও, মালিক নয়
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণমূলক লেখা
১ নভেম্বর ২০২৬
একজন মানুষ প্রতিদিন সকালে বাসে করে অফিসে যান। বাস থেকে নামার পর রাস্তার পাশে এক বৃদ্ধকে বসে থাকতে দেখেন। বৃদ্ধের হাতে একটি পুরোনো ব্যাগ, চোখে ক্লান্তি। লোকটি প্রতিদিনই তাঁকে দেখেন। কোনো দিন তাকান, কোনো দিন পাশ কাটিয়ে চলে যান।
একদিন অফিসে যাওয়ার তাড়া থাকলেও থেমে জিজ্ঞেস করলেন, ‘চাচা, কোথায় যাবেন?’ বৃদ্ধ জানালেন, ছেলের বাসায় যাবেন, কিন্তু ঠিকানা লেখা কাগজটি হারিয়ে ফেলেছেন। লোকটি কিছুক্ষণ সময় নিয়ে তাঁর ছেলের সঙ্গে যোগাযোগের ব্যবস্থা করে দিলেন। তারপর নিজের কাজে চলে গেলেন।
ঘটনাটি খুব বড় কিছু নয়। কোনো পুরস্কার পাওয়ার মতো কাজও নয়। কিন্তু ওই কয়েক মিনিট বৃদ্ধের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তা হয়তো লোকটি কোনো দিন জানতেও পারবেন না।
আমাদের প্রত্যেকের জীবনেই এমন সুযোগ আসে, যখন সামান্য সহযোগিতা অন্য একজনের জন্য বড় উপকার হয়ে উঠতে পারে। একজন তরুণ হয়তো কাজ খুঁজছেন, কিন্তু কোথা থেকে শুরু করবেন বুঝতে পারছেন না। আপনার পরিচিত কোনো প্রতিষ্ঠানে একটি সুযোগ আছে। আপনি তাঁর জীবনবৃত্তান্তটি সঠিক মানুষের কাছে পৌঁছে দিলেন। চাকরিটি তিনি নিজের যোগ্যতায় পেলেন, কিন্তু আপনার ছোট্ট সহযোগিতা তাঁর জীবনের একটি বন্ধ দরজা খুলে দিল।
সিঁড়ির কাজ তো এটাই। নিজে ওপরে ওঠা নয়, অন্য কাউকে একটু ওপরে উঠতে সাহায্য করা।
কিন্তু সাহায্য করার পর আমাদের আচরণ কেমন হওয়া উচিত, সেটাও ভেবে দেখা দরকার। কারণ সব সাহায্য মানুষের উপকার করে না। কিছু সাহায্য একসময় এমন ঋণ হয়ে দাঁড়ায়, যার বোঝা বহন করতে গিয়ে মানুষ নিজের স্বাধীনতাটুকুও হারিয়ে ফেলে।
আমাদের সমাজে এমন অনেক ঘটনা দেখা যায়। একজন বিপদে পড়ে বন্ধুর কাছ থেকে টাকা ধার নিলেন। প্রথম দিকে বন্ধু কোনো তাগাদা দিলেন না। কিন্তু কয়েক মাস পর থেকে প্রতিটি ফোনেই টাকার প্রসঙ্গ উঠতে লাগল। অন্য কোনো কথা বলতে গেলেও পুরোনো ধারটির কথা মনে করিয়ে দেওয়া হলো। একসময় ঋণগ্রহীতা বন্ধুর ফোন ধরতেও অস্বস্তি বোধ করতে শুরু করলেন। টাকাটা ফেরত দেওয়ার দায় তাঁর ছিল, কিন্তু সেই দায়ের সঙ্গে প্রতিদিন অপমানিত হওয়ার শর্ত যুক্ত ছিল না।
আবার কোনো বাবা সন্তানের পড়াশোনার খরচ বহন করেছেন। এটি তাঁর দায়িত্ব ও ভালোবাসার অংশ হতে পারে। কিন্তু পরে সেই খরচের কথা মনে করিয়ে দিয়ে সন্তানের পেশা, বিয়ে কিংবা ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নিজের ইচ্ছামতো নিয়ন্ত্রণ করতে চাইলেন। সন্তান হয়তো নিজের পছন্দের বিষয়ে পড়তে চায়, কিন্তু বাবার কথা, ‘তোমার পেছনে এত টাকা খরচ করেছি, এখন আমার কথার বাইরে যাওয়ার সাহস হয় কী করে?’
এখানে সাহায্য আর অধিকার একাকার হয়ে গেছে। অথচ একজনকে পড়াশোনার সুযোগ করে দেওয়া মানে তার ভবিষ্যৎ নিজের হাতে লিখে দেওয়া নয়। তাকে এগিয়ে যাওয়ার উপায় করে দেওয়া, তার হয়ে সারাজীবনের সিদ্ধান্ত নেওয়া নয়।
কখনো ভাইয়ের বিপদে বোন টাকা দিয়ে সাহায্য করেন। পরে ভাইয়ের সংসারের প্রতিটি সিদ্ধান্তে সেই সাহায্যের হিসাব টেনে আনেন। কখনো কোনো আত্মীয় চাকরির ব্যবস্থা করে দেন, তারপর ধরে নেন, ওই মানুষটির জীবনের সব বিষয়ে তাঁর কথাই শেষ কথা। এমনকি কারও বিপদের সময় পাশে দাঁড়িয়ে পরে অন্যদের সামনে সেই ঘটনা বলে বেড়ানোও একধরনের চাপ তৈরি করে। যিনি সাহায্য পেয়েছেন, তিনি তখন কৃতজ্ঞতার পাশাপাশি লজ্জা ও সংকোচও বহন করেন।
অবশ্য সাহায্য করার অর্থ এই নয় যে পাওনা টাকা ফেরত চাইতে পারবেন না, নিজের কষ্ট বা সীমাবদ্ধতার কথা বলতে পারবেন না। কাউকে সহযোগিতা করে নিজের ক্ষতি মেনে নেওয়াও বাধ্যতামূলক নয়। কিন্তু পাওনা চাওয়া আর কাউকে অপমান করা এক বিষয় নয়। নিজের মতামত জানানো আর অন্যের সিদ্ধান্তের অধিকার কেড়ে নেওয়াও এক বিষয় নয়।
সত্যিকারের সহযোগিতার মধ্যে একটা সম্মানবোধ থাকে। সেখানে সাহায্যকারী নিজেকে বড় করে দেখেন না, আর যিনি সাহায্য পান, তাঁকেও ছোট হতে হয় না। সাহায্যের কথা মনে রেখে কৃতজ্ঞ থাকা ভালো, কিন্তু সেই কৃতজ্ঞতাকে কারও ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার উপায় বানানো ঠিক নয়।
আরেকটি বিষয়ও মনে রাখা দরকার, সবার পক্ষে সব সময় আর্থিক সাহায্য করা সম্ভব নয়। নিজের সংসার, দায়িত্ব, অসুস্থতা কিংবা সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে। তাই অন্যের পাশে দাঁড়ানোর নামে নিজেকে নিঃশেষ করে ফেলা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। কখনো একটি ফোন, একটি পরিচয়, একটি দরকারি তথ্য কিংবা কারও কথা মন দিয়ে শোনাও বড় সহযোগিতা হতে পারে। সাহায্য করার আগে নিজের সামর্থ্য বুঝে নেওয়া জরুরি।
মানুষের জীবনের সব ক্ষত পূরণ করা যায় না। কোনো প্রিয়জন হারানোর শূন্যতা অন্য কেউ মুছে দিতে পারবেন না। বছরের পর বছর জমে থাকা অপমানও একটি ভালো কথায় শেষ হয়ে যায় না। কিন্তু কঠিন সময়ে কেউ পাশে দাঁড়ালে সেই সময়টা কিছুটা সহজ হয়। আর সেই পাশে দাঁড়ানো মানুষটি যদি পরে প্রতিদান দাবি না করেন, তাহলে তাঁর সহযোগিতার মর্যাদা আরও বেড়ে যায়।
একবার নিজের জীবনের কথাও ভাবুন। বিপদের সময় কে আপনার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন? হয়তো তিনি খুব ধনী ছিলেন না, ক্ষমতাবানও ছিলেন না। হয়তো শুধু একটি ফোন করেছিলেন, কোনো প্রয়োজনের সময় সঙ্গে গিয়েছিলেন, কিংবা এমন একজনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন, যাঁর সাহায্যে আপনার সমস্যার সমাধান হয়েছিল। আপনি হয়তো আজও সেই ছোট্ট সহযোগিতার কথা মনে রেখেছেন। কিন্তু তিনি কি কখনো আপনাকে সেটি মনে করিয়ে দিয়ে ছোট করেছেন?
সেদিন রাস্তার পাশে বসে থাকা বৃদ্ধটির কথায় ফিরে আসি। অফিসে যাওয়া মানুষটি হয়তো পরদিনও একই পথে যাবেন। বৃদ্ধকে আবার দেখবেন কি না, জানেন না। তাঁর সঙ্গে আর কোনো দিন দেখা না-ও হতে পারে। কিন্তু সেদিন কয়েক মিনিট সময় দিয়ে তিনি একজন মানুষকে তাঁর ছেলের কাছে পৌঁছানোর পথ করে দিয়েছিলেন।
হয়তো বৃদ্ধ বাড়ি ফিরে ছেলেকে ঘটনাটি বলবেন। হয়তো বলবেন না। তাতে কিছু যায় আসে না। সাহায্যটি তার কাজ করে গেছে।
অন্যের জীবনে সিঁড়ি হয়ে উঠুন, মালিক নয়। কাউকে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিন, কিন্তু তার চলার পথ নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে যাবেন না। কারণ প্রকৃত সাহায্য মানুষকে আপনার ওপর নির্ভরশীল করে রাখে না, বরং একদিন নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সাহস জোগায়।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।