অতিথি এলে বদলে যাওয়া মানুষ
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণমূলক লেখা | ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বাড়িতে অতিথি এলেই আমরা হঠাৎ ভালো মানুষ হয়ে যাই।
দরজায় দাঁড়িয়ে হাসিমুখে বলি, ‘আসেন, আসেন। এতদিন পর এলেন!’
বসে থাকার জন্য ভালো চেয়ারটা এগিয়ে দিই। রান্নাঘরে গিয়ে বলি, ‘ওনার জন্য চা দাও। সঙ্গে কিছু নাশতাও দাও।’
অতিথি একবার পানি চাইলে দুইবার জিজ্ঞেস করি, ‘আর কিছু লাগবে?’
কিন্তু সেই একই বাড়িতে সকাল থেকে যে মানুষটা আমাদের জন্য চা বানিয়েছে, তার কাপটা ঠান্ডা হয়ে পড়ে থাকে।
মা সারাদিন রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে থাকেন। দুপুরে খেতে বসে কেউ হয়তো জিজ্ঞেসও করে না, ‘তুমি খেয়েছ?’
স্ত্রী একসঙ্গে সবার প্লেটে খাবার তুলে দেন। নিজের প্লেটে কী আছে, সেটার দিকে তাকানোর সময়ও হয় না।
বাবা বারান্দায় বসে থাকেন। ছেলে পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বলে, ‘একটু পরে কথা বলছি।’
সেই ‘একটু পরে’ অনেক সময় আর আসে না।
কিন্তু অতিথি এলে আমরা বদলে যাই।
সেদিন বিকেলে রাশেদের বাড়িতে একজন পুরোনো পারিবারিক বন্ধু এলেন। দরজা খোলার পর থেকেই ঘরের পরিবেশ পাল্টে গেল।
রাশেদ হাসিমুখে বলল, ‘চাচা, আসেন। এইদিকে বসেন।’
স্ত্রীকে বলল, ‘দেখো তো, চাচার জন্য চা দাও। আর ফ্রিজে যে মিষ্টি আছে, ওটা বের করো।’
মেয়েকে ডেকে বলল, ‘চাচাকে সালাম করো।’
সবকিছু সুন্দরভাবেই চলছিল।
চাচা হেসে বললেন, ‘তোমাদের বাসায় তো বেশ শান্তি দেখি।’
রাশেদও হেসে বলল, ‘আলহামদুলিল্লাহ, সবাই খুব ভালো আছে।’
ঠিক তখনই রান্নাঘর থেকে স্ত্রী বললেন, ‘চা হয়ে গেছে।’
রাশেদ সবার সামনে বলল, ‘তুমি একটু তাড়াতাড়ি করতে পারো না?’
কথাটা খুব আস্তে বলা হয়নি।
চাচা শুনলেন। স্ত্রীও শুনলেন। মেয়েটা মাথা নিচু করল।
চাচা চলে যাওয়ার পর স্ত্রী আবার রান্নাঘরে ঢুকে গেলেন, যেন কিছুই হয়নি।
অতিথিকে সম্মান করা আমাদের সামাজিক সংস্কৃতিরই অংশ। দূরের মানুষকে স্বাগত জানানো, তার আরাম নিয়ে ভাবা, ভালো খাবার তুলে দেওয়া—এসবের মধ্যে আন্তরিকতাও থাকে।
সমস্যা অন্য জায়গায়।
আমরা অনেক সময় কাছের মানুষকে এতটাই নিশ্চিত ধরে নিই যে তাদের যত্ন নেওয়ার প্রয়োজনটুকু ভুলে যাই।
মা তো আছেনই।
স্ত্রী তো বুঝবেই।
স্বামী তো কোথাও যাবে না।
বাবা তো অপেক্ষা করতেই পারেন।
সন্তান তো নিজের মানুষ।
এই ‘নিজের মানুষ’ কথাটার ভেতরেই কখনো কখনো অবহেলা লুকিয়ে থাকে।
অতিথির সামনে আমরা নিজের আচরণ সম্পর্কে সচেতন থাকি। কারণ তিনি আমাদের আচরণ দেখছেন। আমাদের সম্পর্কে একটি ধারণা তৈরি করবেন। কিন্তু পরিবারের মানুষ আমাদের প্রতিদিন দেখে। তাদের সামনে নিজের রাগ, বিরক্তি, ক্লান্তি সবকিছুই সহজে বেরিয়ে আসে।
যাকে হারানোর ভয় কম, তার কাছেই আমরা অনেক সময় সবচেয়ে অসাবধান হয়ে যাই।
অথচ সম্পর্কের আসল পরীক্ষা অতিথি এলে হয় না।
হয় অতিথি চলে যাওয়ার পর।
রাতের খাবার শেষে মা যখন একা থালা ধুতে দাঁড়ান, তখন কেউ পাশে যায় কি না।
স্ত্রী সারাদিনের কাজ শেষে চুপ করে বসে থাকলে কেউ খেয়াল করে কি না।
বাবা একই কথা দ্বিতীয়বার বললে বিরক্ত না হয়ে কেউ আবার শোনে কি না।
সন্তান ভুল করলে শুধু বকা না দিয়ে কেউ তার মুখের দিকে তাকায় কি না।
এসবের জন্য আলাদা কোনো আয়োজন লাগে না। লাগে শুধু মানুষটাকে নিজের মানুষ বলে ধরে নেওয়ার পাশাপাশি মানুষ হিসেবেও দেখা।
অতিথি এলে আমরা ঘর গুছিয়ে নিই, ভালো কাপ-প্লেট বের করি, মুখে হাসি রাখি।
অতিথি চলে গেলে দরজা বন্ধ হয়ে যায়।
হাসিটাও মুখ থেকে সরে যায়।
টেবিলে পড়ে থাকে ঠান্ডা হয়ে যাওয়া চায়ের কাপটা।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।