জেনারেশন-জেড
লেখকঃ মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
লেখার ধরনঃ বিশ্লেষণধর্মী
তারিখঃ ২২ অক্টোবর ২০২৫
‘জেনারেশন-জেড’ — সংক্ষেপে ‘জেন জি’ — আজকের সামাজিক মাধ্যম ও সংবাদমাধ্যমে আলোচনার এক ঘোর আলো। আন্তর্জাতিক সংবাদকিতাবেও এই প্রজন্ম নিয়ে নানা কথা শোনা যায়। আসুন, সংক্ষিপ্তভাবে জানি এ জেনারেশন-জেড কে এবং কেন তারা আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
ডিজিটাল বিশ্বের কোল থেকে উঠে আসা এই তরুণ প্রজন্ম সামাজিক ন্যায়বিচার, পরিবেশ আন্দোলন—এসব মধ্য দিয়ে সক্রিয়। একই সঙ্গে তারা নতুন কাজের ক্ষেত্র, উদ্ভাবনী ধারায় সচেতন। তাদের চিন্তা, আচরণ ও জীবনযাপন প্রথাগত প্রজন্মের চেয়ে অনেকটাই আলাদা; গবেষকরা বলছেন, তারা চিন্তাশীল, সহানুভূতিশীল এবং পরিশ্রমী।
বাংলাদেশে নতুন প্রজন্মের তরুণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলন এদেশকে নতুনভাবে জীবন্ত করেছে; এক ধরনের নবস্বাধীনতার সেতু গড়েছে। নতুন সূচনা ঘটছে—দেশকে নতুনভাবে সাজানোর প্রক্রিয়া এগোচ্ছে—যার নেতৃত্ব দিচ্ছে তরুণ সমাজ। তাই, অনলাইনে তাদের চিন্তা-ভাবনা প্রশংসা জোগায়; বিশ্বমঞ্চেও তাদের পরিচিতি ছড়িয়েছে। কেন না—তারা ডিজিটাল যুগে বেড়ে উঠেছে, ঘরে বসে গোটা বিশ্বকে দেখেছে; তাদের মননে বিশ্বজয়ের স্বপ্ন ধরেছে।
অনেকের কাছে ‘জেন জেড’ অপরিচিত নাম হতে পারে; কিন্তু সংজ্ঞা যত সহজ—যারা ১৯৯০-এর দশলের শেষ দিক থেকে ২০০০-এর দশকের গোড়া বা বিশেষভাবে ১৯৯৭ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে জন্মেছেন, তাদের বলা হয় জেনারেশন-জেড। অর্থাৎ আজকের দিনে তাদের বয়স প্রায় ১২ থেকে ২৭ বছরের মধ্যে পড়ে। কিছু গবেষণা ও সংবাদ সূত্র এদের বয়সসীমা সামান্য ভিন্ন রেখেছে; তবু মূলত বলা হয়ে থাকে—এরা ডিজিটাল প্রজন্ম, ইন্টারনেট-সহজলভ্যতায় বড় হয়েছে। স্মার্টফোন, স্মার্টওয়াচ—এসব গ্যাজেট তাদের শৈশব ও কিশোর বয়সেই স্বাভাবিক ছিল; সামাজিক মিডিয়া তাদের জীবনের অবিস্মরণীয় অংশ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জেন-জির ছেলে-মেয়ে আধুনিক মানসিকতায় বড় হচ্ছে। ধর্মীয় বা প্রথাগত রীতিনীতির প্রতি তারা অতটা আকৃষ্ট নয়; বরং তথ্য-যোগাযোগ প্রযুক্তির মাধ্যমে বিশ্বে যুক্ত থাকার পরিতোষ তাদের বেশি আবেদন করে। ফেসবুক ও ইমেইলের স্থলে তারা ইনস্টাগ্রাম ও ইউটিউবকে বেশি পছন্দ করে; অনলাইনে কেনাকাটা, ক্লাস, আড্ডা, গেমিং—প্রায় সবকিছুই তারা অনলাইনে করে। এ কারণে তাদের ‘ইন্টারনেট প্রজন্ম’ও বলা হয়।
জেনারেশন-জেডকে প্রায় সর্বজনস্বীকৃতভাবে ‘অতীব বৈচিত্র্যময়’ প্রজন্ম বলা হয়। তাদের বেড়ে ওঠার পরিবেশে একক বাবা-মা, জাতিগত মিশ্র পরিবার—এসব স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে দেখা যায়; আইনগতভাবে ও সামাজিকভাবে তাদের নানাবিধ পরিচয় স্বীকৃত। ২০১৮ সালের এক গবেষণার উদ্ধৃতিতে ব্রিটানিকা জানায়—জেন জেড-এরওদের মধ্যে বিবাহে দেরি করা দেখা যায়; এ প্রজন্মের মাত্র একটি আলোকচিত্রে দেখা গেছে কেবল ৪ শতাংশ ২১ বছর বয়সের মধ্যে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়—যতটা ছিল মিলেনিয়ালদের তুলনায় তা প্রায় অর্ধেকই।
রিপোর্টগুলো বলছে, জেন জেড আগের প্রজন্মের তুলনায় বেশি বাস্তববাদী, দ্রুত পরিপক্ক হয় এবং উচ্চশিক্ষার প্রতি উৎসাহী। তারা ক্যারিয়ার নির্ধারণে বেশি সচেতন; একই সঙ্গে আশাবাদী—নিজেদের ভবিষ্যত বড়ভাবে কল্পনা করতে ভালোবাসে এবং সৃজনশীলতাকে উচ্চতম গুরুত্ব দেয়। তারা নতুন কিছু সৃষ্টি করতে কোনোমতেই দ্বিধাবোধ করে না।
জেন–জির অনেকেই রেস্টুরেন্ট-প্রেমী; ভারতীয়, জাপানিজ, ফরাসি, ইতালীয়, রাশিয়ান বা আমেরিকান—রুচির সীমা তাদের কাছে বিস্তৃত। ফাস্ট-ফুড সংস্কৃতিও তাদের হাত ধরে বদলে গেছে; ফুডকোর্ট ও মিনি-ফুডকোর্টের সংখ্যা বেড়ে উঠছে। সিনেমার স্বাদেও তারা বৈচিত্র্য খোঁজে—হলিউড-বলিউড ছাড়িয়ে কোরিয়ান, জাপানিজ, চাইনিজ, নেপালি, মালায়ালম সহ নানা ধারার সিনেমা গ্রহণ করেছে; বাংলা আর্ট-ফিল্মকেও তারা নতুন জীবন দিচ্ছে।
টেকনোলজি—তারা শুধু গ্যাজেটপাগল নয়; মোবাইল ক্যামেরা দিয়ে শর্টফিল্ম, ভ্লগ, কনটেন্ট ক্রিয়েশন—এসব তাদের স্বাভাবিক কর্মচারি। গুগল ম্যাপ, নোট অ্যাপ, নেভিগেশন, লাইভ স্ট্রিম—এগুলো তাদের দৈনন্দিন কাজে পরিণত হয়েছে।
নিচে—জেন–জির মুখে মুখে ঘুরপাক খাওয়া কিছু শব্দের সহজ ব্যাখ্যা:
অরা (Aura) — ব্যক্তিত্বের এক ধরনের পরিমাপক; কতোটা কুল বা কতোটা আনকুল, তা বোঝাতে।
বেইজড (Based) — নিজ অবস্থানে অবিচল থাকা; অন্যের ভাবনা নিয়ে অত-বিচলিত না হওয়া।
ব্রাহ্ (Bruh) — হতাশা, শক বা বিব্রতবোধ প্রকাশের শব্দ।
বাসিন (Bussin) — খুব ভালো; কিছু তীব্রভাবে প্রশংসা করার জন্য ব্যবহৃত।
ক্যাপ (Cap) — মিথ্যা; “ক্যাপ” বললে বোঝায় কেউ মিথ্যে বলছে।
কুক (Cook) — এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করা যেখানে প্রতিপক্ষ বিব্রত হয়; চালাকি বা ষড়যন্ত্রের অর্থে।
ডেলুলু (Delulu) — অসম্ভব বা আকাশকুসুম প্রত্যাশা; বিশেষত সম্পর্কের ক্ষেত্রে ব্যবহার।
ড্রিপ (Drip) — ট্রেন্ডি, উচ্চমানের ফ্যাশন।
ফ্লেক্স (Flex) — ভাব দেখানো, প্রফুল্ল আত্মপ্রদর্শন।
গ্লো-আপ (Glow-Up) — স্পষ্ট উন্নতি বা রুপান্তর।
গোট (GOAT) — ‘সর্বকালের সেরা’।
লিট (Lit) — মজাদার, দারুণ বা কুল।
ওকে বুমার (OK Boomer) — বেবি-বুমার প্রজন্মের বিরুদ্ধাচরণ নির্দেশ করা অনৈতিহাসিক বা গোঁড়া মতবাদের প্রতি হাস্যরসাত্মক প্রতিক্রিয়া।
পুকি (Pookie) — আদরের মানুষের বলেনি একটা স্নিগ্ধ ডাকনাম।
রেড ফ্ল্যাগ (Red flag) — সম্পর্ক বা আচরণে বিপৎসংকেত।
রিজ (Rizz) — আকর্ষণশক্তি, কেরিশ্মা।
সিম্প (Simp) — কারো কাছে অযথা দুর্বল হয়ে পড়া।
স্কিবিডি (Skibidi) — অতিরঞ্জিত বা হাস্যকর কিছু।
সাস (Sus) — সন্দেহজনক।
টি (Tea) — গসিপ বা পরচর্চা।
শেষে আমার আর আমাদের এক ক্ষুদ্র প্রত্যাশা থাকবে—তুমি কি নতুনভাবে ভাববে, জেন জি? পরম সত্য ভেঙে নতুন কিছু আনো। পৃথিবী বদলাতে চাও; চলো, সেই ইচ্ছেটাই রং তুলিকায় রাক্ষসী করে তুলো।
ধন্যবাদ সবাইকে।
তথ্যসূত্র:
কালের কণ্ঠ অনলাইন (০১ অক্টোবর ২০১৭), সময় নিউজ (০৬ মে ২০২৪), ঢাকাটাইমস (১৭ আগস্ট ২০২৪)
#GenZ #DigitalGeneration #YouthRevolution #NewBangladesh #TechDrivenYouth #তরুণপ্রজন্ম #নতুনচিন্তা #ভবিষ্যতেরনেতা
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।