এত অহংকার কিসের?
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণমূলক লেখা
| ২৮ অক্টোবর ২০২৬
রহমান সাহেবের ঘরের দেয়ালে চারটি পুরোনো ছবি টাঙানো। দাদা, দাদি, বাবা আর মায়ের ছবি। প্রতিদিন সকালে ঘর থেকে বের হওয়ার সময় ছবিগুলোর সামনে দিয়ে যান তিনি। কোনো দিন চোখ পড়ে, কোনো দিন পড়ে না। অথচ এক সকালে অফিসে যাওয়ার আগে ছবিগুলোর দিকে তাকিয়ে তিনি হঠাৎ থেমে গেলেন।
যাঁদের মুখ ছবির ভেতরে আটকে আছে, একসময় তাঁরাও কত কিছু নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন! কারও জমিজমা ছিল, কারও ব্যবসা, কারও সংসার সামলানোর দুশ্চিন্তা। হয়তো তাঁদেরও মনে হতো, তাঁদের ছাড়া পরিবারের কিছুই চলবে না। তাঁদের সিদ্ধান্তে ঘরের মানুষ চলত, তাঁদের কথায় অনেক কাজ থেমে যেত। আজ তাঁরা নেই। তাঁদের ঘর আছে, উত্তরাধিকারীরা আছে, তাঁদের রেখে যাওয়া সম্পদও হয়তো আছে। শুধু তাঁরা নেই।
পৃথিবী কিন্তু থেমে থাকেনি।
রহমান সাহেবের মনে হলো, একদিন তাঁর ছবিটাও হয়তো এই দেয়ালে ঝুলবে। তখন তাঁর চেয়ারটিতে অন্য কেউ বসবে, তাঁর কাজগুলো অন্য কেউ করবে, তাঁর অসমাপ্ত কথাগুলোও সময়ের সঙ্গে হারিয়ে যাবে। অথচ আজ তিনি এমনভাবে চলেন, যেন তাঁর অনুপস্থিতিতে সবকিছু অচল হয়ে পড়বে।
আমাদের অনেকের জীবনেও এই অহংকারটা নীরবে বাসা বাঁধে। আমরা ভাবতে শুরু করি, আমাদের যোগ্যতা, অর্থ, পদ কিংবা প্রভাবই আমাদের আলাদা করে তুলেছে। নিজের গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে ভুলে যাই, এই গুরুত্বের পেছনেও কত মানুষের অবদান রয়েছে।
নিজের বলে কতটুকু?
একবার নিজের জীবনের শুরুটা ভাবুন। জন্ম নেওয়ার সিদ্ধান্ত আমরা নিইনি। বাবা-মা আমাদের পৃথিবীতে এনেছেন। নাম রেখেছেন অন্য কেউ। প্রথম হাঁটতে শেখার সময় কেউ হাত বাড়িয়ে দিয়েছে, কথা বলতে শেখার সময় কেউ শব্দগুলো বুঝিয়েছে। স্কুলে শিক্ষক পড়িয়েছেন, জীবনের পথে কেউ ভুল ধরিয়ে দিয়েছেন, কেউ সুযোগ দিয়েছেন, কেউ বিপদের সময় পাশে দাঁড়িয়েছেন।
আজ যে মানুষ নিজের যোগ্যতা নিয়ে গর্ব করেন, তাঁর যোগ্যতা গড়ে ওঠার পেছনেও অন্য মানুষের শ্রম আছে। তাঁর সাফল্যের পেছনে হয়তো এমন কারও অবদান রয়েছে, যার নাম কোনো দিন কোথাও লেখা হবে না।
এমনকি আমরা যে ভাষায় নিজের সাফল্যের গল্প বলি, সেই ভাষাটাও তো নিজের হাতে তৈরি করিনি।
তাহলে নিজের বলে আসলে কী আছে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে নিজের অর্জনকে অস্বীকার করার দরকার নেই। পরিশ্রমের মূল্য আছে, মেধার মূল্য আছে, নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারও আছে। কিন্তু নিজের অর্জনকে একমাত্র নিজের কৃতিত্ব মনে করাই ভুল। মানুষ নিজের চেষ্টা দিয়ে অনেক দূর যেতে পারে, কিন্তু একা শূন্য থেকে নিজের পুরো পৃথিবী তৈরি করতে পারে না।
অহংকারের সমস্যা সেখানেই। এটি মানুষকে নিজের অর্জন দেখায়, কিন্তু সেই অর্জনের পেছনে থাকা অসংখ্য হাত আড়াল করে দেয়।
পৃথিবী কারও জন্য থামে না
কোনো প্রতিষ্ঠানের একজন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা অবসরে গেলে প্রথম কয়েক দিন তাঁকে নিয়ে আলোচনা হয়। তাঁর অভিজ্ঞতার কথা ওঠে, তাঁর কাজের স্মৃতি ফিরে আসে। তারপর ধীরে ধীরে নতুন কর্মকর্তা দায়িত্ব নেন। ফাইল জমে থাকে না, সভা বন্ধ হয় না, কাজের গতি আবার স্বাভাবিক হয়ে আসে।
একই ঘটনা পরিবারেও ঘটে। যে মানুষটি সংসারের সব সিদ্ধান্ত নিতেন, একসময় তাঁকেও অন্যের ওপর নির্ভর করতে হয়। যাঁর কথায় সবাই চুপ হয়ে যেত, তাঁর কথাও একদিন ঘরের নিস্তব্ধতায় হারিয়ে যায়।
এতে মানুষের মূল্য কমে যায় না। বরং বোঝা যায়, পৃথিবী কোনো একজনের উপস্থিতির ওপর নির্ভর করে তৈরি হয়নি।
তবু আমরা এমনভাবে আচরণ করি, যেন আমাদের ছাড়া সবকিছু ভেঙে পড়বে। পরিবারের কেউ আমাদের মতের বিরোধিতা করলে মনে হয়, সে আমাদের অসম্মান করেছে। কর্মক্ষেত্রে আমাদের সিদ্ধান্ত না মানলে মনে হয়, আমাদের গুরুত্ব কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে। সন্তান নিজের মতো করে জীবন গড়তে চাইলে আমরা কখনো কখনো সেটাকেও নিজের কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ বলে ধরে নিই।
অথচ মানুষকে ভালোবাসা আর মানুষকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখা এক বিষয় নয়। কারও জীবনে গুরুত্বপূর্ণ হওয়া আর তার জীবনের মালিক হয়ে যাওয়াও এক কথা নয়।
পৃথিবী আমাদের ছাড়াও চলবে—এই সত্য মেনে নেওয়া অপমানের কিছু নয়। বরং এই উপলব্ধি মানুষকে অন্যের স্বাধীনতা সম্মান করতে শেখায়।
পেট ভরে, চাওয়া ভরে না
একটি পাখির দিনের কথা ভাবুন। খাবার খুঁজে, বাসায় ফিরে, বাচ্চাদের খাইয়ে সে দিনের কাজ শেষ করে। তার জীবনেও অভাব আছে, বিপদ আছে, ক্ষুধা আছে। খাদ্য না পেলে অন্য প্রাণীর মতো পাখিটিও দুর্বল হয়ে পড়ে, কখনো মারাও যায়। তাই প্রাণীদের জীবনকে কষ্টহীন বলা যায় না।
তবে মানুষের চাহিদার একটি জটিল দিক আছে। মানুষ শুধু বেঁচে থাকার জন্য খাবার চায় না; অনেক সময় অন্যের চেয়ে ভালো খাবার, বড় বাড়ি, দামি পোশাক কিংবা বেশি সম্পদ পাওয়ার আকাঙ্ক্ষাও তাকে তাড়িয়ে নিয়ে যায়। প্রয়োজন মিটে যাওয়ার পরও চাওয়া থামে না।
যে মানুষ একসময় একটি ঘরের স্বপ্ন দেখতেন, ঘর পাওয়ার পর তাঁর মনে হয়, আরেকটি বাড়ি দরকার। যে একসময় সম্মান পাওয়ার জন্য পরিশ্রম করতেন, সম্মান পাওয়ার পর আরও বড় পরিচয়ের পেছনে ছোটেন। যে অর্থ একসময় নিরাপত্তা দেওয়ার কথা ছিল, সেই অর্থই কখনো কখনো নতুন ভয়ের জন্ম দেয়—আরও না জমাতে পারলে যদি পিছিয়ে পড়তে হয়!
এখানে অর্থ বা উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিজে অপরাধ নয়। সমস্যা তৈরি হয় তখন, যখন মানুষের চাওয়া তার প্রয়োজনকে ছাড়িয়ে গিয়ে তার শান্তি, সম্পর্ক এবং বিবেকের ওপর কর্তৃত্ব করতে শুরু করে।
পেট ভরে গেলে মানুষ খাওয়া বন্ধ করতে পারে। কিন্তু তুলনার ক্ষুধার কোনো নির্দিষ্ট সীমা নেই। কারণ এই ক্ষুধা খাবার দিয়ে মেটে না; মেটে অন্যের চেয়ে এগিয়ে থাকার অনুভূতি দিয়ে। আর পৃথিবীতে সব সময়ই কেউ না কেউ এগিয়ে থাকবে।
তাই যে মানুষ নিজের সুখের মাপকাঠি অন্যের অবস্থানের সঙ্গে বেঁধে রাখেন, তাঁর তৃপ্তি পাওয়া কঠিন।
শেষ পথটুকু
জীবনের শেষ যাত্রায় মানুষকে অন্যের সাহায্য নিতে হয়। যে শরীর নিয়ে এত গর্ব, যে সম্পদের জন্য এত দৌড়ঝাঁপ, যে পরিচয়কে আঁকড়ে ধরে এত বিরোধ—একসময় সেসবের কোনোটিই তাকে মৃত্যুর হাত থেকে ফিরিয়ে আনতে পারে না। শেষ বিদায়ের পথেও অন্য মানুষই পাশে থাকে।
এই সত্য মনে রাখার অর্থ জীবনকে অর্থহীন ভাবা নয়। বরং জীবনের সীমা জানা বলেই এর ভেতরের সময়টুকুকে অর্থপূর্ণ করে তোলা জরুরি।
রহমান সাহেব সেদিন অফিসে যাওয়ার আগে আবার ছবিগুলোর দিকে তাকালেন। তাঁর দাদার ছবির নিচে ছোট্ট একটি কাঠের তাক। সেখানে কয়েকটি পুরোনো বই, একটি ভাঙা ঘড়ি আর বাবার ব্যবহার করা চশমা রাখা আছে। একসময় এসব জিনিস ছিল দৈনন্দিন জীবনের অংশ। এখন এগুলো স্মৃতি।
তিনি জানতেন, তাঁরও একদিন চলে যেতে হবে। তাঁর জায়গায় অন্য কেউ আসবে। তাঁর সিদ্ধান্তগুলো নিয়ে হয়তো কেউ দ্বিমত করবে, তাঁর রেখে যাওয়া কিছু কাজ বদলে যাবে, কিছু জিনিস হারিয়ে যাবে। পৃথিবী তার নিজের নিয়মে চলবে।
সেদিন তিনি অফিসে গিয়ে নিজের পদমর্যাদা কমিয়ে দেখেননি, কাজের গুরুত্বও অস্বীকার করেননি। শুধু সহকর্মীর একটি ভুলের জন্য তাকে সবার সামনে অপমান করতে গিয়েও থেমে গিয়েছিলেন। যে মানুষটিকে এত দিন নিজের অধীনস্থ বলে দেখেছেন, তারও যে নিজের সম্মান নিয়ে বাঁচার অধিকার আছে, কথাটা হঠাৎ নতুন করে মনে পড়েছিল।
মানুষের অহংকার ভাঙতে সব সময় বড় কোনো বিপর্যয় লাগে না। কখনো দেয়ালে টাঙানো কয়েকটি পুরোনো ছবিই যথেষ্ট।
আমরা কেউ নিজের জন্মের ব্যবস্থা করিনি, নিজের বিদায়ের সময়ও ঠিক করতে পারব না। মাঝখানের এই অল্প সময়ে যা অর্জন করি, তার কিছু আমাদের পরিশ্রমের ফল, কিছু অন্যের অবদান, আর কিছু এমন সুযোগের ফল, যা আমরা নিজেরা তৈরি করিনি।
তাই সাফল্য নিয়ে গর্ব থাকতে পারে, কিন্তু সেই গর্ব যেন অন্য মানুষকে ছোট করার কারণ না হয়। নিজের অবস্থান নিয়ে আত্মবিশ্বাস থাকতে পারে, কিন্তু সেই আত্মবিশ্বাস যেন আমাদের ভুলিয়ে না দেয়—সময় বদলালে আমাদের চেয়ারেও অন্য কেউ বসবে।
দেয়ালে টাঙানো ছবিগুলো প্রতিদিন একই জায়গায় থাকে। বদলে যাই আমরা, বদলে যায় আমাদের ব্যস্ততা, বদলে যায় আমাদের গুরুত্বের হিসাব।
একদিন আমাদের ছবিও সেখানে থাকবে।
তখন হয়তো ঘরের কেউ ছবিটার দিকে তাকিয়ে ভাববে, মানুষটা একসময় কত কিছু নিয়ে ব্যস্ত ছিল!
কিন্তু এত কিছুর মধ্যে কতটুকু সে সত্যিই নিজের সঙ্গে নিয়ে যেতে পেরেছিল?
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।