আপনি আগের মতো নেই
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণমূলক লেখা
৩১ অক্টোবর ২০২৬
একজন মানুষ বছরের পর বছর আপনার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করল। কখনো কথায় অপমান করল, কখনো আপনার প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিল না, কখনো নিজের সুবিধার জন্য আপনার নীরবতাকে ব্যবহার করল। আপনি সম্পর্কের কথা ভেবে চুপ থাকলেন। ভাবলেন, কথা বাড়িয়ে লাভ কী! একদিন হয়তো মানুষটি নিজের ভুল বুঝবে।
কিন্তু একদিন আপনি আর চুপ থাকলেন না। খুব বেশি কিছু বলেননি। শুধু জানিয়ে দিলেন, এভাবে আর অপমান সহ্য করবেন না। নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে চান। নিজের প্রাপ্যটুকু বুঝে নিতে চান।
ব্যস, সেদিন থেকেই আপনার পরিচয় বদলে গেল।
যিনি এত দিন আপনার নীরবতাকে স্বাভাবিক মনে করতেন, তিনিই বলতে শুরু করলেন, আপনি আগের মতো নেই। আপনার ব্যবহার বদলে গেছে। আপনার মধ্যে অহংকার এসেছে। কেউ হয়তো বলবেন, আপনি অকৃতজ্ঞ। কেউ মনে করিয়ে দেবেন, অতীতে আপনার জন্য তিনি কত কিছু করেছেন।
অথচ কেউ একবারও জানতে চাইবেন না, এত দিন আপনি কী কী সহ্য করেছেন।
মানুষের সম্পর্কের একটি অদ্ভুত দিক আছে। কেউ যদি আপনার কাছ থেকে সব সময় সুবিধা পেতে অভ্যস্ত হয়ে যায়, তাহলে সেই সুবিধা বন্ধ হওয়াকে সে অনেক সময় অন্যায় মনে করে। আপনার সময়, শ্রম, অর্থ কিংবা মানসিক সমর্থন পেয়ে পেয়ে একসময় সেগুলো তার কাছে স্বাভাবিক অধিকার হয়ে দাঁড়ায়। আপনি দিতে না চাইলে তার চোখে আপনিই স্বার্থপর।
পরিবারেও এমন ঘটনা ঘটে। পরিবারের একজন সদস্য সবার প্রয়োজনে ছুটে যান। নিজের কাজ ফেলে অন্যের কাজ করেন। নিজের অসুবিধার কথা বলেন না। একদিন তিনি নিজের প্রয়োজনের কথা জানালে প্রশ্ন ওঠে, “এত হিসাব আগে তো করতে না!”
বন্ধুত্বেও একই চিত্র দেখা যায়। একজন বন্ধু সব সময় খোঁজ নেন, বিপদে পাশে দাঁড়ান, প্রয়োজনে অর্থ ধার দেন। কিন্তু একদিন নিজের সমস্যার কারণে সাহায্য করতে না পারলে তাঁর আন্তরিকতা নিয়েই প্রশ্ন ওঠে।
এখানে সমস্যাটা শুধু অন্য মানুষের আচরণে নয়, আমাদের নীরবতার অভ্যাসেও কিছুটা জড়িয়ে থাকে। আমরা অনেক সময় সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার জন্য নিজের কষ্ট লুকাই। অন্যের মন খারাপ হবে ভেবে নিজের আপত্তি জানাই না। অসম্মানকে এড়িয়ে যাই, অন্যায়কে ছোট করে দেখি। ভাবি, প্রতিবাদ করলে সম্পর্ক নষ্ট হবে।
কিন্তু বারবার চুপ থাকার ফলে অন্য মানুষটি হয়তো বুঝতেই পারে না যে তার আচরণ আপনাকে কষ্ট দিচ্ছে। আবার কেউ কেউ বুঝেও সেই সুযোগ নেয়। দুই ক্ষেত্রেই নীরবতা দীর্ঘ হলে সম্পর্কের ভারসাম্য নষ্ট হয়।
নিজের অধিকার নিয়ে কথা বলা অহংকার নয়। কাউকে অসম্মান না করে নিজের সীমা নির্ধারণ করা অসভ্যতা নয়। সব অনুরোধে সম্মতি দেওয়া যেমন ভালো মানুষের পরিচয় নয়, তেমনি প্রতিটি বিষয়ে বিরোধিতা করাও আত্মসম্মানের প্রমাণ নয়। প্রয়োজন হলো কোথায় সম্মতি দেবেন, আর কোথায় নিজের অবস্থান পরিষ্কার করবেন, তা বুঝতে শেখা।
তবে প্রতিবাদের ভাষাটিও গুরুত্বপূর্ণ। নিজের অধিকার চাইতে গিয়ে অন্যের অধিকার অস্বীকার করা যায় না। অতীতের সব উপকার অস্বীকার করে কাউকে ছোট করাও ঠিক নয়। কৃতজ্ঞতা থাকতে পারে, কিন্তু কৃতজ্ঞতার অর্থ এই নয় যে সারাজীবন অপমান সহ্য করতে হবে।
একটি সম্পর্ক তখনই সুন্দর থাকে, যখন সেখানে দুজনের কথার মূল্য থাকে। একজন শুধু বলবেন, আর অন্যজন শুধু মেনে নেবেন, সেটি পারস্পরিক সম্পর্ক নয়। সেখানে ভালোবাসার চেয়ে অভ্যাস এবং সম্মানের চেয়ে নিয়ন্ত্রণ বড় হয়ে ওঠে।
যারা আপনার নীরবতাকে নিজের অধিকার ভেবে নিয়েছিল, তাদের কাছে আপনার প্রতিবাদ অন্যায় মনে হতেই পারে। কিন্তু নিজের সম্মান রক্ষার জন্য সবার অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন নেই।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।