হাসপাতালের করিডোর
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প। ২৭ জুন, ২০২৬
ডাক্তারের কথাটা শুনে অভিক শুধু মাথা নাড়ল। কাঁদার সময় নেই এখন। আগে টাকার একটা ব্যবস্থা করা দরকার।
ডাক্তার প্রেসক্রিপশনটা এগিয়ে দিলেন। “অপারেশনটা যত তাড়াতাড়ি করা যায়, তত ভালো। দেরি করলে ঝুঁকি বাড়তে পারে।”
অভিক একটু থেমে জিজ্ঞেস করল, “কত লাগবে?”
ডাক্তার অঙ্কটা বললেন। তারপরের কথাগুলো আর কানে ঢুকল না ঠিক। কেমন ঝাপসা লাগল সব।
করিডোরে বেরিয়ে সে একটা বেঞ্চে বসে পড়ল। পাশের দেয়ালে লাগানো নোটিশে লেখা, ‘দয়া করে নীরবতা বজায় রাখুন’। নিশি এসে পাশে দাঁড়াল। “কী বললেন?”
অভিক অনেকক্ষণ মেঝের দিকে তাকিয়ে রইল। ফ্লোরে ফিনাইলের গন্ধ, পায়ের ছাপ। তারপর বলল, “আমাদের যা আছে... তাতে কুলোবে না, মনে হয়।”
নিশি চুপ করে রইল।
হাসপাতালের করিডোরে তখন আগের মতোই ব্যস্ততা। কেউ স্ট্রেচার ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে, চাকায় ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ। কেউ রিপোর্ট হাতে দৌড়াচ্ছে। কেউ ফোনে নিচু গলায় বলছে, “আরও টাকা লাগবে।”
অভিকের মনে হলো, এখানে সবার মুখ আলাদা হতে পারে, কিন্তু দুশ্চিন্তাটা যেন একই রকম।
সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে সে পুরোনো একটা খাতা বের করল। মলাটটা ছিঁড়ে গেছে এক কোণায়।
ব্যাংকে কত আছে।
কার কাছে কত ধার।
আর কত জোগাড় করা যাবে।
বারবার হিসাব করল। কিছুতেই অঙ্কটা মেলে না। কলমটা রেখে খাতাটা বন্ধ করে দিল। নিশি পাশে বসে ছিল।
অভিক বলল, “আর কাউকে ফোন করব না।”
“কেন?”
“কতবার বলব? সবাই তো একবার না একবার সাহায্য করেছে।”
নিশি আর কিছু বলল না। জানালার বাইরে তখন নিয়ন আলো জ্বলছে-নিভছে।
পরদিন আবার হাসপাতালে গেল তারা। বিলিং কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে অভিক বলল, “দুই দিন সময় দিলে হয়?”
লোকটা কম্পিউটারের স্ক্রিন থেকে চোখ সরাল না। “আগে টাকা জমা দিন। তারপর তারিখ হবে।”
অভিক ধীরে সরে এল। করিডোরের শেষ মাথায় গিয়ে দাঁড়াল। দেয়ালে একটা ঘড়ি, সেকেন্ডের কাঁটাটা টিকটিক করছে।
নিশি এসে শুধু তার হাতটা ধরল। শক্ত করে না, আলতো করে। ঠিক তখনই পাশের বেঞ্চে বসে থাকা একজন বৃদ্ধ এগিয়ে এলেন। পরনে মলিন পাঞ্জাবি, হাতে লাঠি। “বাবা, একটু শুনবে?”
অভিক ভেবেছিল, হয়তো কোনো ওয়ার্ডের ঠিকানা জানতে চাইবেন।
বৃদ্ধ শার্টের পকেট থেকে একটা পুরোনো খাম বের করলেন। খামের কোণা ভাঁজ হয়ে গেছে, কালি একটু লেপ্টে আছে। “আমার স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য টাকা জমিয়েছিলাম। শেষ পর্যন্ত ওকে বাঁচাতে পারিনি। তারপর থেকে খামটা সঙ্গে রাখি। ভাবতাম, কোনো দিন হয়তো কারও দরকার হবে।”
অভিক তাড়াতাড়ি মাথা নাড়ল। “না চাচা, এটা নিতে পারব না।”
বৃদ্ধ হালকা হাসলেন। খামটা তার হাতে গুঁজে দিলেন। “সব সাহায্য আত্মীয়রা করে না বাবা। কখনো কখনো অচেনা মানুষও করে।”
কথা শেষ করে তিনি ধীরে চলে গেলেন। করিডোরের ভিড়ে মিশে গেলেন। অভিক ডাকতে গিয়েও ডাকল না। গলাটা আটকে এল একটু।
খামটা খুলে দেখল। ভেতরে খুব বেশি টাকা নেই। এই টাকায় অপারেশন হবে না, সেটা সে জানে।
তবু তার মনে হলো, এতক্ষণ ধরে বুকের ওপর চেপে থাকা পাথরটা একটু নড়েছে। নিঃশ্বাস নিতে সামান্য সহজ লাগছে।
নিশি খামটার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর আস্তে করে বলল, “চলো। আবার চেষ্টা করি।”
অভিক মাথা নাড়ল।
অনেক বছর পরেও সেই খামটা সে ফেলে দিতে পারেনি। ড্রয়ারের এক কোণে পড়ে থাকে। খুললে এখনো ফিনাইলের গন্ধ পাওয়া যায়।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।