হাসপাতালের বিছানায়
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প | জানুয়ারি ১৬, ২০২৬
হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আমি বুঝেছিলাম -মৃত্যু সবসময় আসে না।
কখনো কখনো সে এসে পাশে বসে থাকে।
কিছু বলে না। শুধু তাকিয়ে দেখে—তুমি আর কতটা কমে যেতে পারো।
চোখ খুলেছিলাম। নাকি খুলে গিয়েছিল—আজও নিশ্চিত না।
আলোটা হঠাৎ ঢুকে পড়েছিল চোখের ভেতর। নরম ছিল না। ক্ষমাহীন।
সাদা ছাদটা আমার দিকে তাকিয়ে ছিল এমনভাবে, যেন আমাকে পরীক্ষা করছে।
এমন সাদা, যেখানে কোনো ছায়া নেই। আমার ভয়গুলোও না।
আমি নড়তে চাইনি। নড়তে পারিনি—এই কথাটা পুরো সত্য না। আসলে নড়ার প্রয়োজনটাই তখন ফুরিয়ে গিয়েছিল।
শরীরটা শুয়ে ছিল। আমি শরীরের ভেতরে ছিলাম না। আমি কোথাও মাঝখানে আটকে ছিলাম—শ্বাস আর নিঃশ্বাসের ফাঁকে।
নিঃশ্বাস নেওয়াটা তখন আর স্বাভাবিক কিছু না।
ওটা ছিল যান্ত্রিক। অনিচ্ছাকৃত। যেন কেউ আমার জায়গায় বসে বোতাম টিপে রেখেছে—এই শরীরটা এখনো চলবে।
বুকের ভেতরে ব্যথা ছিল না। ব্যথা থাকলে অন্তত বোঝা যেত—আমি আছি।
ওখানে ছিল শুধু একটা ভার,অদ্ভুত, অচেনা ভার।
সময় তখন থেমে গিয়েছিল। ঘড়ি ছিল, সময় ছিল না।
দিন আর রাত আলাদা করা যাচ্ছিল না।
শুধু একটানা অপেক্ষা।
কিসের জন্য অপেক্ষা—এই প্রশ্নটার উত্তর খোঁজার শক্তিও ছিল না। মনে হচ্ছিল, অপেক্ষাটাই এখন আমার পরিচয়।
হাসপাতালের বিছানায় মানুষ শুয়ে থাকে না।
ওখানে মানুষ ধীরে ধীরে অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে।
একটু নড়াচড়া করলে শরীর ব্যথা দিত। কিন্তু সেই ব্যথা কষ্ট দিত না। কষ্ট দেওয়ার মতো অনুভূতিই তখন আর অবশিষ্ট ছিল না। মনে হচ্ছিল—এই শরীরটা ভাঙছে না, ক্ষয়ে যাচ্ছে, নীরবে কেউ দেখছে না।
মাথার ভেতরে কোনো বড় চিন্তা ছিল না। কোনো নাটকীয় ভয়ও না।
শুধু একটা ভারী, ধূসর ক্লান্তি। বেঁচে থাকার দায়িত্বটা তখন বোঝার মতো ভারী হয়ে গিয়েছিল।
মনে হচ্ছিল—এই দায়িত্বটা আমি চাইনি। কেউ আমাকে জিজ্ঞেসও করেনি।
রাত হলে কিছু বদলাত না। শুধু অন্ধকারটা ঘন হতো। দিনের বেলা মানুষের শব্দে যে ফাঁকটা ঢাকা পড়ে থাকত, রাতে সেটা খুলে যেত।
শব্দ কমে গেলে ভেতরের শূন্যতাটা শোনা যেত।
তখন বোঝা যেত—আমি একা না, আমি ফাঁকা।
চোখ বন্ধ করলেই মুখ আসত। মায়ের মুখ,বাবার চোখ, কিছু পরিচিত মানুষ, শিশুর মতো হাত ধরার স্মৃতি।
বাবার মুখে সেই চুপচাপ অহংকার, যা শূন্যতায় আশ্রয় দিত।কিন্তু কোনো অনুভূতি আসত না।
ভালোবাসা না,আফসোস না, কিছুই না।
সব দেরি হয়ে যাওয়ার পর মানুষের মনে যে অনুভূতিটা আসে—ওটাও তখন আর ছিল না।
মনে হচ্ছিল, অনুভব করার সময়টাও পেছনে পড়ে গেছে।
কেউ এসে হাত ধরলে অদ্ভুত লাগত।
ভালো না। খারাপও না।
শুধু মনে হতো—এই স্পর্শটা এখন আর কিছু ঠিক করতে পারবে না। আমি আর ওই জায়গায় নেই, যেখানে হাত ধরা মানে ভরসা।
নার্সরা কথা বলত। ডাক্তাররা বলত, “স্টেবল।”
এই শব্দটার মানে আমি বুঝতাম—আমি নড়ছি না, তাই সমস্যা নেই।
কিন্তু ভেতরে ভেতরে আমি জানতাম—আমি স্থির না। আমি থেমে যাচ্ছি।
হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আমি বুঝেছিলাম—মানুষ সবসময় ভেঙে পড়ে না।
কখনো কখনো মানুষ ধীরে ধীরে ফুরিয়ে যায়।
এত ধীরে, যে কেউ খেয়ালও করে না।
আজও হাসপাতালের গন্ধ পেলে বুকের ভেতরে কিছু একটা চুপ করে বসে পড়ে।
সাদা চাদর দেখলে মনে হয়—ওখানে আমার একটা অংশ পড়ে আছে,চোখ খোলা, শ্বাস চলছে।
কিন্তু কোনো দাবি নেই।
আমি জানি—আমি ওখান থেকে পুরোপুরি ফিরিনি।
আমি শুধু ছিলাম।
আর তখন, হঠাৎ চোখের কোণ ধুলোমাখা আলোতে চোখে পড়ে— বেডের বাইরের গ্লাসের পাশে দাঁড়িয়ে আছে বাবা।
প্যারালাইস্টে আক্রান্ত। লাঠিতে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে।
শুধু দুচোখের জল ঝরছে, কোনো শব্দ নেই।
কোনো ডাক নেই, শুধু জল।
একটি ভাঙা জল। যা আমার বুকের সাথে ধাক্কা মারে, যেন সেই জলের প্রতিটি ফোঁটা আমার মধ্যে গড়িয়ে ঢুকছে।
আমি চাইছিলাম চিৎকার করতে, চোখকে ঘুরিয়ে তাকাতে,কিন্তু পারিনি।
আমি শুয়ে আছি। আমার বুকের ভেতরে ওর উপস্থিতি ঝড় তুলছে, আর আমি নড়তে পারছি না।
হাত ধরার স্মৃতি ভেসে আসে।
বাবার শক্তি, বাবার নীরব প্রতীক্ষা।
এবার তা ভাঙা জলের মতো আমার বুক ভেঙে দিচ্ছে।
শ্বাস টানতে কষ্ট, নড়তে চেষ্টা করলে ব্যথা। সব মিলিয়ে আমি কেবল শুয়ে আছি, একটি ভাঙা বেদনার ঝড়ের মধ্যে।
আমি শুধু ছিলাম। আর এখনও—কিছু অংশ শুধু আছে।
কোথাও পড়ে আছে।
শ্বাস চলছে।
চোখ খোলা।
কিন্তু কেউ নিশ্চিত না—আমি আদৌ উঠে এসেছি কি না। আর আমার বাবার চোখগুলো— তারা এক ধরণের ঝড়, যা কখনো থামে না।
শুধু দাঁড়িয়ে থাকে,শুধু দেখা থাকে,শুধু বেদনা থাকে,শুধু জল থাকে।
#বাইপাসঅপারেশনেরপর #হাসপাতালেরবিছানায়
#হৃদয়বিদারকগল্প #নীরবযন্ত্রণা #বাস্তবজীবনেরগল্প #রোগীডায়েরি #বাংলাছোটগল্প
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।